আসল আসামির পরিবর্তে আটদিন ধরে কারাগারে রয়েছেন মোজাফফর রহমান (৫০) নামে এক রিকশাচালক। গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় একটি শিশুকে ধর্ষণ চেষ্টা মামলায় মোজাফফর বর্তমানে কারাগারে আছেন। মোজাফফরের বাড়ি উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের নলছিয়া গ্রামে। আর ওই মামলার আসল আসামি হচ্ছে একই গ্রামের ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম। ঘটনাটি সোমবার স্থানীয় সাংবাদিকদের নজরে আসে।
তিন ছেলে, স্ত্রী ও মাকে নিয়ে ছয় সদস্যের সংসার মোজাফফরের। বড় ছেলে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। বাকি দুই ছেলে নবম ও প্রথম শ্রেণির ছাত্র।
মোজাফফরের স্ত্রী সেলিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার স্বামী ঢাকার মগবাজারে প্রায় ১০ বছর ধরে রিকশা চালান। দুই-তিন মাস পরপর বাড়িতে আসেন। কয়েকদিন থেকে আবারও চলে যান। নজরুলের ভাই মজনু মিয়া ফুঁসলিয়ে তাকে আদালতে নিয়ে যায়। আমরা এর বিচার চাই।’
মোজাফফরের মা মজিদা বেগম বলেন, ‘তোমরা হামার ছোলোক আনি দাও। তার কোনও দোষ নাই।’
মামলার বাদী শিশুটির মা বলেন, ‘আমি নজরুলকে একমাত্র আসামি করে মামলা করি। অথচ মজনু মিয়া মামলা থেকে ভাইকে বাঁচানোর জন্য মোজাফফরকে ফাঁসিয়েছে।’
আসামি নজরুলের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। এলাকাবাসী জানায়, নজরুলের নামে মামলার পর থেকে তার বাড়ির সবাই গা-ঢাকা দিয়েছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আবু বকর সিদ্দিক জানান, মোজাফফরকে ১০ এপ্রিল নজরুল সাজিয়ে গাইবান্ধা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতে আত্মসমর্পণ করিয়ে জামিন আবেদন করা হয়। আদালত আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ১১ এপ্রিল পুনরায় একই আদালতে জামিনের আবেদন জানানো হয়। আদালত ফের তা নামঞ্জুর করেন। এরপর থেকেই তিনি কারাগারে।
জেলা কারাগার কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে মোজাফফরের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমিঢাকায় রিকশা চালাই। ছেলের এইচএসসি পরীক্ষার কারণে ১ এপ্রিল বাড়িতে আসি। ১০ এপ্রিল নজরুলের বড়ভাই মজনু মিয়া আমাকে বলেন, তোমার নামে মামলা হয়েছে। তোমাকে গাইবান্ধায় আদালতে যেতে হবে। শুনে আমি হতবাক হয়ে পড়ি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে অটোরিকশায় করে আদালতে আনে। তিনি আমাকে শিখিয়ে দেন, মামলায় নজরুল লেখা আছে এবং বাবার নাম আছে মইচউদ্দিন। তুমি আদালতে তোমার নাম নজরুল ও বাবার নাম মইচ উদ্দিন বলবে। এরপর তো আমাকে কারাগারে পাঠানো হয়। আমি কোনও অপরাধ করিনি, আমার নামে কোনও মামলা আছে বলেও জানা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভোটার আইডি কার্ডে আমার নাম মোজাফফর রহমান। বাবার নাম মৃত ছিদ্দিক বেপারী লেখা। আমার গ্রামের নাম নলছিয়া।’
মামলার বিবরণী অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দুপুরে নলছিয়া গ্রামে আট বছরের একটি শিশুকে নজরুল ধর্ষণের চেষ্টা করেন। এই ঘটনায় শিশুটির মা ২০১৬ সালের ৩ জানুয়ারি সাঘাটা থানায় মামলা করতে যান। কিন্তু থানায় মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায় পুলিশ। পরে ৬ জানুয়ারি শিশুটির মা গাইবান্ধা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতে মামলা করেন। আদালত সাঘাটা থানা পুলিশকে মামলা তদন্তের নির্দেশ দেন। সাঘাটা থানা পুলিশ ঘটনাটি মিথ্যা বলে ৮ ফেব্রুয়ারি আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে। গত বছরের ৩ মার্চ বাদী ওই প্রতিবেদনের ওপর আদালতে নারাজি আবেদন করেন। পরে আদালত ঘটনাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন। বিচারিক হাকিম সাক্ষী নিয়ে ঘটনার সত্যতা পেয়ে ২৯ মার্চ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরপর আদালত নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। তখন থেকেই নজরুল পলাতক।
নজরুলের বড় ভাই মজনু মিয়া মুঠোফোনে বলেন, ‘গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর থেকে আমার ভাই পলাতক ছিল। ৩০ মার্চ জামিন নেওয়ার জন্য তাকে বাড়িতে ডেকে এনে অন্য গ্রামে রাখি। পরদিন দেখি সে নেই। পরে এক উকিল ও মুহুরির কথা মতো মোজাফফরকে জোর করে গাইবান্ধা নিয়ে যাই। তাকে বলি আমার ভাই নেই, তুই আদালতে উঠবি আর নামবি। অথচ জামিন নামঞ্জুর হবে আমরা ভাবিনি।’
গাইবান্ধা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘১০ এপ্রিল ঘটনাটি আমাদের নজরে আসেনি। আইনজীবীদেরও সব আসামি চিনে রাখা সম্ভব হয় না। হয়তো কোনোভাবে এমনটা হয়ে যেতে পারে। তবে এমন হলে বাদীর মাধ্যমে মূল আসামি চিহ্নিত করতে হবে। আসামি চিহ্নিত হলে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হবে।’
/বিএল/এসটি/








