স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার তথা মুজিবনগর সরকারকে গার্ড অব অনার প্রদানকারী প্লাটুন কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা ইয়াদ আলীর ভাতা বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিন নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেয়ে আসলেও ২০১৬ সালের অক্টোবর মাস থেকে ভাতা বন্ধ হয়ে যায় তা। দীর্ঘ দিনেও এর সুরাহা না হওয়ায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন ২০০২ সালে মারা যাওয়া এই মুক্তিযোদ্ধার আশি-ঊর্ধ্ব বয়সী স্ত্রী আকলিমা খাতুন। বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিয়েও তিনি এর সমাধান করতে পারেনি। একারণে দ্রুত ইয়াদ আলীর ভাতা পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছে সহযোদ্ধা ও এলাকাবাসী। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও আশ্বাস দিয়েছেন দ্রুততম সময়ে সমস্যা সমাধানের।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রবাসী সরকার শপথ গ্রহণ করে। সেদিন ইয়াদ আলীর নেতৃত্বে ১২জন আনসার সদস্যের মুক্তিযোদ্ধা দল সেই সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।
আগের গেজেটে নাম থাকলেও ২০০৫ সালের গেজেটে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ইয়াদ আলীর নাম বাদ পড়ে। গেজেটে মুক্তিযোদ্ধা ইয়াদ আলীর স্থলে একই নম্বরে ইয়াসিন আলীর নাম সংযোজন হয়। ভুলবশত বা কোনো মহলের ইন্ধনেই হোক এখন এই ভুলের খেসারত দিচ্ছেন এখন ইয়াদ আলীর স্ত্রী আকলিমা খাতুনসহ পরিবারের সদস্যরা। মেহেরপুর সদর উপজেলার বারাদি হাসানাবাদ গ্রামে বাড়ি মুক্তিযোদ্ধা ইয়াদ আলীর। তার পিতার নাম ইনসান আলী ওরফে আবুল হোসেন। তার মুক্তিবার্তা নম্বর-০৪১০০১০৪৬৯। মুক্তিবার্তায় তার পিতার নাম লেখা হয় শুধু আবুল হোসেন। বাবার নামের সাথে মিল হওয়ায় পাশের গ্রাম মোমিনপুরের মৃত আবুল হোসেনের ছেলে ইয়াসিন আলীর নাম ২০০৫ সালের গেজেটি সংযোজন করা হয়েছে। নম্বর ঠিক রেখে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা পরিবর্তন হলো?- এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তর।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিলের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার প্রদানের দিন থেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন ইয়াদ আলী। স্বাধীনতার পরে সরকারের পক্ষ থেকে তাকে চাষাবাদের জন্য ৫৭ শতক জমি, বিদ্যুৎ সুবিধাসহ দুইকক্ষবিশিষ্ট বাড়ি এবং দুই লাখ টাকার অনুদান দেওয়া হয়। সাহসিকতার পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন রাষ্ট্রপতি আনসার ও ভিডিপি পদক। তার নামে গাজীপুরের শফিপুরে আনসার ও ভিডিপি প্রধান কার্যালয়ের একটি প্যারেড গ্রাউন্ডের নামকরণ করা হয়েছে ‘ইয়াদ আলী প্যারেড গ্রাউন্ড’। নিজ গ্রাম হাসানাবাদে ইয়াদ আলীর নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আনসার ও ভিডিপি ক্লাব। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে ভাতার চেক গ্রহণ করা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ২০০২ সালের ১৫ এপ্রিল মারা যান।
জেলা আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট আব্দুর রশীদ বলেন, মুক্তিযোদ্ধা ইয়াদ আলী ভাতা পাচ্ছেন না এটা অসম্ভব ব্যাপার। বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। তবে তার ভাতা যাতে পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
সদর উপজেলার পুরাতন দরবেশপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মুসা করিম জানান, ‘একটি কুচক্রী মহল একযোগ হয়ে ইয়াদ আলীর ভাতা বন্ধ করে দিয়েছে। এটা জাতির জন্য কলঙ্কজনক’।
বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে বলে জানান মেহেরপুর জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের রেজিস্ট্রার রুমানা ইয়াসমিন। তিনি জানান, ইয়াদ আলীর বাবার নাম ভুল পাওয়া গেছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ইয়াদ আলী ভাতা পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, স্বাধীনতার ইতিহাসের স্বাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা ইয়াদ আলী। ইতিহাসে তাঁর নাম লেখা রয়েছে। তাঁর ভাতা বন্ধ হয়ে গেলে বা গেজেটে তার নাম না থাকলে পুরো ইতিহাস পরিবর্তন হয়ে যাবে। খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাঁর ভাতা চালুকরণ ও গেজেট সংশোধনের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।








