নারী আইনজীবীকে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ

Send
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১১:২৯, নভেম্বর ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৭, নভেম্বর ০৬, ২০১৯

নিযাতনের শিকার নারী অ্যাভোকেট ও তার স্বামী শাওন

মানিকগঞ্জ জেলা জজকোর্টের আইনজীবী কামরুন্নাহার সেতু তার স্বামীর বিরুদ্ধে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ এনে মামলা করেছেন। সোমবার (৫ নভেম্বর) রাতে তিনি মানিকগঞ্জ সদর থানায় স্বামীর বিরুদ্ধে এ মামলাটি করেন।

তিনি জানান, বিয়ের এক মাসের মাথায় তার স্বামী একটি বাড়িতে নিয়ে তাকে আটকে রেখে নির্যাতন শুরু করে। নির্যাতনের শব্দ যাতে কেউ না শুনতে পায়, এজন্য পুতা দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত করতো। নির্যাতনের কারণে তার সারা শরীর থেঁতলে গেছে। ১৫ দিন পর এ বন্দিদশা থেকে তিনি কৌশলে মুক্তি পেয়ে মামলা করেছেন। তিনি সেখান থেকে জীবিত ফিরে আসতে পারবেন বলে আশা করেননি বলেও জানান।

ভুক্তভোগী নারী জানান, তার বাড়ি মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার জাগীর ইউনিয়নের ঢাকুলী গ্রামে। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর তিনি উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে মোরশেদকে নিয়ে বাবার বাড়িতেই থাকেন। এ সুযোগে শাওন তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে ও পরে তারা বিয়ে করে।

মামলার এজাহারে কামরুন্নাহার সেতু উল্লেখ করেন, মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার আজিমনগর গ্রামের মো. শাওন মিয়ার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর ৯ সেপ্টেম্বর শাওন তাকে ১০ লাখ টাকা কাবিনে বিয়ে করে। এখনই বিয়ের কথা কাউকে জানাতে নিষেধ করে। এ কারণে তিনি কাউকে বিয়ের কথা জানাননি। শাওন গত ১৭ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জজকোর্টে এসে তাকে কথা আছে বলে প্রাইভেটকারে উঠিয়ে নিয়ে যায়। পরে তাকে নবীনগর কহিনুর গেটের তুনু হাজীর ৬তলা বাড়ির ৪তলার একটি কক্ষে নিয়ে যায়। প্রথম দুদিন শাওন তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। তৃতীয় দিন তাকে মানিকগঞ্জ ডাকঘরে থাকা তার কয়েকটি হিসাব থেকে টাকা উঠিয়ে দিতে বলে। প্রথমে তিনি রাজি হননি। পরে অস্ত্রের ভয়ে প্রথমে ৫ লাখ এবং ১০ লাখ টাকা তুলে দেন। এরপর ১ লাখ করে ৩ বারে তিন লাখ টাকা উঠিয়ে দেন। এর দুদিন পর শাওন আবার টাকা চাইলে তিনি জানান তার আর কোনও টাকা নেই। এসময় তাকে জমি লিখে দিতে বলে। তিনি জমি লিখে না দেওয়ায় তার ওপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। এসময় শাওন তার কাছ থেকে মোবাইল ফোন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে নেয়। পরে তাকে বিবস্ত্র করে নগ্ন ভিডিও ধারণ করে। এসময় তাকে শাওনের শেখানো কথা বলতে বাধ্য করে। এগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। এরপরও জমি লিখে না দেওয়ায় পুতা দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন অংশসহ মুখমণ্ডলের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে দিয়েছে। গত ২ নভেম্বর রাতে তিনি জানালা দিয়ে এক প্রতিবেশীর সহযোগিতা চান। পরে ওইদিন রাত ২টার দিকে শাওন যখন তাকে আবার মারধর শুরু করে তখন তার চিৎকারে প্রতিবেশীরা ও বাড়ির মালিক এসে তাকে উদ্ধার করে। পরের দিন শাওন তাকে বাবা বাড়িতে দিয়ে আসার কথা বলে নিয়ে যায়।  চিকিৎসার নামে একটি হাসপাতালে নিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করে। এটা বুঝতে পেরে তিনি সেখান থেকে চলে আসতে চাইলে তাকে সেখানেই মারধর শুরু করে। এই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দিলে শাওন পালিয়ে যায়। পরে সোমবার (৫ নভেম্বর) রাতে তিনি সরাসরি মানিকগঞ্জ থানায় এসে মামলা করেন।

কামরুন্নাহার সেতু আরও বলেন, শাওন একজন প্রতারক। তার কাজই হলো প্রতারণার ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেওয়া। এ পর্যন্ত সে অনেক নারীর জীবন নষ্ট করেছে। অনেক মানুষকে পথে বসিয়েছে। সে প্রথমে নারীদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। পরে ফাঁদে ফেলে তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ মেলামেশার ভিডিও ধারণ করে। কৌশলে ওই নারীর মোবাইল ফোন, আইডি কার্ড কিংবা অন্য কোনও পরিচয়পত্র নিয়ে নেয়। এরপর তাকে জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নেয়। না দিলেই শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন।’

কামরুন্নাহার সেতুর বাবা মো. সফিউদ্দিন বলেন, ‘তার মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর শাওন তার কাছে ফোন করে ৫ লাখ টাকা চায়। না দিলে তার মেয়েকে হত্যার হুমকি দেয়। এ ঘটনায় তিনি গত ৩ নভেম্বর মানিকগঞ্জ থানায় শাওনের বিরুদ্ধে একটি অপহরণ মামলা করেন।’

মানিকগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি তদন্ত) মো. হানিফ সরকার বলেন, ‘নারী আইনজীবীকে তার বাবার করা অপহরণ মামলায় উদ্ধার দেখানো  হয়েছে। বিকেলে ওই আইনজীবী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন। সন্ধ্যায় তাকে চিকিৎসার জন্য মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’

অভিযুক্ত মো. শাওন মিয়ার দুটি মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাই তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা হাসপাতালের চিকিৎসক এরফান আলী জানান, নারী আইজীবী চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। তার সারা শরীরে রক্তাক্ত জখমের চিহ্ন রয়েছে। এছাড়া তার শরীরের বিভিন্ন স্থানের মাংস থেঁতলে গেছে। 

/জেবি/এমএমজে/

লাইভ

টপ