সাতক্ষীরা উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি!

আসাদুজ্জামান সরদার, সাতক্ষীরা
২৪ আগস্ট ২০২০, ০০:২২আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২০, ০১:৪৮

 


সাতক্ষীরার বন্যা কবলিত এলাকা ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বাঁধ ভেঙেও এত মানুষ পানিবন্দি হয়নি। কিন্তু গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ এবং অমাবস্যার প্রবল জোয়ারে সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলায় কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে রিংবাঁধ এবং বেড়িবাঁধ ভেঙে ৮০টির বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ।

শনিবার (২২ আগস্ট) নতুন করে ভেঙে গেছে শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের লেবুবুনিয়ার কয়েকটি পয়েন্টের রিংবাঁধ এবং কাশিমাড়ী ইউনিয়নের ঝাপালি খোলপেটুয়া নদীর রিংবাঁধ। এর ফলে আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের সবক’টি গ্রাম পানিতে ভাসছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে সেখানকার ৩৬ হাজার মানুষ। পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে শ্রীউলা ইউনিয়নের ২২টি গ্রামের ৩৭ হাজার মানুষ। আশাশুনি সদর এবং আনুলিয়া ইউনিয়নে বাঁধ ভেঙে কয়েকটি গ্রামের মানুষ এখন পানিবন্দি।
এদিকে নদীতে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি ও টানা বর্ষণে শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের লেবুবুনিয়া ও কাশিমাড়ী ইউনিয়নের ঝাপালিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নবনির্মিত রিংবাঁধের ৮ পয়েটে (খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদ) ভেঙে গেছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বিধ্বস্ত হওয়া বেড়িবাঁধে পরবর্তীতে স্থানীয় জনগণের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ভাঙন রোধে বিকল্প রিংবাঁধ নির্মাণ করা হয়। টেকসই বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় চলমান টানা বর্ষণে এসব রিংবাঁধ ভেঙে পুনরায় ভেঙে গাবুরা ইউনিয়নের ৫টি গ্রামসহ কাশিমাড়ী ইউনিয়নে ৩টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়। ভেঙে পড়েছে স্যানিটেশন ব্যবস্থা। দেখা দিয়েছে সুপেয় খাবার পানির অভাব।

ঘরের ভেতর পানি প্রবেশের ফলে এসব এলাকায় রান্না করার মতো জায়গা না থাকায় নারী, শিশু নিয়ে অধিকাংশ পরিবারকে অর্ধাহারে থাকতে হচ্ছে। অনেক মানুষ শুধু শুকনো খাবার খেয়ে কোনোভাবে টিকে আছে। যেসব এলাকায় কোনও সাইক্লোন শেল্টার নেই সেসব এলাকার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাটির ঘরেই বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিচ্ছে।
শ্রীউলা ইউনিয়নের মাড়িয়ালা গ্রামের শহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের কষ্টের সীমা নেই। ঘরে পানি, চুলায় পানি। দুই দিন কিছু রান্না করতে পারিনি। শুধু শুকনো খাবার খেয়ে আছি।
শ্রীউলা ইউপি চেয়ারম্যান আবু হেনা শাকিল জানান, আম্পানের পর হরিষখালীতে বাঁধ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এটি এখন বড় নদীতে পরিণত হয়েছে। আমার ইউনিয়নের ২২টি গ্রাম সম্পূর্ণ পানির নিচে। সাধারণ মানুষ বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
কাশিমাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান এস এম আব্দুর রউফ জানান, টানা বর্ষণ ও খোলপেটুয়া নদীতে অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়ে ঝাপালিতে রিংবাঁধের ১০ মিটার ভেঙে গেছে। এ সময়ে ইউনিয়নের ঘোলা, ঝাপালি ও কাশিমাড়ী গ্রাম প্লাবিত হয়ে ৮ শতাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ২ শতাধিক মৎস্যঘের পানিতে তলিয়ে গেছে।
বন্যায় তলিয়ে গেছে বাড়িঘর প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়া বেড়িবাঁধ সংস্কার শেষ হতে না হতেই ফের ভেঙে সব ভেসে গেছে। মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। ইউনিয়নের ২১টি গ্রামের ২০টিই সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে।
গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আল জানান, অতি বর্ষণ এবং কপোতাক্ষ নদে ৪-৫ ফুট জোয়ারে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জরাজীর্ণ রিংবাঁধের ৭ পয়েন্টে ২০০ কিলোমিটার কপোতাক্ষ নদে ধসে যায়। এ সময় লোকালয়ে লোনা পানি প্রবেশ করে ইউনিয়নের গাবুরা, লেবুবুনিয়া, খোলপেটুয়া, গাবুরা পশ্চিমপাড়া ও চকবারা গ্রাম প্লাবিত হয়। ১০ সহস্রাধিক মানুষ পানিবন্দি। চার শতাধিক মৎস্যঘের পানিতে তলিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুই শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত। পানিবন্দি মানুষ পাউবো বেড়িবাঁধের ওপর খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫ টন চাল ও নগদ ১৩ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় যেকোনও মুহূর্তে রিংবাঁধ ভেঙে পুরো ইউনিয়ন ফের তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন তিনি।
আশাশুনি উপজেলা চেয়ারম্যান এবিএম মোস্তাকিম জানান, নদী আর গ্রাম সব এক হয়ে গেছে। চারটি ইউনিয়নের ৭০টির অধিক গ্রামের ২০ হাজার পরিবারের মানুষ পানিবন্দি। আশাশুনি সদর, প্রতাপনগর, শ্রীউলা ও ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। একটু শুকনো জায়গা নেই যেখানে তারা দাঁড়াবে।
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সুধাংশ কুমার সরকার কয়েকটি স্থানে রিংবাঁধ দিয়ে পানি বন্ধ করা হয়েছে বলে দাবি করেন। তবে প্রতাপনগর ইউনিয়নের চাকলা ও কুড়িকাহুনিয়া এবং শ্রীউলা ইউনিয়নের হাজরাখালী পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে এতই গভীর হয়েছে যে সংস্কার করাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল বলেন, ইতোমধ্যে দুর্গতদের জন্য ৯৫ মেট্রিক টন চাল এবং আড়াই লাখ নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হবে। নদীর প্রবল জোয়ার এবং প্রাকৃতিক কারণে বাঁধগুলো এখন স্থায়ীভাবে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে পানি বন্ধ করতে অস্থায়ীভাবে কি করা যায় সে বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। সেনাবাহিনীকে অনেক জায়গায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পানি বন্ধ করতে কি করা যায় সে বিষয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গেও আলোচনা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, আম্পানের পর বাঁধ দেওয়ার জন্য সব চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু নদীতে জোয়ার থাকায় কিছু করা যাচ্ছে না। সরকার এই এলাকার মানুষের কষ্ট দূর করতে সেনাবাহিনী নিয়োগ দিয়েছে। তার কাজও শুরু করেছে, কিন্তু তার মধ্যে এই দুর্যোগ। এখানে কারও দুর্বলতা আছে কিনা খতিয়ে দেখা হবে। যেসব মানুষ অতি সংকটে আছে তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার জন্য ইউএনওদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

/আরআইজে/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সীমান্তে দুই বাংলাদেশিকে বিএসএফের গুলি
‘তিন মাসে বন বাঁচে, মানুষ বাঁচে কেমনে?’
সোমবার থেকে টানা তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ
সর্বশেষ খবর
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
দাম বৃদ্ধির একদিন পরই লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য রিভিউ আবেদন
দাম বৃদ্ধির একদিন পরই লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য রিভিউ আবেদন
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম