তৃতীয়বারের মতো বিদেশে রফতানি করা হচ্ছে সাতক্ষীরা জেলার হিমসাগর আম। ইউরোপের দেশ সুইডেন, ফ্রান্স ও ইতালিতে দশ চালানে সাতক্ষীরার ৩২ টন আম পাঠানো হয়েছে। জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছর যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর পরও এবারও সাতক্ষীরার আম ইউরোপে পাঠানো হয়েছে।
আবহাওয়া ও পরিবেশগত কারণে দেশের মধ্যে সবার আগে সাতক্ষীরার আম পাকতে শুরু করে বলে জানিয়েছেন কৃষিবিদরা। ইতোমধ্যে সাতক্ষীরার আম রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাওয়া যাচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন আম বাগান সরেজমিনে ঘুরে ও জেলা কৃষি সম্প্রাসারণ অধিদফতরের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা জেলায় এবার আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। আমের ভালো ফলনে মালিক ও ব্যবসায়ীরাও খুশি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এবার আমের আবাদ করা হয়েছে ৩৯৫০ হেক্টর জমিতে। গতবারের তুলনায় ৫০ হেক্টর বেশি জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। আর আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫০ হাজার মেট্রিক টন। যা গতবারের চেয়ে ১৫ হাজার মেট্রিক টন বেশি। এ বছর আম বিদেশে রফতানির লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২শ মেট্রিক টন।
এ জন্য এবছর কোয়ারেন্টাইনের এক্সপোর্ট ডিডি, বাংলাদেশ ফ্রুট অ্যান্ড ভেজিটেবল এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারাসহ ফল রফতানিকারকদের বিভিন্ন সংগঠন কয়েকবার সাতক্ষীরার বিভিন্ন আম বাগান পরিদর্শন করেছেন।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন জানান, ‘সাতক্ষীরা থেকে ১০ চালান আম ইউরোপে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলা, তালা উপজেলা, দেবহাটা উপজেলা ও কলারোয়া উপজেলা থেকে ৩২ মেট্রিকটন হিমসাগর আম রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান হক এন্টারপ্রাইজ ও তাসিন এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে সুইডেন, ইতালি ও ফ্রান্সে পাঠানো হয়েছে।’
সাতক্ষীরার সদরের রাজার বাগান এলাকার আম চাষী মুজিবুর রহমান বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে সাতক্ষীরার আম বিদেশে যাওয়ার ফলে দিনে দিনে এ অঞ্চলে আম চাষে নীরব বিপ্লব ঘটছে। শ্রমিক দিয়ে সারা বছর বাগান পরিচর্যা করায় বহু বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। হিমসাগর আর ল্যাংড়া আমের রাজধানী বলা যায় সাতক্ষীরাকে। এই আম সাতক্ষীরার প্রধান অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে বলা চলে।’
আম চাষের পাশাপাশি বাগান লিজ নিয়েও অনেকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। সাতক্ষীরা সদরের আম ব্যবসায়ী মীর মনিরুজ্জামান কাকান বলেন, ‘মুকুলের ওপর ভিত্তি করেই বাগান কেনাবেচা হয়ে থাকে। এবার আমের মুকুল বেশি হওয়ায় বাগানের দামও বেশি ছিল। তবে যে সব বাগানকে বিদেশে রফতানির জন্য বাছাই করা হয়েছে সে সব বাগান দেখাশুনা ও পরামর্শের কাজ করেছে কৃষি বিভাগ। সাতক্ষীরার আম বিদেশে চাহিদা বাড়ায় গতবারের চেয়ে এবার জেলার বাইরের ব্যবসায়ীরা বেশি আসছেন।’
পুরাতন সাতক্ষীরা এলাকার আম চাষী মো. আব্দুল হাই সিদ্দিকি বলেন, ‘গত বছর আমার বাগানের আম বিদেশে রফতানি হয়েছিল। বিষমুক্ত ও রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন করতে ১৬ বিঘার দুটি বাগানে কৃষি বিভাগের পরামর্শ মোতাবেক কাজ করেছি। সেজন্য অন্য চাষীদের তুলনায় ফলন ও বেশি দাম পেয়েছি। আম রফতানিকারক কর্মকর্তারাও আমার বাগান পরিদর্শন করেছেন।’
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। এছাড়া সাতক্ষীরা থেকে তৃতীয়বারের মতো ৩৮ টন হিমসগার আম রফতানি করা হয়েছে। আম্রপালি জুনের প্রথমে পাকে। এজন্য এই সপ্তাহেই সাতক্ষীরা সদর, তালা, দেবহাটা ও কলারোয়া উপজেলা থেকে আম্রপালি ও ল্যাংড়া আম রফতানি হবে। সাতক্ষীরা থেকে এ বছর আম রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২শ মেট্রিক টন। এর মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আম বিষমুক্ত করতে ও গুণগত মানসহ যাবতীয় বিষয় যথাযথ রাখতে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক নিজেই তদরকি করছেন। আমের মুকুল আসা থেকে শুরু করে সার্বিক বিষয়ে আমিও তদারকি করছি। সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আমজাদ হোসেনসহ মাঠ পর্যায়ের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারাও নিয়মিত কাজ করছেন।’
আব্দুল মান্নান জানান, সাতক্ষীরায় গোবিন্দভোগ সবার আগে পাকে। এরপর হিমসাগর, ল্যাংড়া পাকে। আম্রপালি পাকে সবার শেষে। তিনি বলেন, ‘সাতক্ষীরায় বিভিন্ন জাতের আম চাষ হয়ে থাকে। তার মধ্যে হিমসাগর, ল্যাংড়া, গেবিন্দভোগ, আম্রপালি, মল্লিকা, সিদুর রাঙ্গা, ফজলি, কাঁচামিঠা, বোম্বাই, লতাআম বেশি চাষ করা হয়। আশা করছি, এ বছর সাতক্ষীরা জেলায় আমের উৎপাদন ও সংগ্রহ হবে ৫০ হাজার মেট্রিক টন।’
তিনি জানান, গতবছর এ জেলা থেকে ২৩ টন আম যুক্তরাজ্যের বাজারে রফতানি করা হয়েছে। এবছর কৃষিবিভাগের মাধ্যমে যাছাই বাছাই করে সদর উপজেলার ১৫০টি, কলারোয়া উপজেলার ১০০টি, দেবহাটার ৪০টি ও তালার ৮৭টিসহ ১শ হেক্টর জমির ৩৭৭টি আম বাগানের আম রফতানির জন্য আবাদ করা হয়েছে। ২২০ জন বাগান মালিককে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিষমুক্ত চাষের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। আর এসব বাগান থেকে ৬০০ মেট্রিকটন আম উৎপাদন করা সম্ভাব যা থেকে বাছাই করে ২০০টন আম বিদেশে রফতানি করা যাবে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘জেলার আম সুস্বাদু হওয়ায় এর সুনাম দেশের গণ্ডি পেরেয়ি বিদেশের বাজারেও চাহিদা তৈরি করেছে। আমের উৎপাদনের বিষয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও মার্কেটিংয়ে কিছু দুর্বলতা রয়েছে। এই দুর্বলতা কিভাবে কাটিয়ে ওঠা যায় সে বিষয় নিয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে মিটিং হয়েছে। এসবার যেসব সমস্যা রয়ে গেছে আগামীতে যাতে যেগুলো না থাকে সেবিষয়ে নজর দেওয় হবে। আগামীতে এই জেলার আম যাতে আরও বেশি পরিমাণে রফতানি করা যায় সেদিকে নজর দেওয়া হবে।’
/এফএস/
আরও পড়ুন-
‘নির্দিষ্ট সময়ের’ আগেই বাজারে রাজশাহীর আম







