গুজব ছড়িয়ে লবণের বাজারে অস্থিরতা

Send
বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৩:৩০, নভেম্বর ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৭, নভেম্বর ১৯, ২০১৯

লবণের দাম বৃদ্ধির গুজব ঠেকাতে নেত্রকোনায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানদেশের বিভিন্ন জায়গায় লবণের দাম বৃদ্ধির গুজব ছড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা মুনাফা লোটার চেষ্টাও করছে। কয়েক জেলায় স্থানীয় প্রশাসন বেশকিছু ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজাও দিয়েছে। আমাদের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর−

হবিগঞ্জ

হবিগঞ্জে গভীর রাতে লবণের দাম বৃদ্ধির গুজব রটানো হয় শহরসহ আশপাশের এলাকায়। এই সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে শহরের চৌধুরী বাজার এলাকা থেকে চার ব্যবসায়ীকে আটক করে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইয়াসির আরাফাত রানার নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত এ দণ্ডাদেশ দেন।

স্থানীয়রা জানান, সোমবার সন্ধ্যার পর থেকেই হবিগঞ্জ শহরসহ আশপাশের এলাকাগুলোয় গুজব রটে, লবণের দাম বাড়ছে। এ খবরের ভিত্তিতে শহরের চৌধুরী বাজার এলাকায় গিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মজুতের উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত লবণ কেনে। এ সময় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই-এর সদস্যরা খবর পেয়ে সেখানে অবস্থান নেন। পরে ছয় জনকে আটক করা হয়। দুই জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এছাড়া অপর চার জন নিজেদের দোষ স্বীকার করে নেওয়ায় দুই জনকে ১০ দিনের কারাদণ্ড এবং অন্য দুই জনকে এক হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন−হবিগঞ্জ শহরের রাজনগর এলাকার ব্যবসায়ী মো. আব্দুল কাদির নানু ও বাতিরপুর এলাকার কানাই দাসের ছেলে সুরঞ্জিত দাস। অর্থদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন−হবিগঞ্জ শহরের চৌধুরী বাজার এলাকার রাজকুমার রায়ের ছেলে মিঠুন রায় ও নোয়াহাটি এলাকার রবিন্দু পালের ছেলে রঞ্জিত পাল।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইয়াসির আরাফাত রানা জানান, ‘লবণের দাম বাড়েনি। এটা একটা গুজব। যারা এ গুজব রটাবে বা কৃত্রিম সংকট তৈরির জন্য মজুত রাখবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি জনসাধারণকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই।’মৌলভীবাজারে মজুতের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার সময় লবণের বস্তা জব্দ

মৌলভীবাজার

লবণের দাম বৃদ্ধির গুজব ছড়িয়ে ব্যবসায়ীরা মুনাফা লোটার চেষ্টা করছে অভিযোগ পেয়ে সোমবার রাত থেকে মৌলভীবাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালাচ্ছেন। রাত সাড়ে ১০টার পরে মোটামুটি হুলুস্থুল পড়ে যায় বিভিন্ন বাজারে। কোনও কোনও দোকানে অতিরিক্ত দামে লবণ বিক্রিও শুরু হয়ে যায়। কিছু দোকানে কেজিপ্রতি ৩৫ টাকার লবণ ৬০ টাকায় বিক্রি হয়। পরে মৌলভীবাজার জেলার সাতটি উপজেলার প্রশাসন সোমবার রাতে লবণের দাম বাড়া নিয়ে গুজবে কান না দিতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়। এছাড়া শহরের বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অসাধু ব্যবসায়ীদের ধরতে অভিযান শুরু করেছে।

শ্রীমঙ্গল সোনা মিয়া সড়কের বাসিন্দা রুপা বেগম ও শাহিনা বেগম জানান, ‘লবণ কিনতে গিয়ে দোকানে লবণ পাইনি। দোকানি জানায়, সব লবণ বিক্রি হয়ে গেছে এবং মঙ্গলবার থেকে লবণের কেজি ২০০ টাকা হবে।’

মৌলভীবাজার সেন্ট্রাল রোডের ক্রেতা রফিক মিয়া জানান, ‘পাঁচ কেজি লবণ কিনেছি। কাল থেকে (মঙ্গলবার) ১৫০-২০০ টাকা দরে লবণ বিক্রি হবে বলে শুনেছি।’

এদিকে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশেকুল হক সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ধলাই নদীর নতুন ব্রিজের ওপর এক সিএনজি আটোরিকশা থেকে ৩৭৫ কেজি লবণসহ ওই উপজেলার ব্যবসায়ী আব্দুল কাদেরকে আটক করেন। পরে তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

কমলগঞ্জ থানার ওসি মো. আরিফুর রহমান বলেন, ‘কোনও গুজবে কান না দেওয়ার জন্য সোমবার রাতেই কমলগঞ্জ উপজেলার ভানুগাছ বাজার ব্যবসায়ী সমিতি ও বড় বড় ব্যবসায়ীকে জানানো হয়েছে। কেউ গুজব সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

মৌলভীবাজার জেলার পুলিশ সুপার মো. ফারুক আহমেদ বলেন, ‘গুজব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারের ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের জানিয়ে দিয়েছি, লবণের দাম বাড়েনি। কেউ লবণের দাম নিয়ে কারসাজি যাতে না করেন। এরপরও কোনও ব্যবসায়ী গুজবে কান দিয়ে কারসাজি করলে কঠোর হস্তে দমন করা হবে।’মৌলভীবাজারে লবণের দাম বৃদ্ধির গুজব ঠেকাতে প্রশাসনের অভিযান

নেত্রকোনা

নেত্রকোনার খালিয়াজুরীতে লবণের দাম বৃদ্ধির গুজবে এক ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়েছে। আটককৃত ব্যবসায়ী হায়দার চৌধুরী পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলার মরহুম সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে।           

স্থানীয়রা জানান, উপজেলায় পেঁয়াজের দর একটু নিয়ন্ত্রণে আসতে না আসতেই লবণ নিয়ে এমন গুজবে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্ত ছড়িয়ে পড়ে। লবণের দাম বেড়েছে খবর শুনে ভিড় জমে যায় বিভিন্ন দোকানে। ক্রেতারা সর্বনিম্ন ৫ কেজি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২০ কেজি পর্যন্তও লবণ কেনেন। লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করার দায়ে আজ মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) সকাল ৯টায় খালিয়াজুরী সদর এলাকা থেকে ব্যবসায়ী হায়দার চৌধুরীকে পুলিশ আটক করে।

খালিয়াজুরী গ্রামের পুরান হাটির মুক্তিযোদ্ধা মো. ফজলুর রহমান জানান, ‘মানুষের মুখে শুনছি পেঁয়াজের মতো লবণের দামও বাড়বে। তাই আমি ১০ কেজি লবণ কিনে রেখেছি।’ একই গ্রামের শাহ আলম তালুকদারও জানান, তিনি পাঁচ কেজি লবণ কিনেছেন।

খালিয়াজুরী থানার ওসি এটিএম মাহমুদুল হক জানান, ‘লবণের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করায় হায়দার চৌধুরী নামে এক ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে  প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সুনামগঞ্জ

লবণের মূল্য বৃদ্ধির গুজব ছড়িয়ে পড়ায় সুনামগঞ্জে বেশি পরিমাণে লবণ কেনার হিড়িক পড়ে যায়। সোমবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও লোকমুখে রটে যায় লবণের দাম বাড়ছে। এর পরই ভোক্তারা অধিক পরিমাণে লবণ কিনতে শুরু করেন। পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে লবণ বিক্রি বেড়ে যায়। পৌর এলাকার বাজারের দোকানগুলোতে লবণ কিনতে লোকজন ভিড় করেন। গভীর রাত পর্যন্ত অনেকের হাতে দুই থেকে পাঁচ কেজি পর্যন্ত লবণ কিনে বাসায় ফিরতে দেখা যায়। গুজব নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসন মাঠে নামার পর পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে।

স্থানীয় লবণ ডিলার প্রণয় পাল টিটু বলেন, তারা স্বাভাবিক দামেই লবণ বিক্রি করেছেন। এছাড়া লবণের কোনও ঘাটতি নেই। তিনিও গুজবের খবর শুনেছেন।

খুচরা ব্যবসায়ী সজল পাল জানান, তিনিও লবণের দাম বাড়ার গুজব শুনেছেন। তার দোকানে সন্ধ্যার পর থেকে বেশি লবণ বিক্রি হয়েছে। তবে লবণের প্যাকেটের গায়ে যে খুচরা মূল্য লেখা আছে, সে দামেই তিনি বিক্রি করেছেন।

লবণের দাম বৃদ্ধির গুজবে সোমবার রাতে ছাতকে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালান। ছাতক উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাপশ শীল ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে ছাতক পৌর শহরের আলী ট্রেডার্স ও নিতাই স্টোর নামক দুই প্রতিষ্ঠানকে ভোক্তা অধিকার আইন (২০০৯) এর ৪০ ধারায় ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। এ ব্যাপারে  সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা  মুহাম্মদ সহিদুর রহমান জানান, ‘গুজব যাতে না ছড়ায় এবং লবণ যেন কোনও ব্যবসায়ী বেশি দামে বিক্রি করতে না পারেন, সেজন্য পুলিশ তৎপর রয়েছে। গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল আহাদ জানান, ‘জেলায় লবণের পর্যাপ্ত জোগান ও সরবরাহ রয়েছে। গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানাই সবার প্রতি।’ 

/এফএস/এমএমজে/

লাইভ

টপ