তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সম্মান প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে চান ভাইস চেয়ারম্যান পিংকি

Send
নয়ন খন্দকার, ঝিনাইদহ
প্রকাশিত : ১৮:০৩, অক্টোবর ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪২, অক্টোবর ১৬, ২০১৯

সাদিয়া আক্তার পিংকিউপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো তৃতীয় লিঙ্গের একজন হিসেবে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন সাদিয়া আক্তার পিংকি। সোমবার (১৪ অক্টোবর) পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে ১২ হাজার ৮৮০ ভোট পেয়ে তিনি বেসরকারিভাবে জয়লাভ করেন। বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ জনপ্রতিনিধি বলেন, কোটচাঁদপুরের জনগণের উন্নয়ন ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সম্মান এবং অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি। এ কাজে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

পিংকি (৩৭) কোটচাঁদপুর উপজেলার দোড়া ইউনিয়নের সোয়াদি গ্রামের নওয়াব আলীর সন্তান। তারা চার ভাই-বোন। বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। মা কুলসুম বেগম জীবিত আছেন। দুই ভাই শেখ জালাল ও শেখ রতন কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। মেয়ে হিসেবে পিংকিকে বড় করা হয়। দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করা পিংকিকে বিয়েও দিয়েছিলেন স্বজনরা। তবে সেই সংসার টেকেনি। পরে তিনি রাজনীতিতে জড়ান। বর্তমানে তিনি কোটচাঁদপুর যুব মহিলা লীগের আহ্বায়ক পদে আছেন।

বিজয়ী হওয়ার পর সবার সঙ্গে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করে ব্যস্ত সময় পার করছেন সাদিয়া আক্তার পিংকি। তিনি বলেন, ‘জয়ী হয়ে ভালো লাগছে। কোটচাঁদপুরের জনগণ আমার সঙ্গে আছে। তারা আমাকে ভালোবেসে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছেন। এজন্য আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। জনগণ আমাকে তাদের আপনজন মনে করেন, কাছের লোক মনে করে আমাকে বিজয়ী করেছেন।’তৃতীয় লিঙ্গের প্রথম ভাইস চেয়ারম্যান সাদিয়া আক্তার পিংকি

রাজনীতিতে আসার পর পরিবারের সদস্যরা তাকে নানাভাবে সাহায্য করছেন বলেও জানান পিংকি। তিনি বলেন, ‘তিন বছর ধরে উপজেলা যুব মহিলা লীগের আহ্বায়ক ও দোরা ইউনিয়নের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। এলাকার গরিব, দুখী ও অসহায় মানুষদের পাশে থেকে তাদের উন্নয়নে কাজ করছি। কেউ অসুস্থ হলে তাকে ডাক্তার দেখানোর জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাই। গভীর রাতে কেউ বিপদে পড়লে সাহায্যের চেষ্টা করি। মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করি।’

তৃতীয় লিঙ্গের হওয়ার কারণে কোনও বাধার মুখে পড়েছেন কিনা বা নিগ্রহের শিকার হয়েছেন কিনা জানতে চাইলে পিংকী খাতুন জানান, ‘প্রথম দিকে অনেকেই বলেছেন ওতো তৃতীয় লিঙ্গের লোক, কেমন করে ভোট করবে, কে ভোট দেবে? যারা এসব বলেছেন, পরক্ষণে আমি তাদের কাছে গিয়ে সময় দিয়েছি। বলেছি আমি আপনাদের সন্তান। এমন সন্তান যদি আপনার ঘরে হতো তাহলে কি আপনি তাকে সন্তান হিসেবে থেকে অস্বীকার করতে পারতেন? আমি তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। তারা আমাকে ভালোবেসেই ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছেন।’

ভোটার ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা কি জানতো আপনার যে তৃতীয় লিঙ্গের? এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা সবাই জানতো। সবাই আমাকে ভালোবেসেই ভোট দিয়েছে।’

নির্বাচিত হওয়ার পর কোন কোন বিষয়ে কাজ করতে চান প্রশ্ন করা হলে সাদিয়া আক্তার পিংকি বলেন, ‘আমি জনগণের উন্নয়নে কাজ করতে চাই। অসহায় নারীদের পাশে থাকতে চাই। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে চাই। যুব সমাজের পাশে থেকে উন্নয়নের কাজ করতে চাই। সমাজকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে চাই। আর যারা তৃতীয় লিঙ্গের আছেন, আমি চাই তারা সম্মান পাক। প্রতিটা এলাকায় প্রতিটা ক্ষেত্রে তাদের যেন সম্মান দেওয়া হয়। এ কাজে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করি।’ নির্বাচনের বিষয়ে কীভাবে উদ্বুদ্ধ হলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গ্রামের সব নারী-পুরুষ আমাকে ভোটে দাঁড়ানোর উৎসাহ দিয়েছেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা আমার সঙ্গে ছিলেন। তাদের অনুপ্রেরণায় আমি ভোটের মাঠে নামি।’

শপথ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত করে পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চান বলেও জানান পিংকি।

কোটচাঁদপুর উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মীর মনিরুল আলম বলেন, ‘তিন বছর আগে পিংকি যখন রাজনীতিতে আসে তখন অনেকেই তাকে মেনে মেনে নিতে চাননি। সে সময় অনেক মানুষ তাকে অনেক রকম কথাবার্তা বলেছেন। তবে সে সময়ের সাবেক এমপি নবী নেওয়াজ তাকে রাজনীতিসহ বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেছেন। ভোটের সময় আমি ও আমার দলের অনেক লোক তাকে সাহায্য করেছি। আমি ও বলুহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন তার নির্বাচনি সমন্বয়ক হিসেবে ছিলাম। আমি মনে করি পিংকি গরিব,দুখী অসহায় ও নির্যাতিত মানুষ পাশে থেকে তাদের উন্নয়নে এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার আদায়ে কাজ করে যাবেন।’

কোটচাঁদপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার তাজুল ইসলাম বলেন, ‘পিংকির আচার-আচরণে মানুষ মুদ্ধ হয়ে তাকে ভোট দিয়েছে। তার চলাফেরা, কথায় মানুষ মুগ্ধ। তৃতীয় লিঙ্গ কোনো বিষয় না, সে যদি সব কর্মকাণ্ডে সুযোগ পায় তাহলে অবশ্যই সে তার কাজের মাধ্যমে অবদান রাখতে পারবে এবং মানুষের চাওয়া পাওয়া পূরণ করতে সক্ষম হবে বলে আমি মনে করি।’

জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. সালমা ইয়াসমিন বলেন, 'জননেত্রী শেখ হাসিনা নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করছেন। তারই ধারাবাহিকতায় পিছিয়ে পড়া মানুষদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য পিংকি ভাইস চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন এবং তিনি জয়ীও হয়েছেন।  আমি আশা করি, পিংকি খাতুন তৃতীয় লিঙ্গের হলেও সে সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের উন্নয়নে কাজ করবে।'

 

/এফএস/এমওএফ/

লাইভ

টপ