৩০ শতাংশ জমি আছে সেফুদার

Send
মো. ইব্রাহিম রনি, চাঁদপুর
প্রকাশিত : ১৯:৩৬, নভেম্বর ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১৬, নভেম্বর ২১, ২০১৯

74461075_412907569594130_3783086930384650240_n৩০ শতাংশ জমি আছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত সেফাত উল্লাহ ওরফে সেফুদার। সেই জমিতে লাগানো হয়েছে গাছ। এর বাইরে আছে পৈতৃক ভিটা। সেখানে ঘর-বাড়ি থাকলেও দেশে না থাকায় তার নিজের কোনও ঘর নেই। ঘরগুলোতে তার ভাইয়েরা থাকেন। হয়তো এই ভিটাসহ পৈতৃক সম্পতির আরও কিছু ভাগ পেতে পারেন তিনি যদি এসব সম্পদ বাঁটোয়ারা করা হয়। তবে সেফুদা এখন যাই পাবেন সবই যাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। তার সব সম্পত্তি যে ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

গতবছর নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় কিছু যুক্তিযুক্ত ও পরে ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর একের পর এক মন্তব্য করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত-সমালোচিত হন সেফু নামের প্রবাসী এই ব্যক্তি। সেফুদা নামেই তিনি বিশেষ পরিচিত। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলায় ৩০ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তবে দেশে এসে আদালতে আত্মসমর্পন না করায় গত ১৯ নভেম্বর তার স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার ১৩ নম্বর সূচিপাড়া উত্তর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে চেড়িয়ারায় সেফুদার গ্রামের বাড়িতে তার প্রায় ৩০ শতাংশ জমি রয়েছে। এ জমির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৯ লাখ টাকার মতো। ওই জমিতে কিছু গাছপালাও রয়েছে। এলাকাবাসী জানান, সেফুদা পৈতৃক সূত্রে বাড়ির আরও কিছু জমি পেতে পারেন। তবে এর বাইরে এলাকায় তার আর কোনও সম্পত্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী জানান, সেফুদা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। ধর্ম নিয়ে বিতর্কিত কথাবার্তা বলার কারণে সেফুদার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন এলাকাবাসী। একইসঙ্গে তার বাংলাদেশি নাগরিকত্বও বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তারা।

সেফাত উল্লাহ চেড়িয়ারা গ্রামের মৃত হাজী আলী আকবরের পুত্র। তার বাবা দুটি বিয়ে করেন। দুই পরিবারে তার বাবার সাত ছেলে এবং তিন মেয়ে। সেফুদার আপন ভাই ছয় জন এবং দুই বোন। প্রায় ২২ বছর আগে সেফুদা অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় চলে যান। তার একমাত্র ছেলে ফিনল্যান্ডে থাকেন। স্ত্রী থাকেন ঢাকায়।

সেফুদার বড় ভাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শামছুল আলম মজুমদার বলেন, ‘সেফাত উল্লাহ আমার ছোট ভাই। সে ছাত্রজীবন থেকেই মেধাবী ছিল। তার সহপাঠীরা সচিব পর্যায়ে চাকরি করেছে। ছাত্রজীবনেও সে উচ্ছৃঙ্খল ছিল। সে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছে। এরপর সে জাতিসংঘের শ্রম সংস্থায় (আইএলও) চাকরি করেছে। পরে সে কীভাবে যেন অস্ট্রিয়া চলে গেছে। এরপর তার সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। সেখানেও সে উচ্ছৃঙ্খলতা করছে। তার স্ত্রী ঢাকায় থাকেন।’

পৈত্রিক জায়গায় সেফুদার ভাইদের বাড়িতিনি বলেন, ‘বাবা তাকে বহু বছর আগে শোকশাক গ্রামে বাড়ি করার জন্য প্রায় ৩০ শতাংশ জমি আলাদা করে দেন। সেখানে কিছু গাছপালা লাগানো হয়েছে। এছাড়া বাড়ির ভেতরে কিছু জায়গা সে পাবে। আমাদের কারও সঙ্গেই তার যোগাযোগ নেই।’

সেফাত উল্লাহ মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন দাবি করে তিনি বলেন, ‘একসময় তাকে পাবনা হাসপাতালেও চিকিৎসা করা হয়েছিল। তার এসব আচরণে আমরা নিজেরাও ক্ষতিগ্রস্ত। আমরা নিজেরাও দুঃখিত।’

সেফায়েতউল্লাহ ওরফে সেফু। সেফুদা নামেই বেশি পরিচিত।

শাহরাস্তি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও সেফুদার চাচাতো ভাই রেদোয়ান হোসেন সেন্টু বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সেফাত উল্লাহ অবাধ্য হয়ে চলতেন। ২৫-৩০ বছর আগে উনাকে আমি দেখেছি। তিনি আসলে পাগল। তাকে আমার জেঠা ত্যাজ্যপুত্র করেন। তাকে পাবনায় নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। তার স্ত্রী ও ছেলের সঙ্গেও সম্পর্ক নেই বলে জানি। স্ত্রীর খোঁজ-খবরও তিনি নেন না। এসব কারণে তাকে বহু বছর আগেই দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়। আমরা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। এই কুলাঙ্গার পরিবারে আসায় আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার পরিচয় দিতেও আমাদের লজ্জা হয়। আমরা চাই তার শাস্তি হোক।’

সূচিপাড়া উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, ‘সেফুদা দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপে আছে। সেখানে বসেই সে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কটূক্তি করছে। সেই সঙ্গে ইসলাম ধর্ম নিয়েও কটূক্তি করেছে। তার এসব কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’

শাহরাস্তি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. কামরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘ফেসবুকে সেফুদা যেসব বলেন, নেশাগ্রস্ত হয়েই এসব কথাবার্তা বলেন। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি তার এই বক্তব্যগুলো কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আদালত তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছেন। পাশাপাশি দেশদ্রোহী হিসেবে তার নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি করছি। এছাড়া সে যদি কখনও আমাদের এলাকায় আসে তাহলে তাকে আমরা গণধোলাই দিয়ে এলাকাছাড়া করবো। তার এতো বাজে মন্তব্যের জন্য জাতি তাকে কখনোই ক্ষমা করবে না।’

শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিরিন আখতার বলেন, ‘আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। সেফুদা সম্পর্কে আমি তেমন কিছুই জানি না। তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার যে বিষয়টি, সে সম্পর্কে আমরা কোনও কাগজ পাইনি। আদালতের নির্দেশনা পেলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেবো।’

প্রসঙ্গত, ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের আপত্তিকর কথা, গালাগালি, বিদ্বেষমূলক ভিডিওবার্তা ছড়িয়ে আলোচনায় আসেন সেফুদা। ১৯৯০ সাল থেকে অস্ট্রিয়ার রাজধানীর ভিয়েনায় অবস্থান করছেন তিনি। সম্প্রতি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে সেফুদার সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে ক্রোক সংক্রান্ত তামিল প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২৬ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেন বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক আসসামছ জগলুল হোসেন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন একই ট্রাইব্যুনালের বিচারক।

 

/এফএস/ টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ