পরিবহন ধর্মঘটে বন্দরগুলোতে অচলাবস্থা

Send
বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৭:০৬, নভেম্বর ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৪, নভেম্বর ২০, ২০১৯

বেনাপোল স্থলবন্দরপণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ধর্মঘটে দেশের স্থল ও নৌ বন্দরগুলোতে অচলাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাস চলাচল বন্ধ থাকার কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের প্রতিবাদে যশোর থেকে এই ধর্মঘট শুরু হয় রবিবার সকাল ১১টা থেকে। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়। এখন সারাদেশে চলছে ধর্মঘট। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

বেনাপোল স্থলবন্দর

ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকায় বেনাপোল বন্দরে কোনও মালামাল লোড-আনলোড ও খালাস হয়নি। এতে পণ্য লোড করার জন্য বন্দরের সামনে শত শত খালি ট্রাক অবস্থান করছে। দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যসহ পাসপোর্ট যাত্রী যাতায়াত স্বাভাবিক থাকলেও ভারত থেকে আমদানি পণ্য বন্দরে আনলোড করা সম্ভব হয়নি।

বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন জানান, পরিবহন শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘটের কারণে বেনাপোল দিয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। আমদানি-রফতানিকারকরা ঠিক সময়ে মালামাল ডেলিভারি নিতে পারছেন না। এতে সরকার প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫ কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে।

ভারত ফেরত পাসপোর্টধারী যাত্রী নির্মল দাস বলেন,‘বাংলাদেশে পরিবহন বন্ধ রয়েছে, তা জানতাম না। ১৫ দিন ভারতে থাকার পর আজ দেশে ফিরে দেখছি এই অবস্থা। এখন ঢাকায় কীভাবে যাবো, সেটাই ভাবছি।’

সোহাগ পরিবহনের বেনাপোল অফিসের ম্যানেজার শহিদুল ইসলাম বলেন,‘ঢাকা-কলকাতা ও বেনাপোল থেকে ঢাকা,চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য স্থানে দূরপাল্লার বাস বন্ধ রয়েছে। তবে গত তিনদিন দুয়েকটি গাড়ি সীমিত আকারে চলাচল করলে ও আজ থেকে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ট্রেন চলছে। অভ্যন্তরীণ রুটে কোনও বাস চলাচল করছে না। তবে ভারত থেকে আসা যাত্রীরা ট্রেনসহ ছোট-ছোট যানবাহনে করে গন্তব্যে যেতে দেখা যাচ্ছে।’

ভোমরা স্থলবন্দর

ধর্মঘটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে। ট্রাক ঠিকমত না পাওয়ায় তাদের দ্বিগুন খরচে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে। তবে আমদানি-রফতানিতে তেমন কোনও প্রভাব পড়েনি বলে জানিয়েছেন শুল্ক স্টেশনের কর্মকর্তারা। জেলার অন্যান্য জায়গায় সীমিত সংখ্যক ট্রাক চলছে বলে জানা গেছে।

ভোমরা স্থলবন্দরের আমদানিকারক আব্দুল গফুর জানান,ধর্মঘটের কারণে তারা পণ্য পাঠাতে পারছেন না। মঙ্গলবার পচনশীল পণ্য পাঠাতে তাদের দ্বিগুন খরচ হয়েছে। আজ বুধবার থেকে পণ্য পাঠাতে শঙ্কায় রয়েছেন।

জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শাহিনুর রহমান শাহিন জানান,কেন্দ্রীয় শ্রমিক ফেডারেশন ট্রাক ধর্মঘটের বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে নতুন সড়ক পরিবহন আইনের ভয়ে অনেকে ট্রাক চালাচ্ছেন না।

এদিকে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে বুধবার সকাল থেকে কোনও বাস ছেড়ে যায়নি। বন্ধ রয়েছে অভ্যন্তরীণ রুটের সব বাস চলাচলও। তবে যাত্রীবাহী বাস বন্ধ থাকলেও বিআরটিসির বাস চলাচল করতে দেখা গেছে। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন দূর-দূরান্তের যাত্রীরা। ইজিবাইক,মাহেন্দ্র, ইঞ্জিনভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে তারা যাতায়াত করছেন।

ভোমরা স্থলবন্দরসোনামসজিদ স্থলবন্দর

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ট্রাক,ট্যাংকলরি ও ক্যাভার্ড ভ্যান শ্রমিকদের ধর্মঘটে  সোনামসজিদ স্থলবন্দর থেকে বন্ধ রয়েছে পণ্য পরিবহন। তবে বন্দরে ভারতীয় পণ্যবাহী গাড়ির প্রবেশ ও লোড-আনলোড কার্যক্রম চালু রয়েছে বলে জানিয়েছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া বন্দরে পচনশীল পণ্য না থাকায় তেমন কোনও ক্ষতির আশঙ্কা করছেন না ব্যবসায়ীরাও।

সোনামসজিদ সিএ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব আব্দুল আওয়াল জানান, ‘বন্দরে ভারতীয় পণ্যবাহী গাড়ি প্রবেশ করলেও বাংলা গাড়ি লোড না নেওয়ায় ৫০ থেকে ৬০টি গাড়ি আটকা পড়েছে।’

পানামা পোর্ট লিংক লিমিটেডের সহকারী ম্যানেজার মাইনুল ইসলাম জানান,‘ট্রাক, ট্যাংকলরি ও ক্যার্ভাড ভ্যান শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় বাংলা গাড়ি লোড নিচ্ছে না। এছাড়া বন্দরে পচনশীল পণ্য তেমন না থাকায় তেমন কোনও ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তবে অন্যান্য পণ্য ( খৈল, ভুট্টা, ভূসি) ঠিক সময়ে পৌঁছাতে না পারলে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।’   

সোনামসজিদ শুল্ক স্টেশনের সহকারী কাস্টমস কর্মকর্তা সাইফুর রহমান জানান,‘ভারতীয় গাড়ি বন্দরে প্রবেশ করলেও শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে বাংলা কোনও গাড়ি লোড হচ্ছে না। দুপুর ২টা পর্যন্ত দুটি গাড়ি বন্দরে প্রবেশ করেছে এবং বন্দরের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম চালু রয়েছে।’

ইমিগ্রেশন কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলেও ভারত থেকে আসা যাত্রীরা গাড়ি না পাওয়ায় বেকায়দায় পড়েছে।

মোংলা বন্দর

বুধবার সকাল থেকে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকায় মোংলা বন্দর জেটি থেকে আমদানি করা কোনও পণ্য বের হতে পারছে না। অপরদিকে রফতানিযোগ্য পণ্যও বন্দরে প্রবেশ করতে পারছে না। এতে চরম বিপাকে পড়েছে বন্দর ব্যবহারকারীরা। পণ্য পরিবহন ধর্মঘটে মোংলা বন্দরের শিল্প এলাকার ২০টি এলপিজি ফ্যাক্টরি, ৫টি সিমেন্ট ফ্যাক্টরিসহ ইপিজেডের পণ্য পরিবহণ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

মোংলা বন্দর কর্তৃক্ষের সহকারী ট্রাফিক ম্যানেজার মো. সোহাগ বলেন, ‘পণ্য পরিবহন ধর্মঘটের কারণে মোংলা বন্দর জেটি থেকে সড়ক পথে দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহস বন্ধ রয়েছে। এতে বন্দরে বিরুপ প্রভাব পড়ছে।’

মোংলা ইপিজেডের মহাব্যবস্থাপক মো. মাহাবুবুল আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘ট্রাক-ট্রলি চলাচল বন্ধ থাকায় এর প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে। তবে ইপিজেডের সব কলকারখানায় কাজ চলছে।’

এছাড়া বুধবার তৃতীয় দিনের মতো মোংলা-খুলনা, মোংলা-রুপসা, মোংলা-বাগেরহাটসহ সক রুটে যাত্রীবাহী বাস-মিনিবাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।

ট্রাক চালক নজরুল শেখ ও হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘নতুন আইনে ৫ লাখ টাকা জরিমানার যে বিধান করা হয়েছে, তা আমরা মানিনা। এ আইন মেনে গাড়ি চালানো সম্ভব না। তাই আমরা গাড়ি বন্ধ রেখে ধর্মঘট পালন করছি এবং আইন শীতিলের দাবি জানাচ্ছি।’

চট্টগ্রাম বন্দর

বুধবার (২০ নভেম্বর) ভোর ৬টা থেকে চট্টগ্রামে পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চলাচল বন্ধ রেখেছেন চালক ও শ্রমিকেরা।

আন্তঃজেলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি মনির আহমদ পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল না করার বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘৯ দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। দাবি মানা না হলে চালক ও শ্রমিকরা গাড়ি চালাবেন না বলে জানিয়েছেন।’

ধর্মঘটের কারণে মাদারবাড়ী,কদমতলী,নিমতলাসহ চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় টার্মিনালে পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান অলস বসিয়ে রাখা হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে সড়কে কোনও ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান দেখা যায়নি।

তবে বন্দর থেকে কনটেইনার পরিবহনে ব্যবহৃত প্রাইম মুভার বা ট্রেইলার চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রাইম মুভার মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পরিবহন ধর্মঘটে কন্টেইনার পরিবহনে তেমন কোনও প্রভাব পড়েনি। কন্টেইনার পরিবহন স্বাভাবিক রয়েছে।’

/এনআই/

লাইভ

টপ