কুমিল্লায় নিষিদ্ধ হলো তিন বক্তার ওয়াজ

Send
মাসুদ আলম, কুমিল্লা
প্রকাশিত : ১৮:০২, নভেম্বর ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪২, নভেম্বর ১৩, ২০১৯

মাওলানা তারেক মনোয়ার, মাওলানা আবদুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ ও  মাওলানা জসিম উদ্দিনরাষ্ট্রবিরোধী ও ধর্মীয় উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে ইসলামি বক্তা ও টিভি উপস্থাপক মাওলানা তারেক মনোয়ার, মাওলানা আবদুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ ও মাওলানা জসিম উদ্দিনের ওয়াজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন। অনেক বছর ধরে ওয়াজের নামে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা, পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান এবং মুসলমানদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করার অভিযোগ ওঠায় এই পদক্ষেপ নেন কর্মকর্তারা। স্থানীয় প্রশাসন জানায়, এই বক্তারা ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন এবং শান্তিময় পরিবেশ নষ্ট করেন। তাদের ওয়াজে ইসলামের আদর্শ ও দেশপ্রেমের চেয়ে উগ্রবাদ প্রকাশ পায়। তাই তাদের ওয়াজ কুমিল্লায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

কুমিল্লায় ওয়াজ নিষিদ্ধ বক্তাদের মধ্যে তারেক মনোয়ার জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত। তিনি দলটির সাংস্কৃতিক সংগঠন সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর পরিচালক ছিলেন। মাওলানা আবদুর রাজ্জাক বিন জসিম সালাফী মতবাদের একটি অংশের নেতৃত্বে আছেন। গত মার্চে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যেসব বক্তাদের বক্তব্য নিয়ে আপত্তি তোলা হয়, ওই তালিকায় প্রথমেই আবদুর রাজ্জাকের নাম ছিলো।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের অভিযোগ বিষয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে তারেক মনোয়ারকে পাওয়া যায়নি।

কুমিল্লার জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে ৬ অক্টোবর জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপজেলা চেয়ারম্যানরা, পৌর মেয়র এবং বিভিন্ন বক্তারা মাওলানা তারেক মনোয়ার, মাওলানা আবদুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ ও মাওলানা জসিম উদ্দিনের ইসলামি আলোচনা নিয়ে অভিযোগ তোলেন। রাষ্ট্রবিরোধী ও ধর্মীয় উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে তারা সমাজ ও মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি করেন। এই তিন বক্তাকে নিয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে একটি রেজুলেশন তৈরি হয়। এরপর থেকে প্রায়ই জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তাদের নিয়ে আলোচনা হয়ে আসছিল। পরবর্তীতে চলতি বছরের অক্টোবর মাসের জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় মাওলানা তারেক মনোয়ারসহ ওই তিন বক্তার ওয়াজ কুমিল্লায় নিষিদ্ধ করা হয়। গত সোমবার (১১ নভেম্বর) আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সব কর্মকর্তার উপস্থিতিতে ওয়াজ নিষিদ্ধ করার বিষয়টি ঘোষণা করা হয়।

কুমিল্লা জেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক সরকার সরোয়ার আলম বলেন, ‘২০১৬ সালের ৬ অক্টোবর জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় অভিযুক্ত তিন বক্তার ওয়াজ নিয়ে অভিযোগ ওঠে। ২০১৮ সালে তাদের বক্তব্য নিষিদ্ধ হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে এসে গত সোমবার জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার ও অন্যান্য কর্মকর্তার উপস্থিতিতে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তাদের ওয়াজ কুমিল্লা জেলায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে প্রশাসন।’

কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী বলেন, ‘রাষ্ট্রবিরোধী ও ধর্মীয় উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে মাওলানা তারেক মনোয়ারসহ কুমিল্লায় তিন বক্তার ওয়াজ নিষিদ্ধ করা হয় গত অক্টোবর মাসের আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়। নিষিদ্ধের বিষয়টি নভেম্বর মাসের আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় রেজুলেশন আকারে ঘোষণা করা হয়।’

কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ সহজ-সরল ও অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। তাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে কোনও কোনও বক্তা ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা উপস্থাপন এবং শান্তিময় পরিবেশ নষ্ট করেন। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ওঠায় এবং শান্তিময় পরিবেশে যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয় তাই জেলা প্রশাসন ওই তিন বক্তার ওয়াজ কুমিল্লায় নিষিদ্ধ করেছে। আয়োজকদের ওয়াজকারীদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তাই যথাযথ অনুমতি নিয়ে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করতে হবে। ওয়াজ মাহফিল যেখানে আয়োজন করা হবে সেখানে যেন অবশ্যই সাউন্ড সিস্টেমটি প্যান্ডেলের ভেতরে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’

নিষিদ্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর বলেন, ‘অভিযুক্ত ওয়াজকারী বক্তারা অনেক বছর ধরে ওয়াজের নামে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে আসছেন। তাই তাদের বিষয়ে ২০১৬ সালের ৬ অক্টোবর মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের দেওয়া অভিযোগে একটি রেজুলেশন গঠন করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে ওই তিন বক্তার বিষয়ে আরও কিছু অভিযোগ উঠে আসে। সর্বশেষ চলতি বছরের অক্টোবর মাসে মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় রাষ্ট্রবিরোধী ও ধর্মীয় উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে তাদের ওয়াজ কুমিল্লায় নিষিদ্ধ করা হয়। গত সোমবার নিষিদ্ধের বিষয়টি ঘোষণা করা হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘নিষিদ্ধ করার পরও এই তিন ব্যক্তি কুমিল্লায় ওয়াজ করছেন- এমন অভিযোগ যদি আসে তাহলে আয়োজক এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই ব্যাপারে জেলার প্রত্যেক উপজেলা প্রশাসনকে অবগত করা হয়েছে।’

আরও পড়ুন- 

ওয়াজ মাহফিলের যত ধারা

ওয়াজ রাজনীতি একাকার

ওয়াজ মাহফিল কি পেশায় পরিণত হচ্ছে?

ওয়াজ মাহফিল কীভাবে প্রভাব ফেলছে, শ্রোতা কি বাড়ছে?

ওয়াজ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৬ সুপারিশ, বক্তাদের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব

/এসটিএস/এফএস/এমওএফ/

লাইভ

টপ