২০ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি সমান-মজুরি

পুরুষ শ্রমিকের মজুরি ৮০০, নারীদের কেন ৫০০ টাকা?

আসাদুজ্জামান সরদার, সাতক্ষীরা
০১ মে ২০২৬, ০৯:০১ আপডেট : ০১ মে ২০২৬, ০৯:০১

২০০৬ সালে ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন’ পাস করা হলেও ২০ বছরেও সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে তার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়নি। একই সময় ও সমপরিমাণ কাজ করেও পুরুষের তুলনায় কম মজুরি পাচ্ছেন নারী শ্রমিকরা। ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হয়ে জীবিকা নির্বাহে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। 

নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপকূলীয় এলাকায় পুরুষের পাশাপাশি নারীরা কাঁকড়া খামার, ঘের, নদীতে রেণু আহরণ, নদীতে মাছ ধরা, রাজমিস্ত্রির সহকারী, মাটিকাটা, গ্রামীণ রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার ও কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। এসব কাজে তারা বছরের পর বছর মজুরি-বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। 

শ্রম আইনে কী আছে

২০০৬ সালে ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন’ পাস করা হয়। যার মধ্যে সমকাজের জন্য নারী ও পুরুষের সমান মজুরির বিধান অন্তর্ভুক্ত আছে। আইনের ৩৪৫ ধারায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একই প্রকৃতির বা সমমূল্যের কাজের জন্য নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের সমান মজুরি দিতে হবে। শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা, মজুরি নিশ্চিতকরণ, এবং লিঙ্গ বৈষম্য দূর করে শ্রম পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে এই আইন পাস করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও কৃষি ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে সফটশেল কাঁকড়া চাষ। এই খাতকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান। যেখানে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নারী। কাঁকড়া খামারে খাবার দেওয়া, কাটিং, শেল সংগ্রহ, বাছাই ও পরিষ্কারসহ নানা কাজে পুরুষের পাশাপাশি সমানতালে কাজ করছেন নারীরা। প্রতিদিন নির্ধারিত সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম করলেও মজুরির ক্ষেত্রে রয়ে গেছে বৈষম্য। একই কাজের জন্য পুরুষ শ্রমিক যেখানে ৫০০ টাকা মজুরি পান, সেখানে নারী শ্রমিকদের দেওয়া হয় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা।

কী বলছেন নারী শ্রমিকরা

এমন বৈষম্যের কথা জানিয়েছেন শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী এলাকার নারী শ্রমিক রিনা খাতুন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘আমি কাঁকড়ার খামারে কাজ করি। সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। মাসিক বেতন সাড়ে সাত হাজার টাকা। আমার সঙ্গে একই কাজ করে একজন পুরুষ সহকর্মী বেতন পান নয় থেকে সাড়ে নয় হাজার টাকা। খামারের অনেক কঠিন কাজ করি। বাকিরা আমার চেয়ে সহজ কাজ করেন, কিন্তু পুরুষ হওয়ায় তাদের বেতন বেশি। বারবার বেতন বাড়াতে বললেও কাজ হয় না।’

নারী শ্রমিক মর্জিনা বেগম বলেন, ‘আমি ধান কাটা শ্রমিকের কাজ করি। কাজে কোনও কমতি রাখি না, তারপরও মূল্যায়ন করা হয় না। একবেলা কাজ করলে পুরুষ পান ৮০০ আর আমি পাই ৫০০ টাকা। পুরুষের সমান মজুরি পেলে একটু স্বস্তি পেতাম। আমরা তো পুরুষের সমানই কাজ করি। তবু আমাদের মজুরি কম।’

একসঙ্গে শ্রমিকের কাজ করেন কামরুল মল্লিক ও আলেয়া বেগম বেগম দম্পতি। কামরুল মল্লিক বলেন, ‘আমি আর আমার স্ত্রী প্রতিদিন একসঙ্গে রাস্তার ইট ভাঙার কাজ করি। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত একই কাজ করি, পরিশ্রমও সমান। কিন্তু মজুরির সময় দেখি আমার স্ত্রী আমার চেয়ে ২০০ টাকা কম পান। এটা একেবারেই অন্যায়। আমরা চাই, নারী-পুরুষ ভেদাভেদ না করে সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করা হোক।’

মজুরি-বৈষম্য টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা

শুধু কাঁকড়া-শিল্পেই নয়, মাটিকাটা, কৃষিকাজ ও ইটের ভাটাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও নারীরা সমান কাজ করেও কম পারিশ্রমিক পাচ্ছেন। বছরের পর বছর ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। উপকূলীয় অঞ্চলে নারীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা সংস্থার দায়িত্বশীলদের ভাষ্যমতে, উপকূলীয় এলাকায় কাঁকড়া-শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হলেও নারী-পুরুষের মজুরি-বৈষম্য টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বৈষম্য দূর করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

উপকূলে নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ক্রিশ্চিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ (সিসিডিবি)। সংস্থাটির শ্যামনগর উপজেলার কো-অর্ডিনেটর স্টিভ রায় রূপন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নারীরা শ্রমবাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই বৈষম্য দূর করতে হলে শুধু সচেতনতা নয়, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করা মৌলিক অধিকার। স্থানীয় প্রশাসন, মালিকপক্ষ ও সচেতন মহলের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়।’

জেলা প্রশাসক মিজ্ আফরোজা আখতার বলেন, ‘শ্রম আইন ও আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে এক নোটিশে ছাঁটাই ৭৩৯ শ্রমিক-কর্মচারী
মেনোপজ নিয়ে এই ভুল ধারণাগুলো জানেন তো?
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সর্বশেষ খবর
‘লুপাস’ রোগে ভুগছেন সেলেনা গোমেজ, বদলে গেছে কণ্ঠ
‘লুপাস’ রোগে ভুগছেন সেলেনা গোমেজ, বদলে গেছে কণ্ঠ
সরকার চায় ঐক্য, কিন্তু একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি : প্রধানমন্ত্রী
সরকার চায় ঐক্য, কিন্তু একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি : প্রধানমন্ত্রী
দাঙ্গা-লুটপাটে উত্তাল ফ্রান্স, পিএসজি-বার্সা ম্যাচ নিয়ে যা জানা গেলো
দাঙ্গা-লুটপাটে উত্তাল ফ্রান্স, পিএসজি-বার্সা ম্যাচ নিয়ে যা জানা গেলো
নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে বাড়ি ফেরা হলো না আনোয়ারের
নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষ নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে বাড়ি ফেরা হলো না আনোয়ারের
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির