পাচারের শিকার ৭০৫ জনকে উদ্ধারের পর পুনর্বাসন

তৌহিদ জামান, যশোর
২২ মে ২০২৩, ০৮:০১আপডেট : ২২ মে ২০২৩, ০৮:০১

২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকারের অংশীজন হিসেবে মানবপাচার প্রতিরোধে কাজ করছে জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার। গত ছয় বছরে মানবপাচার এবং অনিরাপদ অভিবাসনের শিকার ৭০৫ নারী-পুরুষ ও শিশুকে উদ্ধার এবং পুনর্বাসনে সহায়তা করেছে। ইতোমধ্যে ভুক্তভোগীদের আশার আলো হয়ে উঠেছে সংস্থাটি।

সংস্থার কল্যাণে এখন স্বাবলম্বী জয়া (ছদ্মনাম)। ১০ বছর আগে পাচারের শিকার হয়েছিলেন। দেশে ফিরে জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারে চাকরি পান। ৩১ বছরে পা দিয়েছেন। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি দিচ্ছেন। পাস করলে কলেজে ভর্তি হবেন। সংসার ও পড়াশোনার খরচ নিয়ে তার কোনও দুশ্চিন্তা নেই।

আজকের অবস্থানে আসতে জয়াকে বারবার ভেঙেচুরে নতুন করে গড়তে হয়েছে। শিশুকালে বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। হয়েছিলেন কিশোরী মা, পরে বিয়ে বিচ্ছেদ। স্বজনদের প্রতারণা, শেষে পাচারের শিকার। সহ্য করেছেন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। বিদেশে দুই দফায় বিক্রির শিকার। সবশেষে বাড়ি ফিরে পরিবারে নির্যাতনের শিকার, প্রতিবেশীদের কটূক্তি, দ্বিতীয় দফায় বিয়ে, শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নির্যাতন, এক কাপড়ে আলাদা সংসার। সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে আত্মপ্রত্যয়ী জয়া নিজেই গড়েছেন নিজের ভাগ্য।  

ঢাকা বিভাগের এক জেলার বাসিন্দা নীলা (ছদ্মনাম) পলিটেকনিক কলেজে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে ডিপ্লোমা পড়ছেন। এখন তিনি উদ্যোক্তা, পাশাপাশি চাকরি করছেন। সংসার চালাতে চিন্তা করতে হয় না। কারও ওপর নির্ভরশীল নন। 

নীলার জীবন কাহিনি সিনেমার গল্পকেও ছাড়িয়ে যায়। ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় অপহরণ ও প্রতিবেশী যুবকের ধর্ষণের শিকার। আর পড়াশোনা হয়নি। প্রতিনিয়ত মানসিক নির্যাতন। একপর্যায়ে ভারতে এক ভাইয়ের বাড়িতে যান। মনে করেছিলেন সেখানে কেউ চিনবে না। পড়াশোনা করতে পারবেন। কিন্তু সেখানেও নির্যাতন। আবার ফিরে আসেন। পরে ভারতে আরেক বোনের বাসায় যান। একই অবস্থা। সেখান থেকে পালিয়ে যান। ধরে পড়ে শেল্টার হোমে। নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়লে ভারতের এক হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালের এক কর্মী যৌন ব্যবসায় বাধ্য করায়। পরে পুলিশের সহায়তায় ফের উদ্ধার ও আরেক শেল্টার হোমে আশ্রয় পান। তারপর অনেক সময় পেরিয়ে দেশে ফেরেন। বর্তমানে একটি সংস্থায় চাকরি করছেন। আত্মনির্ভরশীল নীলা এখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত।

তাদের মতো পাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের দেশে ফিরিয়ে শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও আইনি সহায়তা দিচ্ছে জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার। এরই মধ্যে জয়া ও নীলার মতো ২০ জনকে সারভাইভর হিসেবে প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়েছে সংস্থাটি। এই ২০ জন ‘চ্যাম্পিয়ন সারভাইভর’ হিসেবে পরিচিত। চ্যাম্পিয়ন সারভাইভর মানে হলো—আত্মবিশ্বাসী, স্বাবলম্বী এবং পরিবার ও সমাজের উন্নয়নে সক্রিয়।

জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের কাজের বর্ণনা দিয়ে সংস্থার সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার শাওলী সুলতানা বলেন, ‘পাচারের শিকার ভিকটিম ভারতে উদ্ধার হলেই আমাদের কাজ শুরু হয়। তার নাগরিকত্ব যাচাই করে ভারতীয় নেটওয়ার্কিং এনজিওর কাছে রিপোর্ট পাঠানো, প্রত্যাবাসন, শেল্টারের ব্যবস্থা, পিয়ার মেন্টরিং, কাউন্সেলিং, পারিবারিক একত্রীকরণ, ফ্যামিলি কাউন্সেলিং, জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের আফটার কেয়ার সাপোর্টের অধীনে আনা। সেইসঙ্গে ভিকটিমের সঙ্গে আলোচনা করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ, প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং অন্যান্য সহায়তা, পুনর্বাসন এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের যে যে সংস্থা আছে, তাদের সহায়তা নিই।’

জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার অন্যদের চেয়ে আলাদা

জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার দুই ধরনের সেবা দেয়। প্রথমত মানবপাচারের শিকারদের উদ্ধার, প্রত্যাবাসন, পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা, সমাজে পুনরায় একত্রীকরণ করতে যা যা করার সবকিছু করে। দ্বিতীয়ত, এসব কাজ করতে গিয়ে সামাজিক ও পারিবারিক যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় সেগুলোর সমাধান দেওয়া হয়।

জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের সার্বিক সেবার বিষয়ে সংস্থার কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছেন বাংলা ট্রিবিউনের যশোর প্রতিনিধি তৌহিদ জামান

সংস্থার এরিয়া ম্যানেজার মি. অপূর্ব সাহা বলেন, ‘একজন ভুক্তভোগীকে পুনর্বাসনে যা যা করা দরকার, সবকিছুই করা হয়। আমাদের কাজের ক্ষেত্রে বেশ নমনীয়তা রয়েছে। উদাহরণ হলো—একজন ভিকটিমকে উদ্ধার থেকে পুনর্বাসনের জন্য যা যা প্রয়োজন, আমরা সেটি তাৎক্ষণিকভাবে করতে পারি। এই সংস্থায় ইনোভেশনের সুযোগ আছে। যেমন—আমরা দেখলাম মানবপাচারের প্রায় ছয় হাজার মামলা পেন্ডিং। এরপর গবেষণা করে দেখতে পাই, বেশিরভাগ মামলা ফেক, পারিবারিক হিংসা আর প্রতিহিংসার মামলা। বেশকিছু মামলা করা হয়েছে, যা মানবপাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। সে কারণে মামলার মেরিট কমে গেছে। অভিযুক্তদের শাস্তির হারও কম। অনেক পুলিশ কর্মকর্তা পাচারের আন্তর্জাতিক মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে সঠিক ব্যাখ্যার জায়গায় দক্ষ নন। তারা বিদেশি তথ্য-প্রমাণ চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করেন না। ফলে অভিযুক্তরা খালাস পেয়ে যায়। আমরা সেক্ষেত্রে পুলিশকে নানা প্রশিক্ষণ, সাক্ষীদের আদালতে সাক্ষ্য প্রদানে সার্বিক সহায়তা দিচ্ছি।’

মানবপাচারবিরোধী কার্যক্রমের বর্ণনা দিয়ে সংস্থার হেড অব প্রোগ্রাম (প্রিভেনশন অ্যান্ড প্রোটেকশন) মো. সিরাজুদ্দিন বেলাল বলেন, ‘ভিকটিম চিহ্নিতকরণ, পাচারবিরোধী আইন, ভিকটিম সেন্ট্রিক অ্যাপ্রোচ এবং ট্রমা ইনফরম সার্ভিস বিষয়ে বিজিবি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নানা কৌশল জানিয়েছি আমরা। ফলে পাচারের আগে গত ছয় বছরে ১৬৭ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে আমাদের কাছে হস্তান্তর করেছে বিজিবি। প্রত্যেককে পরিবারে ফিরিয়ে দিয়েছি এবং পুনর্বাসনে সহায়তা করেছি।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভারতে মানবপাচার এবং অনিরাপদ অভিবাসনের শিকার ৭০৫ নারী-পুরুষ ও শিশুকে উদ্ধার, উদ্ধার পরবর্তী প্রত্যাবাসন এবং পুনর্বাসনে সহায়তা করেছি। ৭০ নারীকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ জন সংস্থার কর্মী হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। এ পর্যন্ত ২৪৫ সারভাইভরকে জীবন-জীবিকার ওপর উন্নয়নভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে অনেকে ছোট ছোট কৃষি খামার, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন, মুদি দোকান, টি-স্টল, সেলাই এবং কাপড়ের ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হয়েছেন।’

সিরাজুদ্দিন বেলাল বলেন, ‘প্রত্যাবাসিত ১৭ শিশুকে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ট্রাইব্যুনাল এবং আদালতে মানবপাচার সংক্রান্ত ৩২৯টি মামলায় সহায়তা দিচ্ছি আমরা। এর মধ্যে ২০২২ সালে ৯টি মামলায় পাচারকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তির রায় হয়েছে।’

সবশেষ ১৮ মে বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে ১০ বাংলাদেশিকে বাংলাদেশ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে পেট্রাপোল ইমিগ্রেশন পুলিশ। তাদেরও সহায়তা দেওয়ার কথা ভাবছে জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার।

জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার, পুনর্বাসন ও সমাজে পুনরায় একত্রীকরণসহ নানামুখী কাজ করে বলে জানালেন জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের উপপরিচালক মো. আনিছুর রহমান। তিনি বলেন, ‘তাদের রেফার্ড করা ভিকটিমদের নানামুখী প্রশিক্ষণ দিই আমরা। কাপড় সেলাইয়ের কাজ, ব্লক ও বাটিকের, ফ্যাশনের কারুকাজ, বিউটিফিকেশন ও মোমবাতি তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এসব কাজ শিখে এখন অনেকে স্বাবলম্বী।’

যশোর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পুলিশ সুপার রেশমা শারমীন, ‘দেশের বাইরে বিশেষ করে ভারতে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধারের বিষয়ে আমরা জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। কারণ তাদের সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার যোগাযোগ আছে। ভুক্তভোগী যদি কোনও শেল্টার হোমে থাকে, সেখান থেকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় তারা সম্পৃক্ত থাকে এবং কাজটি সহজ হয়। এ ছাড়া পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে তারা। পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে কী ধরনের ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়েও ট্রেনিং দেওয়া হয়।’

বাংলাদেশে পাচারের পরিস্থিতি

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২২ সালের ট্রাফিকিং ইন পারসনস (টিআইপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে পাচারের শিকার ভিকটিম শনাক্ত হন ছয় হাজার ৮৬৬ জন। ২০২২ সালে শনাক্ত হন এক হাজার ১৩৮ জন।

সরকারি তথ্যমতে, ২০২১ সালে পাচার আইনে তদন্ত হয়েছে ৫৯৪টি মামলা। যার মধ্যে সেক্স ট্রাফিকিং ১৩২টি, শ্রমশোষণ ১৮২টি এবং অজানা শোষণ ২৮০টি। সেক্স ট্রাফিকিংয়ের ১১টি মামলায় ১৮ জনের সাজা হয়েছে।

/এএম/
সম্পর্কিত
ধর্ষণের শিকার শিশু ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, থানায় মামলা
সাত মামলায় ডা. দীপু মনির জামিন আবেদন
আমার স্ত্রীকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে: আমির হামজা
সর্বশেষ খবর
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
বিশ্বতারকাদের সঙ্গে ফিফা অ্যালবামে সানজয়, নোরা ফাতেহি-ভেজড্রিমের সঙ্গে ‘সির সির’
বিশ্বতারকাদের সঙ্গে ফিফা অ্যালবামে সানজয়, নোরা ফাতেহি-ভেজড্রিমের সঙ্গে ‘সির সির’
সৌদি থেকে ফিরেছেন ২৫৩৭৭ হাজি, মৃত্যু বেড়ে ৪৫
সৌদি থেকে ফিরেছেন ২৫৩৭৭ হাজি, মৃত্যু বেড়ে ৪৫
পশ্চিমবঙ্গে যে কারণে তৃণমূলের ‘অপ্রত্যাশিত রক্ষাকর্তা’ খোদ বিজেপি
কী, কেন, কীভাবেপশ্চিমবঙ্গে যে কারণে তৃণমূলের ‘অপ্রত্যাশিত রক্ষাকর্তা’ খোদ বিজেপি
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম