জেলেদের মাছ ধরার অধিকার কাগজেই, পানিতে নয়

হিমাদ্রি শেখর ভদ্র, সুনামগঞ্জ
২৯ জুন ২০১৮, ০৮:০৮আপডেট : ২৯ জুন ২০১৮, ১৪:৫৪

বাড়ির পাশের এমন অথৈ জলরাশি। কিন্তু জাল ফেলতে পারেন না জেলেরা হাওরের জলমহালের কাগজপত্রে মালিক জেলেরা। তবে পানিতে মাছ ধরার  কার্যত তাদের অধিকার নেই। এ অধিকার অর্থলগ্নিকারী মহাজনদের। মৎস্যজীবীদের নামে জলমহালের ইজারা নেন ওই প্রভাবশালী মৎস্য ব্যবসায়ীরা। প্রকৃত জেলেদের তারা কিছু টাকা দিয়ে মাছ ধরার অধিকার থেকে রাখেন বঞ্চিত। এমনকি ইজারাকৃত জলমহালের সীমানা যথাযথভাবে চিহ্নিত না হওয়ায় জেলেরা তাদের বাড়ির সামনেও জাল ফেলতে পারেন না। যুগ ‍যুগ ধরে চলে আসছে এ অবস্থা।

জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের মো. শাহিন মিয়া জানান জেলেদের এমন দুর্দশার কথা। তিনি বলেন, বাড়ি সামনের হাওরেও জাল ফেলা যায় না। জাল ফেললেই ইজারাদারের নিয়োজিত পাহারাদারের জাল-নৌকা নিয়ে চলে যায়। এ মৎস্যজীবী বলেন, ‘যারা প্রকৃত মৎস্যজীবী তারা অর্থের অভাবে জলমহাল ইজারা আনতে পারি না। তাই বড় বড় মহাজনরা সমিতিতে অর্থলগ্নি করে। কাগজপত্রে জলমহালের মালিক মৎস্যজীবীরা থাকলেও তারা কোনও সুফল পায় না। লাভ চলে যায় অর্থলগ্নিকারী প্রভাবশালীদের পকেটে। তারা আমাদের নামে জলমহাল ইজারা আনেন। পরে নিরীহ জেলেদের হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে তারা বছরের পর বছর জলমহাল ভোগ করেন।’ ফেনারবাঁক গ্রামের মৎস্যজীবী মো. আক্তার হোসেনও বললেন একই ধরনের কথা।

জেলেদের মাছ ধরার অধিকার কাগজেই, পানিতে নয় একই গ্রামের জুলফিকার চৌধুরী রানা বলেন, ‘সবাইকে ম্যানেজ করে অমৎস্যজীবীদের দিয়ে মৎস্যজীবী সার্টিফিকেট আনা হয়। এ কারণে  জলমহালগুলো চলে যায় প্রভাবশালীদের হাতে। হাওরের হতদরিদ্র জেলেদের এত টাকা ইজারা মূল্য দিয়ে জলমহাল ইজারা নেওয়ার সামর্থ্য নেই। এ সুযোগে প্রভাবশালীরা জলমহাল বছরের পর বছর ভোগ দখল করে। আবার কেউ কেউ আইনের ম্যারপ্যাঁচে ফেলে বিনা খাজনায় বছরের পর বছর জলমহাল দখল করে মৎস্য আহরণ করে।

মানিগাঁও গ্রামের মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘বিলের আকার আয়তন ও উৎপাদন ভেদে ডাক ওঠে সর্বনিম্ন কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত। এত টাকা বিনিয়োগ করে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা জলমহাল ইজারা আনতে পারে না। তাই তারা এলাকার প্রভাবশালীদের কাছে নিজেদের ন্যায্য অধিকার বিকিয়ে দেয় সামান্য টাকার বিনিময়ে।

জেলেদের মাছ ধরার অধিকার কাগজেই, পানিতে নয় জলমহাল ইজারা আনতে টাকা, যোগাযোগ, পেশিশক্তি, রাজনৈতিক শক্তি সবই লাগে। তাই হতদরিদ্র জেলেরা সমিতি গঠন থেকে শুরু করে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রভাবশালীদের টাকায়। এজন্য তারা কাগজপত্রে বিলের মালিক হয় বটে। কিন্তু বাস্তবে সুফল ভোগ করে ওই প্রভাবশালীরা। হটামারা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘সরকার জেলেদের হাওরের মাছ ধরার অধিকার শুধু কাগজেই দিয়েছে; পানিতে দেয়নি। কারণ, জলমহালের সীমানা চিহ্নিত না করায় বর্ষাকালে জেলেরা বাড়ির সামনেও জাল দিয়ে মাছ ধরতে পারে না। বিলের পাহারাদাররা তাদের জাল-নৌকা জোর করে নিয়ে যায়। পরে টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে হয়। প্রভাবশালীদের নিয়োজিত ওই পাহারাদারেরা বলে পানি যতদূর, বিলের সীমানাও ততদূর। এ কারণে জেলেরা হাওরের মাছ ধরার কোনও সুযোগ পায় না। এর সুষ্ঠু সুরাহা হওয়া দরকার।

শামছুল ইসলাম খোকন নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘বিলের ইজারাদাররা খুব শক্তিশালী ও প্রভাবশালী। তাদের বিত্তবৈভব ও প্রভাবের কারণে সারাধণ জেলেরা হাওরে মাছ ধরতে সাহস পায় না। একটি বিলের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য শুষ্ক মৌসুমে পাহারাদার কম থাকলেও বর্ষায় দ্বিগুণ হয়। তারা দিনে রাতে দ্রুতগামী নৌকায় চড়ে হাওরে খবরদারি করে বেড়ায়। তাই সাধারণ জেলেরা হাওরে মাছ ধরার কোনও সুযোগ পায় না। এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম বলেন,  ‘সরকারের কাছে মৎস্যজীবীরা হাওর ইজারার জন্য আবেদন করেন। তাদের আমরা হাওর ইজারা দেই। আজ পর্যন্ত কোনও মৎস্যজীবী কোনও অভিযোগ করেননি যে তারা কারও কাছে জিম্মি হয়ে হাওরে মাছ আহরণ করতে পারছেন না। আমাদের কাছে এ ধরনের কোনও অভিযোগ এলে আমরা বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বসহ বিবেচনা করবো। কোনও অভিযোগ এলে তদন্ত করে সমিতিতে কোনও অমৎস্যজীবী পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিই। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ইজারাও বাতিল করা হয়। জেলেদের মাছ ধরার অধিকার কাগজেই, পানিতে নয়

তিনি আরও বলেন, ‘জেলেদের অর্থের ঘাটতি থাকলে তারা সমবায় ব্যাংকের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নিতে পারেন।’ হাওরে জেলেদের মাছ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকার যে জলাশয় বা হাওর যেটা ইজারা দেয় তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট সীমানা চিহ্নিত করা থাকে। সীমানা চিহ্নিত করে দিয়েই ইজারা দেওয়া হয়। গতবার হাওর এলাকার মানুষ অভাবে ছিলেন, তখন হাওরে ইজারাকৃত জলমহালের বাইরে মৎস্যজীবীরা মাছ ধরেছেন। এবারও তাই হবে। যদি কেউ ইজারা দেওয়া জলাশয়ের বাইরে মাছ ধরতে গিয়ে কোনও সমস্যার মুখোমুখি হন তাহলে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

/এএম/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিশ্বকাপের আগে খেলোয়াড়দের নিয়ে সতর্ক ফ্রান্স কোচ
বিশ্বকাপের আগে খেলোয়াড়দের নিয়ে সতর্ক ফ্রান্স কোচ
এক দিনেই ৭০০ তিমি ও ডলফিন হত্যা
এক দিনেই ৭০০ তিমি ও ডলফিন হত্যা
দিল্লিতে আগুনে ৮ বাংলাদেশি আহত, গুরুতর অবস্থা তিন জনের
দিল্লিতে আগুনে ৮ বাংলাদেশি আহত, গুরুতর অবস্থা তিন জনের
ফুল দিয়ে ড. খলিলুর রহমানকে বরণ
ফুল দিয়ে ড. খলিলুর রহমানকে বরণ
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান