মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন নেত্রকোনার দূর্গাপুর উপজেলার কয়েক হাজার কয়লা শ্রমিক। এই সিন্ডিকেট সোমেশ্বরী নদীর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশের বিভিন্ন ঘাটের শ্রমিকদের কাছ থেকে অল্প দামে কয়লা কিনে থাকে এবং পরে দিগুণ দামে তা বড় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে। সিন্ডিকেটের কারণে হাড়ভাঙা খাটুনির পরও শ্রমিকরা কয়লার ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এদিকে, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ না থাকায় বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকারও।
কয়লা শ্রমিকরা জানান, বিরিশিরি ইউনিয়ন পরিষদের পেছন থেকে শুরু করে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত সোমেশ্বরী নদীর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশে কয়লা পাওয়া যায়। নদীর তলদেশের বালির ভেতর থেকে কয়লা তুলে আনেন প্রায় পাঁচ থেকে সাত হাজার শ্রমিক। কয়লা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে শ্রমিকরা নামমাত্র দামে কয়লা বিক্রি করতে বাধ্য হন। এ বছর দু’বারের বন্যায় ফসল হারিয়ে অনেকটা বাধ্য হয়ে স্কুল পড়ুয়া শিশুদেরও এ কাজে নামিয়েছেন অনেক শ্রমিক।
দূর্গাপুর উপজেলার ফারংপাড়া গ্রামের কুলসুমা বেগম জানান, তিন সন্তানকে নিয়ে কয়লা তুলে দিনে পাঁচ থেকে আটশ’ টাকা আয় করেন তিনি। প্রতিমণ কয়লা দেড়শ’ থেকে তিনশ’ টাকায় বিক্রি করে থাকেন কুলসুমা । তার দাবি, ন্যায্য মূল্য পেলে তিনি দিনে একহাজার থেকে ১২শ’ টাকা উপার্জন করতে পারতেন। কিন্তু সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি থাকায় পর্যাপ্ত উপার্জন করতে পারছেন না।
একই এলাকার সাবেক এক ইউপি সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দু’বারের বন্যায় ফসলের ক্ষতি হওয়ায় এখন সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে কয়লা তুলতে হচ্ছে। তিনি জানান, এ এলাকায় পাঁচ থেকে সাত হাজার কয়লা শ্রমিক রয়েছেন। কিন্তু তারা কেউই চিহ্নিত ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না।
বিরিশিরি এলাকার কুদ্দুছ মিয়া জানান, কয়লা তোলা অনেক কষ্টের কাজ। কিন্তু বিক্রি করার সময় তারা সেই কষ্টের ন্যায্য দাম পান না। কম দামে কয়লা কেনার জন্য মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটটি নানা ফাঁদ পেতে রেখেছে।
তবে কয়লা কিনতে আসা ব্যবসায়ী ফরিদ আহমদ ফাঁদ পাতার অভিযোগ অস্বীকার করেন। উল্টো তিনি শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মাপে কয়লা কম দেওয়ার অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ভেজা কয়লা কিনি। এরপর তা শুকিয়ে বিক্রি করি। শুকানোর পর কয়লার পরিমাণ কমে যায়। তাই আমরা যে দামে কয়লা কিনি, তার দিগুণ দামে তা বিক্রি করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে দিন নদীর ঘাটে ব্যবসায়ী (মধ্যস্বত্বভোগী) বেশি আসেন, সে দিন কয়লার দাম বেশি থাকে। আবার ঘাটে ব্যবসায়ীদের আনাগোনা কম হলে কয়লার দামও কম থাকে।’
এ ব্যাপারে শ্রমিকদের ভাষ্য, সিন্ডিকেট থাকায় মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীদের সবাই ঘাটে আসেন না। কম দামে কয়লা কেনার জন্য একেক দিন একেক ব্যবসায়ী ঘাটে আসেন। তারপর নানা অজুহাত দেখিয়ে কয়লা কিনতে অনিহা দেখান এবং একপর্যায়ে নামমাত্র দামে কয়লা কেনেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা সরকারের ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা করে আসছেন।
এ ব্যাপারে দূর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুনুর রশীদ জানান, সোমেশ্বরী নদী থেকে প্রতিদিন প্রায় অর্ধকোটি টাকার কয়লা তোলেন শ্রমিকরা। তিনি বলেন, ‘কয়লা শ্রমিকরা যাতে ন্যায্য মূল্য পান, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজস্ব না দিয়ে যারা ব্যবসা করছেন, তাদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’







