বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তমব্রু সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার অংশ থেকে ফাঁকা গুলির শব্দ পাওয়া গেছে। এতে সীমান্তের বাংলাদেশ অংশের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। একইসঙ্গে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও ছুটাছুটি বেড়েছে এ সীমান্তের ‘নো-ম্যানস ল্যান্ডে’ থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যেও। স্থানীয় বাসিন্দা ও নো-ম্যানস ল্যান্ডে থাকা রোহিঙ্গাদের থেকে পাওয়া এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ঘুমধুম ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ও তিন নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. কামাল উদ্দিন ও বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক।
তমব্রু সীমান্তের বাংলাদেশ অংশের বাসিন্দারা জানান, বৃহস্পতিবার (১ মার্চ) রাত ৮টার পর থেকে সীমান্তের মিয়ানমার অংশে তিন দফায় ফাঁকা গুলির শব্দ পাওয়া গেছে।
তমব্রু সীমান্তের বাংলাদেশ অংশের বাসিন্দা মফিজুর রহমান জানান, সীমান্তের মিয়ানমার অংশে বৃহস্পতিবার সকালে সাত ট্রাক সেনাবাহিনী বাড়ানো হয়। এরপর দিনভর সেখানে উত্তেজনা ছিল। এখন থেকে থেকে ফাঁকা গুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
একই তথ্য জানান ইউপি সদস্য মো. কামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, 'তিন দফায় ফাঁকা গুলির শব্দ পাওয়া গেছে।' তার দাবি, ‘বান্দরবানের তমব্রু সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে কাঁটাতারের বেড়ার প্রত্যেকটি খুঁটির সঙ্গে সিঁড়ি (মই) দিয়ে রেখেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এ সিঁড়ি বেয়ে তারা যে কোনও মুহূর্তে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে।' তিনি আরও বলেন, ‘বৃহস্পতিবার পতাকা বৈঠক হওয়ার কথা শুনেছিলাম। কিন্তু পতাকা বৈঠক হয়নি। কেন হয়নি, তা আমি জানি না।’
এদিকে, তমব্রু সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে থাকা রোহিঙ্গা নুরু মিয়া ও জামাল উদ্দিন জানান, মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাত ৮টার পর থেকে গুলি ছুড়ছে। এছাড়া, তারা রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে অস্ত্র তাক করে রেখেছে।
নুরু মিয়া বলেন, ‘যে কোনও মুহূর্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আমাদের ওপর গুলি বর্ষণ করতে পারে। আমরা খুব ভয়ের মধ্যে আছি।’ জামাল উদ্দিন বলেন, ‘সীমান্তে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর পর থেকেই আমরা আতঙ্কে আছি। এখন কয়েক দফা গুলির শব্দে উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে গেছে।’
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক বলেন, ‘যা কিছু হচ্ছে, সবই সীমান্তের ওপারে। ওপারেই মিয়ানমার সেনাসংখ্যা বাড়াচ্ছে। রোহিঙ্গারাও ওপারেই রয়েছে। সীমান্তের আমাদের অংশে কোনও সমস্যা নেই। তারপরও যে কোনও পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।’
বৃহস্পতিবার দুপুরে তমব্রু সীমান্তের বাংলাদেশ অংশের বাসিন্দারা জানান, সীমান্তের শূন্যরেখার পাশে সেনা সমাবেশ করেছে মিয়ানমার। সেই সঙ্গে সীমান্ত ঘেঁষে মোতায়েন করা হয়েছে ভারী অস্ত্র। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ট্রাক, পিকআপ ভ্যান ও লরিতে করে মহাড়া দিচ্ছে মিয়ানমারের সেনাসদস্যরা। আর মাইকিং করে রোহিঙ্গাদের শূন্যরেখা থেকে চলে যেতে বলছে। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক ও ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
এ ঘটনায় আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে পিলখানায় এক তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স অ্যান্ড ট্রেনিং) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুজিবুর রহমান জানান, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে তমব্রু সীমান্তে নিজেদের অংশের প্রায় দেড়শ’ গজের মধ্যে ভারী অস্ত্রসহ মিয়ানমারের অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিষয়টি গভীর পর্যবেক্ষণে রেখে বিজিবির শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
মিয়ানমারের ঢেকিবুনিয়া সীমান্তের তংপিও লিতওয়ে এলাকায় মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে গত ২০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক হয়। কিন্তু বৈঠকের পরও তমব্রু সীমান্তে মিয়ানমারের ভীতি প্রদর্শন থামেনি। আতঙ্কিত হয়ে নো-ম্যানস ল্যান্ডে আশ্রয় নেয়া সাড়ে ৬ হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে অধিকাংশ সরে গেছে তমব্রু সীমান্ত থেকে। আজও বেশ কিছু রোহিঙ্গা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়ে জিরো পয়েন্ট ছেড়ে বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় জড়ো হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
গত ২৬ আগস্ট থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হামলার মুখে প্রাণ বাঁচাতে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তার মধ্যে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের তমব্রু কোনারপাড়ার নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নেয় সাড়ে ছয় হাজার রোহিঙ্গা।








