জ্বালানি সংকট: মোংলা বন্দরে পণ্য খালাসে অচলাবস্থা

আবুল হাসান, মোংলা 
০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০১ আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০১

জ্বালানি তেলের সংকটে পড়েছে মোংলা বন্দরে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত লাইটার জাহাজগুলো। তেলের সংকটে লাইটার জাহাজগুলো বন্দরে আসা বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে পণ্য খালাস ও পরিবহন করতে পারছে না। এতে বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন অচলাবস্থা আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের জন্য বড় লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

লাইটার জাহাজের মালিকরা বলছেন, জ্বালানির অভাবে অধিকাংশ লাইটার জাহাজ অলস বসে থাকায় মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বন্দরের বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস ব্যাহত হওয়ায় জাহাজের (টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম) নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত অবস্থান বেড়ে যাচ্ছে। এতে জরিমানা হিসেবে বাড়তি টাকা গুনতে হয় আমদানিকারকদের। সব মিলিয়ে আমদানিকৃত খাদ্যশস্য, সার ও শিল্প কলকারখানার কাঁচামাল খালাস ও পরিবহনে চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। 

তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই চট্টগ্রামের ডিপোগুলো থেকে প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না লাইটার জাহাজের মালিকরা। রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সরবরাহকারী সংস্থা পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা থেকে খুব কম পরিমাণে তেল পাচ্ছেন, যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এটি দিয়ে চলা যায় না। জ্বালানির এই সংকট নিরসন চেয়ে লাইটার জাহাজ মালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে দফায় দফায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী বরাবরে চিঠি দিলেও কোনও সমাধান মেলেনি। ফলে ঘাটে আটকে আছে জাহাজগুলো।

বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্য স্থানান্তর করে লাইটার জাহাজে নেওয়া হয়। এরপর নদীপথে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের নানা ঘাটে নিয়ে খালাস করা হয়।  

তেলের সংকটে লাইটার জাহাজগুলো বন্দরে আসা বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ও পরিবহন করতে পারছে না

পশুর নদীতে শত শত লাইটার জাহাজ আটকা

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোংলা বন্দরের পশুর নদীতে শত শত খালি লাইটার জাহাজ গত কয়েকদিন ধরে আটকে আছে। একই অবস্থা খুলনা-রূপসাসহ চার ও পাঁচ নম্বর ঘাট এলাকায়। সেখানেও শত শত লাইটার জাহাজ আটকা। তেল সংকটে সেগুলো চলাচল করানো যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে বন্দরে অবস্থানরত বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে পণ্য খালাসে লাইটার জাহাজের সংকট দেখা দিয়েছে। মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস একেবারে স্থবির হয়ে আছে। পণ্য খালাস না হওয়ায় কাঁচামাল সংকটে উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। 

চাহিদা মতো তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না

এমভি আর রশিদ-১ লাইটার জাহাজের মাস্টার মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জ্বালানি তেল না পাওয়ায় বন্দরে আসা বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে পণ্য খালাস করতে যেতে পারছি না আমরা। গত এক সপ্তাহ ধরে পশুর নদীতে লাইটার জাহাজটি আটকে আছে। আমরা তেল পাচ্ছি না।’

এমভি মিমতাজ লাইটার জাহাজের মালিক মো. খোকন বলেন, ‘আমার লাইটার জাহাজে তেল সরবরাহের জন্য মোংলা বাজারের তেল ব্যবসায়ী এসকে এন্টারপ্রাইজকে বলা হয়েছে। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে ডিপো থেকে তাদের ডিলারকে চাহিদা মতো তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। তাই তারা আমাদের তেল দিতে পারছেন না। একই অবস্থা সব জাহাজের। তেলের সংকটে কোনও জাহাজ পণ্য খালাস করতে পারছে না।’

কাঁচামাল সংকটে কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত

রূপসা এলাকায় অবস্থানরত সেভেন সার্কেল সিমেন্ট কারখানার উৎপাদন বিভাগের কর্মকর্তা মো. মামুন বলেন, ‘বন্দরে সিমেন্টের কাঁচামাল নিয়ে আসা আমাদের বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজ সংকটের কারণে পণ্য খালাস করতে পারছি না। এর ফলে প্রতিদিন বাণিজ্যিক জাহাজকে ১৭ হাজার মার্কিন ডলার মাশুল দিতে হচ্ছে। যত দেরি হচ্ছে তত মাশুল বাড়ছে। আমাদের কারখানায় কাঁচামালেরও সংকট দেখা দিয়েছে। আবার লাইটার জাহাজ সংকটে কারখানার উৎপাদিত সিমেন্ট বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো যাচ্ছে না।’ 

বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে

শেখ সিমেন্ট কারখানার এজিএম আজাদুল হক বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে বন্দরে অবস্থানরত বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে কাঁচামাল আমাদের কারখানায় নিতে পারছে না লাইটার জাহাজ। আমাদের মালিকানায় সিমেন্ট ও অটোরাইচ মিলে কাঁচামালের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কারখানায় কর্মরত শ্রমিকরাও বসে আছে। কাঁচামাল নিয়ে বন্দরে জাহাজ এসে আটকে আছে। কিন্তু খালাস করতে পারছে না লাইটার জাহাজগুলো। তেলের সংকট। আমরা নিরুপায় হয়ে বসে আছি।’ 

ডিপো থেকে কম তেল দেওয়া হয়

মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের মোংলার মেরিন ডিলার ও এজেন্ট মেসার্স নুরু অ্যান্ড সন্সের মালিক এইচ এম দুলাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার খাল খনন, নদী ড্রেজিং, কৃষি উৎপাদন, আমদানি-রফতানি বৃদ্ধিসহ নানা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর ফলে তেলের চাহিদা বেড়েছে। মোংলা বন্দরে বাণিজ্যিক জাহাজের আগমনও বেড়ে গেছে। আগের চেয়ে বেশি লাইটার জাহাজ জ্বালানি তেল নিতে মোংলায় আসছে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী ডিপো থেকে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না আমাদের। তাই আমরা তেল দিতে পারছি না।’

মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের মোংলার ম্যানেজার (অপারেশনস) প্রকৌশলী প্রবীর হীরা বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি ডিলার বা এজেন্টদের তেল সরবরাহ করতে। তবে যেহেতু যুদ্ধের একটি প্রভাব রয়েছে সেহেতু তেলের প্রাপ্যতা কম থাকায় সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক সরবরাহ করা হচ্ছে। বেশি দেওয়ার সুযোগ নেই।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
জ্বালানি খাতে আট মাসে ৪১২ কোটি ডলার ভর্তুকি
সংঘাতের শঙ্কার মধ্যেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিম্নমুখী
হরমুজে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ডুবলো ২ জাহাজ, প্রাণ গেলো নাবিকের
সর্বশেষ খবর
২৩০০ আবেদন করে চাকরিহীন প্রিন্সটনের পিএইচডি ধারী
২৩০০ আবেদন করে চাকরিহীন প্রিন্সটনের পিএইচডি ধারী
কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে এক নোটিশে ছাঁটাই ৭৩৯ শ্রমিক-কর্মচারী
কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে এক নোটিশে ছাঁটাই ৭৩৯ শ্রমিক-কর্মচারী
‘দোকানদাররা বলে দাম কমেছে, কিন্তু কীভাবে বা কতটুকু কমে আমরা বুঝতে পারি না’
‘দোকানদাররা বলে দাম কমেছে, কিন্তু কীভাবে বা কতটুকু কমে আমরা বুঝতে পারি না’
‘ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে, চোখ খুলেই দেখি পাশে চার লাশ’
‘ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে, চোখ খুলেই দেখি পাশে চার লাশ’
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির