গাইবান্ধায় বন্যায় আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি, একজনের মৃত্যু

Send
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৪:০৭, জুলাই ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫৩, জুলাই ১৬, ২০১৯

গাইবান্ধায় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে

গাইবান্ধায় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বন্যায় জেলা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ২৬টি ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের ২১৩টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে দুই লাখ ৫৪ হাজার মানুষ। তবে সবচেয়ে বিপদে আছে সাঘাটা উপজেলার চরাঞ্চল ও নিম্নঞ্চলের ৬৫টি এলাকার ৮৯ হাজার মানুষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত ৭২ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) সকাল ৬টা পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের পানি ১২৮ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ৮৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। করতোয়া নদীর পানিও এখন বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। তবে তিস্তার পানি গত ২৪ ঘণ্টায় হ্রাস পেয়ে বিপদসীমার ৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

অন্যদিকে সোমবার (১৫ জুলাই) বিকালে সুন্দরগঞ্জে বন্যার পানিতে ডুবে আনারুল ইসলাম (৩২) নামে এক যুবকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আনারুল ইসলাম হরিপুর ইউনিয়নের গেন্দুরাম গ্রামের দুলা মিয়ার ছেলে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চেয়ারম্যান নাফিউল ইসলাম জিমি 

বন্যায় ৩০ হাজার ঘরবাড়ি ও ১২ হাজার হেক্টর ফসলি জমি ডুবে গেছে। ভেসে গেছে তিন শতাধিক পুকুরের মাছ। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাঁচাপাকা রাস্তাসহ ব্রিজ ও কালভার্ট। পানিবন্দি অধিকাংশ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে গবাদি পশু নিয়ে আশেপাশের উঁচু জায়গা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে।

দুর্গত এলাকার মানুষ জানায়, অনেকের ঘরেই যা খাবার ছিল তা শেষ হয়ে গেছে। এখন তাদের অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার ও ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। তাই ত্রাণ সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানান তারা। বন্যা দুর্গতরা গবাদি পশু নিয়ে উঁচু এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, পানির প্রবল চাপে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলো ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত দুই দিনে অন্তত ৬টি জায়গার বাঁধ ধসে গেছে। এর মধ্যে ফুলছড়ির কাতলামারী, সদরের গিদারীর বাগুড়িয়া এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের বাঁধ ও ঘাঘট নদীর শহর রক্ষা বাঁধের খোলাহাটির ফকিরপাড়া, সোনাইল ও কুটিপাড়া এলাকার বাঁধ ভেঙে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া সিংড়া, রতনপুর, কামারজানি, বেলকা ও কাপাসিয়া এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের একাধিক জায়গায় বড় বড় গর্ত ও ফাটলসহ ভাঙনের ঝুঁকি রয়েছে। যে কোনও সময় বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আতঙ্কে রয়েছে আশপাশের এলাকার হাজার হাজার মানুষ। 

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘বাঁধের ধসে যাওয়া অংশে জিও ব্যাগ ফেলে মেরামতের চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া ভাঙন ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের অংশগুলোতে কাজ চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজনের সঙ্গে স্থানীয়রাও স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছে। বাঁধের এলাকা জুড়ে নজরদারি ও সার্বক্ষণিক কাজ করছে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।’ 

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হোসেন আলী জানান, ২৪৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বন্যার পানিতে শতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফুলছড়ি ও সদর উপজেলায় চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পাঠদান বন্ধ থাকায় উঁচু এলাকার ১১৫টি বিদ্যালয়ে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এরইমধ্যে ৬০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৪২ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। 

গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) রোকসানা বেগম জানান, বন্যাকবলিত এলাকা, উঁচু জায়গা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও সরকারিভাবে খোলা আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া মানুষের মাঝে ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে জেলা প্রশাসন। গত শুক্রবার থেকে সোমবার পর্যন্ত বন্যাকবলিত এলাকাগুলোর জন্য ৪০০ টন চাল, নগদ ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ২ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া নতুন করে বন্যাদুর্গত মানুষদের তালিকা তৈরি করে ত্রাণ সহায়তার জন্য আরও ৭৫০ টন চাল ও সাড়ে দশ লাখ টাকা এবং পাঁচ হাজার শুকনো খাবার প্যাকেটের চাহিদা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তাছাড়া বন্যাদুর্গত এলাকায় সার্বিক নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জনপ্রতিনিধিরা বন্যা দুর্গত এলাকায় অবস্থান করছেন। 

গাইবান্ধা সিভিল সার্জন ডা. এবিএম আবু হানিফ বলেন, বন্যার্ত মানুষের চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার জন্য চার উপজেলায় ১০০টি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। প্রত্যেকটি টিম বন্যা কবলিত এলাকা ও আশ্রয়স্থানগুলোতে চিকিৎসাসেবা দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ ও খাবার স্যালাইন বিতরণ করছে। 

/জেবি/এমএমজে/

লাইভ

টপ