বকেয়া বেতনের দাবিতে শ্রমিকদের টানা কর্মবিরতি, পাটকলগুলোর অচলাবস্থা

খুলনা প্রতিনিধি
১১ মে ২০১৯, ১০:৪১আপডেট : ১১ মে ২০১৯, ১০:৪৮

 

পাটকল শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল

খুলনায় বকেয়া মজুরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় শ্রমিকরা টানা কর্মসূচি পালন করছে। রমজানের মধ্যেও রোজা পালনের পাশাপাশি তীব্র তাপদহ উপেক্ষা করে তারা রাজপথ কাপাচ্ছেন। সেহরিতে ভাত খাচ্ছেন মরিচ পোড়া দিয়ে, আর সন্ধ্যায় কোনও রকমে ইফতার করছে রাজপথে বসে। শনিবার টানা ষষ্ঠ দিনের মত কর্মবিরতী পালন করছেন খুলনা যশোর অঞ্চলের ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব পাটকল শ্রমিক। বিকালে পালিত হবে রাজপথ ও রেলপথ অবরোধের ৪র্থ দিন। টানা কর্মবিরতী ও অবরোধে পাটকলগুলোতে চরম অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিক পরিবারগুলোতে বিরাজ করছে হাহাকার।

বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) খুলনা যশোর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, পাটকল শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন করছে। এতে মিলগুলোর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। খুলনা অঞ্চলের ৯টি পাটকলে প্রতিদিন গড়ে ৯০ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই হিসেবে ৬ দিনে ৫৪০ মেট্রিক টন পাটপণ্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি আরও জানান, খুলনা-যশোর অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ৯টি পাটকলে শ্রমিকদের ৯ থেকে ১২ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। একই সঙ্গে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ৩ থেকে ৪ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫৯ কোটি টাকার মজুরি ও বেতন বকেয়া রয়েছে। 

প্লাটিনাম জুট মিল শ্রমিক হাবিবুর রহমান জানান,তার সংসারে স্ত্রী ও ২ ছেলে, এক মেয়ে রয়েছে। সেহরির সময় আলু ভর্তা আর শুকনা মরিচ দিয়ে ভাত খেয়েছেন। রোজা রেখেই কর্মবিরতী ও অবরোধ কর্মসূচি শেষে ইফতার করেন নতুন রাস্তা মোড়ে। তাদের ১২ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ তো পরের কথা, পরিবারের সদস্যরা সেহরি ও ইফতারই ঠিক মতো করতে পারছেন না। দোকানদার আর বাকি দিতে চায় না।

প্লাটিনাম জুট মিলের শ্রমিক কাঞ্চন আলী জানান, সেহরিতে আলু ভর্তা আর মরিচ পোড়া দিয়ে ভাত খেতে হচ্ছে। দোকানদার সহায়তা না করলে এটুকুও জুটতো না। তার সংসারে ২ ছেলে-মেয়ে রয়েছে। তাদের স্কুলের বেতন, প্রাইভেটের বেতন ও অন্যান্য খরচ দিতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। এ অবস্থায় তার সঙ্গে থাকা মা-বাবাও অসহায় হয়ে পড়ছেন।

আলীম জুট মিলের সিবিএ সভাপতি মো.সাইফুল ইসলাম লিটু জানান, ১২ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। শ্রমিকদের মাঝে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।

ক্রিসেন্ট জুট মিলের সিবিএ সাধারণ সম্পাদক মো. সোহরাব হোসেন বলেন,‘শ্রমিকরা ন্যায্য অধিকার আদায়ে রাজপথে নেমেছে। রুটি-রুজির দাবিতে আন্দোলন করছে। তাদের পেটে ভাত নেই। প্রথম রোজা থেকেই  নতুন রাস্তা মোড়ে ইফতারের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে যে যা দেয় তা আর পানি খেয়ে ইফতার করতে হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, আগামী ১৩ মে সোমবার থেকে সারাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব পাটকলে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এ ধর্মঘট চলাকালে প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত রাজপথ-রেলপথ অবরোধ এবং রাজপথে ইফতার করবে শ্রমিকরা। এর আগে ১২ মে প্রতিটি পাটকলে গেট সভা হবে। এর আগ পর্যন্ত খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৯টি পাটকলে চলমান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

শনিবার কর্মবিরতি পালনের পাশাপাশি শ্রমিকরা বিকালে খুলনা ও যশোরের তিনটি পয়েন্টে অবরোধ পালন করবে। ৪র্থ দিনের মত শ্রমিকরা সড়কেই ইফতার ও নামাজ আদায় করবে।

বাংলাদেশ পাটকল শ্রমিক লীগ খুলনা-যশোর অঞ্চলের আহ্বায়ক ও ক্রিসেন্ট জুট মিলের সিবিএ সভাপতি মো. মুরাদ হোসেন জানান, প্রতিদিনের মতো শনিবার বিকেল ৪টা থেকে খুলনার খালিশপুর ও দিঘলিয়া শিল্পাঞ্চলের ৫টি পাটকল শ্রমিকরা নতুন রাস্তা মোড়, আটরা শিল্পাঞ্চলের ২টি পাটকলের শ্রমিকরা আলিম জুট মিলের সামনে ও নওয়াপাড়া শিল্পাঞ্চলের ২টি মিলের শ্রমিকরা রাজঘাটে অবরোধ কর্মসূচি পালন করবেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

বিজেএমসি ও সংশ্লিষ্ট মিল সূত্রে জানা গেছে, খুলনা ও যশোর অঞ্চলে রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকলে ১ হাজার ১৮৭ জন কর্মকর্তা কর্মচারী রয়েছেন। এর মধ্যে ৪১৪ জন কর্মকর্তা ও ৭৭৩ জন কর্মচারী রয়েছে। তাদের বকেয়া বেতনের পরিমাণ ১৬ কোটি ৪৪ লাখ ১৭ হাজার টাকা। আলিম জুট মিলে ১৭ জন কর্মকর্তা ও ২০ জন কর্মচারীসহ ৩৭ জনের চার মাসের বকেয়া বেতন ১ কোটি ৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা, ক্রিসেন্ট জুট মিলে ৮৬ জন কর্মকর্তা ও ১৬৩ জন কর্মচারীসহ ২৪৯ জনের চার মাসের বকেয়া বেতন ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা, দৌলতপুর জুট মিলের ২২ জন কর্মকর্তা ও ৫২ জন কর্মচারীসহ ৭৪ জনের তিন মাসের বেতন বকেয়া ৬৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, খালিশপুর জুট মিলে ৭৫ জন কর্মকর্তা ও ১৬০ জন কর্মচারীসহ ২৩৫ জনের তিন মাসের বকেয়া বেতন ১ কোটি ৮০ লাভ টাকা, প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে ৬৫ জন কর্মকর্তা ও ১৩১ জন কর্মচারীসহ ১৯৬ জনের চার মাসের বকেয়া বেতন ৩ কোটি টাকা, ইস্টার্ন জুট মিলে ৩২ জন কর্মকর্তা ও ৭১ জন কর্মচারীসহ ১০৩ জনের চার মাসের বকেয়া বেতন ১ কোটি ৬০ লাখ ৬৮ হাজার টাকা, স্টার জুট মিলে ৫৬ জন কর্মকর্তা ও ৯১ জন কর্মচারীসহ ১৪৭ জনের চার মাসের বকেয়া বেতন ১ কোটি ৯৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকা, কার্পেন্টিং জুট মিলে ২০ জন কর্মকর্তা ও ৫২ জন কর্মচারীসহ ৭২ জনের তিন মাসের বকেয়া বেতন ৬৬ লাখ টাকা এবং জেজেআইর ৪১ জন কর্মকর্তা ও ৯৮ জন কর্মচারীসহ ১৩৯ জনের চার মাসের বকেয়া বেতন ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

আলিম জুট মিলের প্রকল্প প্রধান (জিএম) মো.খলিলুর রহমান বলেন, ‘গত চার মাস ধরে মিলের ৩৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারি বেতন পাচ্ছে না। আরও একটি মাস শুরু হয়েছে, এখনও বেতন পাইনি। বর্তমানে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি।

ইস্টার্ন জুট মিলের প্রকল্প প্রধান (জিএম) ড. মাহবুবুর রহমান জুলফিকার বলেন,‘গত চার মাস ধরে বেতন পাচ্ছি না। এ মাসেও বেতন পাবো কিনা জানি না। বেতন বকেয়া থাকায় মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে।

অন্যদিকে, খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকলে প্রায় ৩২৫ কোটি টাকার পাটজাত পণ্য অবিক্রিত অবস্থায় মজুদ রয়েছে। বাংলাদেশের পাটজাত পণ্যের মূল বাজার সুদান, ঘানা, সিরিয়া, ইরাণ ও ভারত। কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে এ সব দেশে পণ্য বিক্রি বন্ধ রয়েছে। ফলে মিলগুলো আর্থিক সংকটে পড়েছে। 

/জেবি/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
পশ্চিমবঙ্গে যেকারণে তৃণমূলের ‘অপ্রত্যাশিত রক্ষাকর্তা’ খোদ বিজেপি
কী, কেন, কীভাবেপশ্চিমবঙ্গে যেকারণে তৃণমূলের ‘অপ্রত্যাশিত রক্ষাকর্তা’ খোদ বিজেপি
বিশ্বকাপে স্টেডিয়ামে নেওয়া যাবে না পানির বোতল
বিশ্বকাপে স্টেডিয়ামে নেওয়া যাবে না পানির বোতল
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
যুবদলের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন
যুবদলের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম