কুষ্টিয়ার ছয় রাস্তার মোড়ে অবস্থিত ‘খেয়া রেস্তোরাঁ’ নামের আবাসিক হোটেলে ৬ মার্চ দিবাগত রাতে এক মার্কিন নারী সাংবাদিককে হেনস্তার ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারী নারী সাংবাদিক ও হোটেল মালিকের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী হওয়ায় মূল ঘটনা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না।
ওই নারী সাংবাদিকের অভিযোগ, ওই দিন (৬ মার্চ) রাত ১টার দিকে হোটেল মালিক বিশ্বনাথ সাহা বিশু মদ্যপ অবস্থায় তার রুমে প্রবেশ করতে চেয়ে মোবাইলে কল দেন। কল না ধরায় দরজায় ধাক্কাধাক্কি করেন। এমনকি অন্য একটি চাবি দিয়ে দরজা খোলার চেষ্টাও করেন বিশু।
তবে এই অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া হোটেল মালিক বিশু বলেন, ‘ওই নারীর রুমে উচ্চ শব্দে গান বাজানো হচ্ছিল। হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে মোবাইলে অভিযোগ আসায় কী সমস্যা হয়েছে, আমরা তা খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম।’
ওই সাংবাদিকের দাবি, ঘটনার সময় রুমে তিনি একা ছিলেন। একজন নারী হিসাবে ওই সময় তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় তিনি তার বাংলাদেশি সহকর্মী কুষ্টিয়ার সাংবাদিক আলী এহসানকে মোবাইলে ঘটনাটি জানান। আলী এহসান ঘটনাস্থলে পৌঁছে কয়েকজনের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করেন।
ওই সাংবাদিক জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে জমা দেয়া অভিযোগপত্রে লেখেন, ‘এখানে না এলে জানতে পারতাম না মফস্বলের নারীরা কতটা বৈষম্যের শিকার।’ এছাড়াও, স্থানীয় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে ওই দুই হোটেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি। এ ঘটনায় কুষ্টিয়া মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
গত রবিবার (১২ মার্চ) কুষ্টিয়ার ওই দুই কর্মকর্তার কাছে বিদেশি ফটো সাংবাদিকের পক্ষে অভিযোগটি জমা দেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক সুফি ফারুক ইবনে আবু বকর। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নারীদের নিয়ে কাজ করতে কুষ্টিয়া গিয়েছিলেন ওই মার্কিন ফ্রিল্যান্স ফটোসাংবাদিক।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার (১৩ মার্চ) পুলিশ বিশ্বনাথ সাহা বিশুকে আটক করে। ওইদিন বিকালে ৫৪ ধারায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
নারী সাংবাদিককে উদ্ধারকারী কুষ্টিয়ার স্থানীয় সাংবাদিক আলী এহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওই নারী সাংবাদিকের ফোন পেয়ে আমি দ্রুত মোটরসাইকেলে করে হোটেলে যাই। কিন্তু হোটেলের নিরাপত্তারক্ষীরা আমাকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেন। পরে আরও কয়েকজনের সহযোগিতায় ওই সাংবাদিকে উদ্ধার করি।’
এহসান জানান, ওই নারী সাংবাদিককে শহরের রোজ ভিউ হোটেলে নিয়ে গেলে হোটেল কর্তৃপক্ষ রুম ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে একটি এনজিও’র রেস্ট হাউসে ওঠেন তিনি।
এদিকে, ওই নারী সাংবাদিক তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ওই রাতেই ফেসবুকে একটি পোস্ট দিলে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
এ প্রসঙ্গে খেয়া হোটেলের মালিক পক্ষের অজয় সুরেখা বলেন, ‘বিশ্বনাথ সাহা বিশুর বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। এসব নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাই না।’
এদিকে, বিশ্বনাথ সাহা বিশু এক সময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে জানা গেছে। স্থানীয় বারখাদা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশু ১৯৯২ সালে বারখাদা ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডে মেম্বার নির্বাচিত হন। সীমানা জটিলতায় ওই ইউনিয়নে দীর্ঘদিন নির্বাচন স্থগিত থাকায় তিনি টানা ২৪ বছর ওই পদে আসীন ছিলেন। ২০১৬ সালে সীমানা নির্ধারণের পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তাতে অংশ নেননি বিশু।’
আব্দুর রাজ্জাক জানান, ওয়ার্ড মেম্বার থাকাকালীন বিশু বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তবে পরে তিনি রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহাবুদ্দিন চৌধুরী বৃহস্পতিবার (১৬ মার্চ) দুপুরে বলেন, ‘নারী সাংবাদিক হেনস্তার বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। খেয়া রেস্তোরাঁর সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কিনা, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
/বিএল/টিআর/







