যেভাবে বোরহানউদ্দিনে হামলা-সংঘর্ষ

Send
ভোলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৮:২৩, অক্টোবর ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১৩, অক্টোবর ২০, ২০১৯

ভোলার বোরহানউদ্দিনে পুলিশের ওপর হামলা করলে পাল্টা গুলিতে আহত এক যুবক। (ছবি: ফোকাস বাংলা)

ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলা সদরের ঈদগাহ মসজিদ চত্বরে পুলিশ-গ্রামবাসী সংঘর্ষে চার ব্যক্তি  বুলেটবিদ্ধ হয়ে নিহত ও দেড়শতাধিক আহত হয়েছেন। ফেসবুকে এক আইডি থেকে মহানবী (সা.)-কে কথিত ‘কটূক্তি’র জের ধরে রবিবার (২০ অক্টোবর) তৌহিদি জনতার ব্যানারে ডাকা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ আগেভাগে শেষ করার নির্দেশ দেওয়ায় ঘটনাস্থলে পরে আসা গ্রামবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এ সময় পুলিশ আত্মরক্ষার্থে রাবার বুলেট ছুড়লে এ ঘটনা ঘটে।  

এদের মধ্যে আহত অর্ধশতাধিক গ্রামবাসীকে বোরহানউদ্দিন হাসপাতালে এবং ৪০ জনকে ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়াও গুরুতর আহত আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশের ওপর হামলাকালে ছড়ড়া গুলিতে আহত এক যুবক

নিহতরা হলেন, বোরহানউদ্দিন উপজেলার  মহিউদ্দিন পাটওয়ারীর মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলে মাহবুব (১৪), উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের দেলওয়ার হোসেনের কলেজ পড়ুয়া ছেলে শাহিন (২৩), বোরহানউদ্দিন পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাহফুজ (৪৫) ও মনপুরার হাজিরহাট এলাকার বাসিন্দা মিজান (৪০)।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জার অ্যাপসে জনৈক বিপ্লব চন্দ্র শুভ’র আইডি থেকে মহানবী (সা.)-কে জড়িয়ে কটূক্তি করা হয়। এর প্রতিবাদে শনিবার বিক্ষোভ মিছিল করে আজ রবিবার ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলা সদরের ঈদগাহ মসজিদের সামনে তৌহিদি জনতার ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেওয়া হয়। এদিকে, শনিবারই যার আইডি থেকে এই কটূক্তি ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে সেই বিপ্লব চন্দ্র শুভ স্বেচ্ছায় থানায় এসে তার আইডি হ্যাক হয়েছে বলে দাবি করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ বিপ্লবকে তাদের হেফাজতে রেখে বিষয়টি তদন্ত করে এবং আইডি হ্যাক হওয়ার প্রমাণ পায়। এরপরই একজন হ্যাকারকে আটকও করা হয়।

সূত্র আরও জানায়, যেহেতু উদ্দেশ্যমূলক বিপ্লবকে ফাঁসানোর চেষ্টা হয়েছে বলে পুলিশের সন্দেহ হচ্ছে, তাই বোরহানউদ্দিনে তৌহিদি জনতার ব্যানারে ডাকা আজ রবিবারের বিক্ষোভ সমাবেশটি প্রথমে বাদ দেওয়ার জন্য ও পরে বেশি লোকসমাগম হওয়ার আগেই তা শেষ করার জন্য বোরহানউদ্দিন ঈদগাহ মসজিদের ইমাম মাওলানা জালাল উদ্দিন, বাজার মসজিদের ইমাম মাওলানা মিজানকে পুলিশ অনুরোধ জানায়।  

পুলিশের ওপর হামলাকালে ছররা গুলিতে আহত এক কিশোর স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীনঘটনাস্থলে উপস্থিত  মাঝেরচর বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাওলানা একরামুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, পুলিশের অব্যাহত অনুরোধে বোরহানউদ্দিন ঈদগাহ মসজিদের ইমাম মাওলানা জালাল উদ্দিন, বাজার মসজিদের ইমাম মাওলানা মিজান পরিস্থিতি বুঝতে পেরে পুলিশকে সহায়তা করতে রাজি হন। এ দুই ইমাম সকাল ১০টার দিকেই যেসব লোক আসছে তাদের নিয়ে দোয়া-মোনাজাতের মাধ্যমে বিক্ষোভ মিছিলটি সমাপ্ত করেন। কিন্তু এই বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দিতে এরইমধ্যে বোরহানউদ্দিনের বিভিন্ন গ্রাম থেকে হাজার হাজার লোক এসে ঈদগাহে জড়ো হন। তারা এসে মোনাজাতের মাধ্যমে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ শেষ করা হয়েছে জানতে পেরে ওই দুই ইমামের ওপর ক্ষিপ্ত হন। ঘটনাস্থলে পুলিশ থামাতে চাইলে গ্রামবাসীর সব রাগ গিয়ে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর। তারা ইমামকে বাদ দিয়ে এবার পুলিশের ওপর চড়াও হয়। তখন পুলিশ আত্মরক্ষার্থে ওই মসজিদের ইমামের কক্ষে গিয়ে আশ্রয় নেয়। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা পুলিশকে লক্ষ করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে।

বোরহানউদ্দিন থানার ওসি এনামুল হকও এসব তথ্য জানিয়ে পরিস্থিতির বর্ণনা দেন বাংলা ট্রিবিউনের কাছে। তিনি বলেন, গ্রামবাসী এসেছিল নবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে করা কটূক্তির প্রতিবাদ করতে। সেখানে কে কী বলেছে তাদের বেশিরভাগই তা জানেন না। এরপর এসে যখন শোনে মোনাজাত আগে শেষ হয়েছে তখন তাদের সব রাগ গিয়ে পড়ে দুই ইমামের ওপর। আমরা থামাতে চাইলে ইমামকে ছেড়ে তারা হামলা শুরু করে পুলিশের ওপর। অবস্থা এমন হয় যে, আমরা বাধ্য হয়ে ইমামের রুমে গিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করি। কিন্তু তারা সেখানেও ঢিল ছোড়ে, দরজা ভেঙে ফেলে। বাধ্য হয়ে বাঁচার জন্য আমরা ফাঁকা গুলি ছুড়ি। এতে গ্রামবাসী আরও উত্তেজিত হয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ চালায়। সকাল ১০টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষ হয়। এতে চার জন নিহত এবং ১০ পুলিশ সদস্যসহ প্রায় দেড়শতাধিক মুসল্লি আহত হয়। এদের মধ্যে অনেককে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বাকিদের বোরহানউদ্দিন ও ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

তিনি জানান, নিহতদের মধ্যে একজন মাদ্রাসা ছাত্র ও একজন কলেজছাত্র।

পুলিশের ওপর হামলার চেষ্টাকারী এক বৃদ্ধ ছররা গুলি বিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন

এদিকে, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে সাধাণ মানুষের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বোরহানউদ্দিনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়াও হেলিকপ্টারে এক প্লাটুন বিজিবি এবং সড়কপথে আরও তিন প্লাটুন বিজিবি সদস্যকে সেখানে পাঠানো হয়েছে।

ভোলার পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়ছার বলেন, বোরহানউদ্দিন উপজেলার বিপ্লব চন্দ শুভ নামের এক যুবকের ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়েছে। আমরা হ্যাকের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আটক করেছি। আমরা এ নিয়ে গত রাতে স্থানীয় আলেমদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলছেন আজকের প্রোগ্রাম হবে না। কিন্তু সকাল থেকে আমাদের কাছে খবর আসে সেখানে মাইকিং হচ্ছে এবং স্টেজ বানানো হচ্ছে। সেখানে গিয়ে আমরা মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং আমি নিজে সেখানে বক্তব্য দিয়েছি। তারা সবাই আমার বক্তব্য শুনেছেন। যখন আমি স্টেজ থেকে নেমে আসি তখন একদল উত্তেজিত জনতা আমাদের ওপর হামলা চালায়। আমরা আত্মরক্ষার্থে একটি রুমে গিয়ে আশ্রয় নিই। যখন তারা আমাদের রুমের জানালা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে তখন আমরা প্রথমে শটগানের ফাঁকা গুলি ছুড়ি। পরবর্তীতে এতে কাজ না হওয়ায় ওপরের দিকে গুলি ছোড়ার নির্দেশ দেই। এতে আমার জানামতে এক পুলিশ সদস্য বুকে গুলি লেগে গুরুতর আহত হন। আমরা আহত অবস্থায় যাদের হাসপাতালে পাঠিয়েছি তাদের মধ্যে তিন জন নিহত হয়েছে। তবে বাকি আরও থাকতে পারে, সে বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য নেই।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়ন রয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার।

 

/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ