পেটের তাগিদে প্রতিদিনই সুন্দরবন তীরবর্তী দুবলার চরের শুঁটকি পল্লিতে কাজ করতে আসছে শিশুরা। জেলে-মহাজনদের অর্থের লোভে পড়ে অভিবাবকরাও শিশুদের বঙ্গোপসাগরের চরাঞ্চলে পাঠাচ্ছেন। ছয় মাসের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের বিনিময়ে সামান্য মজুরি পাচ্ছে এই শিশুরা। একদিকে অক্লান্ত পরিশ্রম, অন্যদিকে সামান্য ভুলের কারণে তাদের নির্মম-নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে চরাঞ্চলে শুঁটকি পল্লিগুলোয় শিশুশ্রম ও নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, শিশুশ্রম বন্ধে সরকারের তরফ থেকে নানা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তীরবর্তী দুবলার চরের শুঁটকি পল্লিতে এর কোনও প্রতিফলন ঘটেনি। সমুদ্রের লোনা পানি আর রোদে পুড়ে হাড়ভাঙা খাটুনি এখন যেন শিশুদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের অন্তত ছয়মাস এভাবে কাজ করছে তারা। এই পরিশ্রমের জন্য এক মৌসুমে তারা মজুরি হিসেবে পায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা।
দুবলার চরের আলোরকোলে গিয়ে দেখা যায়, সাগর থেকে ধরে আনা কাঁচা মাছের শুঁটকি তৈরিতে ব্যস্ত শিশুরা। তারা জানায়, পেটের তাগিদে সাগরে আসতে হয়েছে। অর্থের অভাবে পড়ালেখা বন্ধ হয়েছে আরও আগেই। বাবা-মাও কাজের জন্য চাপ দিয়েছে। এখানে আসার পর মাছ শুকানো থেকে শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ পর্যন্ত সব ধরনের কাজই তাদের করতে হয়। রামপাল উপজেলার শহিদ মল্লিক নামে এক জেলে মহাজন তাদের এই চরে নিয়ে এসেছে বলে জানায় শিশু শ্রমিকরা।
গত ২৫ অক্টোবর খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার থেকে দুবলার চরে আসে মো. মামুন শেখ (১১) ও নেছার উদ্দিন (১৩)। তারা জানায়, আগামী ছয়মাস তারা এই চরেই থাকবে। এ কাজে প্রত্যেককে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হবে। এই টাকার অর্ধেক অগ্রিম তাদের অভিবাবকের হাতে দিয়ে তাদের চরে আনা হয়েছে।
তারা আরও জানায়, সূর্য ওঠার আগেই খালি পেটে কাজে নামতে বাধ্য করেন মহাজনরা। সকাল ৮ টার দিকে চা-বিস্কুট দিয়ে আবার কাজে পাঠানো হয়। দুপুর দেড়টার আগে ভাত দেওয়া হয় না কখনও। এর ভেতর কাজে ফাঁকি হলেই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এমনকি শারীরিক নির্যাতন করা হয়। কোনও কোনও শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয় বলেও তারা জানায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলে মহাজন শহিদ মল্লিক বলেন, ‘তাদের দিয়ে শুধু কাজ করানো হয়, কোনও রকম নির্যাতন করা হয় না।’ আইন লঙ্ঘন করে শিশুদের দিয়ে কাজ করানো ঠিক হচ্ছে কিনা জবাবে তিনি বলেন, ‘তাদের দিয়ে কাজ করানো যাবে না তা আমার জানা ছিল না।’
রামপাল উপজেলার পেড়িখালী ইউনিয়নের আ. কাউয়ুমের ছেলে মো. আলামিন (১২) জানায়, ‘আমরা দুবলার চরে মাছ শুঁটকি দেওয়ার কাজ করতে এসেছি। সাগর থেকে মাছ ধরে এনে তা শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করি। অনেক কষ্ট হলেও কিছু করার নেই।’ আলামিনের মতো অনেক শিশু-কিশোর দেখা যায় দুবলার চরের আলোরকোল, শেলার চর, নারকেল বাড়িয়া, কোকিলমনিসহ বেশ কয়েকটি চরে শুঁটকি তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকতে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনা বিভাগের সমন্বয়কারী অ্যাড. মো. মোমিনুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে কোনও শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কোনও কাজে নিযুক্ত করা যাবে না। কিন্তু দুবলার চরে শুঁটকি পল্লিতে কোনও আইন মানা হয় না। সেখানে ১৪ বছরের নিচে অনেক শিশুকে ক্রীতদাসের মতো কাজ করানো হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০০৩ সালে এক অভিযানে দুবলার শুঁটকি পল্লি থেকে ১৪ শিশুকে উদ্ধার করি। এরপর সেখানে শিশু শ্রম কিছুটা কমে। এখন আবার বেড়েছে। আসলে সরকারি মনিটরিং ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত বলেই এই অল্প মজুরি দিয়ে শিশুশ্রমে বাধ্য করা হচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হলে অবশ্যই সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে।’
কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের (মোংলা সদর দফতর) জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মহাম্মদ আলী চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘এ পর্যন্ত কয়েকবার বিভিন্ন চরে অভিযান চালানো হয়েছে। তবে অভিযানকালীন কোনও শিশু চোখে পড়েনি। হয়তো আমাদের উপস্থিতি জানতে পেরে শিশু শ্রমিকদের লুকিয়ে রাখা হয়।’








