গোপন রাজনীতির এক চিরকুমার তাত্ত্বিক নেতা, ‘ক্রসফায়ারে’ শেষ পরিণতি

হেদায়েৎ হোসেন, খুলনা
০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০১ আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০১

মোফাখখার চৌধুরী ছিলেন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী বা পিবিসিপি) একটি অংশের শীর্ষ নেতা ও সাধারণ সম্পাদক। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থি রাজনীতিতে ছিল তার দীর্ঘ পথচলা। অনুসারীদের কাছে তিনি বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিলেন। এর মধ্যে শহীদ হোসেন ও মাস্টার প্রভাকর ছিল অন্যতম। পাশাপাশি আজীবন চিরকুমার ছিলেন মোফাখখার চৌধুরী।  

কুষ্টিয়ার মর্গে পড়েছিল মোফাখখার চৌধুরীর লাশ। পুলিশ বলেছিল, পরিবারের সদস্য ছাড়া কারও হাতে লাশ দেবে না। লাশ না নিলে বেওয়ারিশ হিসেবে তারা দাফনের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সামাজিক কারণে লাশ আনতে যাননি পরিবারের কোনও সদস্য।

এরপর একরাতে গোপনে গিয়ে কুষ্টিয়া পুলিশের কাছ থেকে লাশ বুঝে নেন পরিবারের সদস্যরা। সে রাতেই লাশ নিয়ে ফেরেন ফেঞ্চুগঞ্জের গ্রামে বাড়িতে। ভোর হওয়ার আগে কেউ টের পাবার আগেই তারা গ্রাম থেকে চলে আসেন। মানে জানাজা দাফনেও তারা অংশ নেননি। পরে পরিবারের সদস্যরা গ্রামবাসীর সঙ্গে মিলে চিরকুমার এই নেতার জানাজা দাফনের ব্যবস্থা করেন। ১৫ দিন তার বাড়িতে পাহারায় ছিল পুলিশ।

মোফাখখার চৌধুরী ছিলেন বাম রাজনীতির একজন প্রবীণ তাত্ত্বিক নেতা। রাজনৈতিক মহলে তার ইতিবাচক পরিচিতি ছিল। এ কারণে ২০০৪ সালে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তার মৃত্যুর পর রাজনৈতিক মহলে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। ওই ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে প্রথম বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছিল র‌্যাব।

মোফাখখারুল ইসলাম চৌধুরী (মোফাখখার চৌধুরী) সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার নিজামপুর গ্রামে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলেন এবং তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। পরবর্তীকালে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিভিন্ন চরমপন্থি দলের নেতৃত্ব দেন।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলায় অপরাধ তৎপরতা ঠেকানো জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৯ সালে চরমপন্থি গ্রুপগুলোর জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিল। সে সময় চরমপন্থি দলের প্রায় ৭০০ সদস্যকে আনসার বাহিনীতে অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকরিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেকে চাকরি ছাড়েন কয়েক বছরের মধ্যেই। ১৯৯৯ সালে আত্মসমর্পণের পরও চরমপন্থি গ্রুপগুলোর তৎপরতা অব্যাহত ছিল। কিন্তু ২০০৪ সালে র‍্যাব গঠনের পর থেকে দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে। র‍্যাব এবং পুলিশের হাতে চরমপন্থি দলের কয়েকশ সদস্য নিহত হন। যদিও র‍্যাব এবং পুলিশ দাবি করে যে অভিযানের সময় তারা ক্রসফায়ারে মারা যান।

সবচেয়ে সাড়া জাগানো ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনা ছিল মোফাখখার চৌধুরী। তিনি ছিলেন গোপন রাজনৈতিক দল পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির একজন শীর্ষ নেতা। ২০০৪ সালে ঢাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে র‍্যাব। পরবর্তীতে র‍্যাব-এর তরফ থেকে জানানো হয়, তিনি ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন। মোফাখখার চৌধুরী নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কিছু বৃদ্ধিজীবী।

মোফাখখার ছিলেন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির একটি অংশের নেতা। র‌্যাবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার মিরপুর এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। পরদিন ১৭ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ায় র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তিনি নিহত হন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কমরেড আব্দুল হক (যশোর) যখন চরমপন্থি সংগঠনের কার্যক্রম শুরু করেন, তখন তার সঙ্গে ছিলেন তোয়াহা, হেমন্ত সরকার, বিমল বিশ্বাস, খুলনার জীবন মুখার্জী, চুয়াডাঙ্গার আনিছুর রহমান মল্লিক, ঝিনাইদহের আনোয়ার জাহিদ, পাবনার আলাউদ্দীন, টিপু বিশ্বাস, আব্দুল মতিন (ভাষা মতিন), সিলেটের মোফাখখার চৌধুরী ও খুলনার মধুবাবু। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও আদর্শগত বিরোধের জের ধরে ১৯৭৪ সালের দিকে আব্দুল মতিন, আলাউদ্দিন ও লুৎফর রহমান বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বের হয়ে এসে ইপিসিপি গঠন করেন। এর মূল নেতৃত্বে ছিলেন পাবনার টিপু বিশ্বাস।

পরে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আদর্শগত বিরোধের জেরে মোফাখখার চৌধুরী ও মধুবাবুকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর মোফাখখার চৌধুরী ও পাবনার জামাল মাস্টার পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) নামে আরেকটি চরমপন্থি দল গঠন করেন। সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের লক্ষ্যে তারা গোপনে সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ ঘটাতে থাকেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে দলের হাল ধরবেন—এমন শিক্ষিত যুবকদেরও খুঁজতে থাকেন।

১৯৮৭-৮৮ সালে পার্টিতে তৃতীয় দফায় ভাঙন দেখা দেয়। মোফাখখার চৌধুরীর সঙ্গে মধুবাবু ও জামাল মাস্টারের মনোমালিন্য হয়। শেষ দুজনের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘লাল পতাকা’ নামে আরেকটি সংগঠন। অন্যদিকে, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির একাংশ তোয়াহার সঙ্গে সাম্যবাদী দলে যোগ দেয়। ইপিসিপির অন্যরা গঠন করে কমিউনিস্ট লীগ, যা পরবর্তীকালে ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

২০০০ সালের দিকে দল বদল করে মোফাখখার চৌধুরী পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টিতে (এমএল) যোগ দেন। তার সঙ্গে যোগ দেন ঝিনাইদহ জেলার বিষয়খালী গ্রামের আব্দুর রশীদ মালিথা ওরফে তপন, যিনি দাদা তপন নামেও পরিচিত ছিলেন।

মোফাখখার চৌধুরী খুলনা-যশোর এলাকায় শিমুল, পলাশ, তুষার, চন্দনসহ আরও অনেককে নিয়ে দল পরিচালনা করতে থাকেন। তপনকে দেওয়া হয় বৃহত্তর কুষ্টিয়ার দায়িত্ব। একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে মোফাখখার ও তপনের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ২০০২ সালের দিকে তপন-মোফাখখার দ্বন্দ্বে দলটি বিভক্ত হয়ে যায়। তপন গঠন করেন ‘জনযুদ্ধ’।

এরপর ২০০৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাজধানীর মিরপুর থেকে র‌্যাবের হাতে আটক হন মোফাখখার চৌধুরী। একদিন পর, ১৭ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ায় র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তিনি মারা যান।

মোফাখখার চৌধুরী নিহত হওয়ার পর দলের দায়িত্ব পান চুয়াডাঙ্গার পলাশপাড়ার জামাল ওরফে রবি। শেষ পর্যন্ত রবিও ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। ফলে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব শূন্য হয়ে পড়ে।

 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
‘চাইলেও কম দামে কিছু বিক্রি করতে পারি না’, নিত্যপণ্যের বাজারে অস্বস্তি
তুই তার কে? মেয়ে না প্রেমিকা?
সমুদ্রের ধারে দাঁড়ালেই বাতাস এত জোরে লাগে কেন?
সর্বশেষ খবর
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেকের সভা চলছে
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেকের সভা চলছে
মেসির বিদায়ী ম্যাচের পর স্কালোনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে যা বললেন
মেসির বিদায়ী ম্যাচের পর স্কালোনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে যা বললেন
যে কারণে বন্ধ হয়েছিল ৩০ ব্যাংকের এটিএম-অনলাইন সেবা
যে কারণে বন্ধ হয়েছিল ৩০ ব্যাংকের এটিএম-অনলাইন সেবা
ব্যস্ত দিন কাটছে প্রতিমা শিল্পীদের
ব্যস্ত দিন কাটছে প্রতিমা শিল্পীদের
সর্বাধিক পঠিত
ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে নতুন গাইডলাইন দিলো আইভ্যাক
ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে নতুন গাইডলাইন দিলো আইভ্যাক
১৯৪৭ সালের পর আসাম থেকে বাংলাদেশে আসছে প্রথম কোনও নৌযান
১৯৪৭ সালের পর আসাম থেকে বাংলাদেশে আসছে প্রথম কোনও নৌযান
মান-অভিমান ভুলে এক মঞ্চে ফিরছেন জিৎ-দেব
মান-অভিমান ভুলে এক মঞ্চে ফিরছেন জিৎ-দেব
‘মানবিক’ বিবেচনায় যুব মহিলা লীগ নেত্রীর মুক্তি চাইলেন ছাত্রদল নেতা
‘মানবিক’ বিবেচনায় যুব মহিলা লীগ নেত্রীর মুক্তি চাইলেন ছাত্রদল নেতা
কবে বিয়ে করবেন কেয়া পায়েল, জানালেন নিজেই
কবে বিয়ে করবেন কেয়া পায়েল, জানালেন নিজেই