৬ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হয় যেসব জেলা

Send
বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৯:০২, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১৭, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯



সুনামগঞ্জ মুক্ত দিবস উপলক্ষে র‌্যালি

আজ ৬ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে যশোর, কুড়িগ্রাম, ফেনী, ঝিনাইদহ, সুনামগঞ্জ ও লালমনিরহাট জেলা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়। চূড়ান্ত বিজয়ের ১০ দিন আগেই যৌথ বাহিনীর দুর্দমনীয় বীরত্বে মুক্তির স্বাদ গ্রহণ করেন এসব জেলার বাসিন্দারা। জেলায় জেলায় নানা আয়োজনে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। আমাদের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

যশোর
মুক্তিযুদ্ধের সময় আজকের দিনে যশোর পাক হানাদার মুক্ত হয়েছিল। দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের লক্ষ্যে যশোর জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে। সকাল ১০টায় মুন্সি মেহেরুল্লাহ ময়দান (টাউন হল মাঠ) থেকে একটি শোভাযাত্রা শহরের মণিহার এলাকায় অবস্থিত বিজয় স্তম্ভে গিয়ে শেষ হয়। সকাল সাড়ে ৮টায় যশোর কালেক্টরেট চত্বর থেকে স্থানীয় একটি বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে মিনি ম্যারাথন শহরের প্রায় আট কিলোমিটার প্রদক্ষিণ করে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় স্তম্ভে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনসহ আলোচনা সভার আয়োজন করে।
যশোরের চৌগাছা উপজেলার সলুয়া বাজারে হানাদার বাহিনী তৈরি করে অগ্রবর্তী ঘাঁটি। সে সময় যশোর সেনানিবাসের তিন দিকেই মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসে। প্রতিরোধ যুদ্ধের শেষ অভিযান চলে ৩, ৪ ও ৫ ডিসেম্বর। এ তিন দিন যশোর অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। মিত্রবাহিনীও সীমান্ত এলাকা থেকে যশোর সেনানিবাসসহ পাক আর্মিদের বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা ও গোলা নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে পর্যুদস্ত পাকিস্তানি বাহিনী ৫ ডিসেম্বর থেকে পালাতে শুরু করে। এ দিন সকাল ও দুপুরে পাকিস্তানের নবম ডিভিশনের সঙ্গে ভারতীয় নবম পদাতিক ও চতুর্থ মাউন্টেন ডিভিশনের প্রচণ্ড লড়াই হয়। বিকালেই পাক সেনা অফিসাররা বুঝতে পারে—যশোর দুর্গ আর কোনোভাবেই রক্ষা করা সম্ভব নয়।
বেনাপোল অঞ্চলে দায়িত্বরত লে. কর্নেল শামসকে নওয়াপাড়ার দিকে দ্রুত সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন ব্রিগেডিয়ার হায়াত। আর নিজের ব্রিগেড নিয়ে রাতের আঁধারে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে তিনি পালিয়ে যান খুলনার দিকে। পালানোর সময় ৫ ও ৬ ডিসেম্বর শহরতলীর রাজারহাটসহ বিভিন্ন স্থানে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে তাদের লড়াই হয়। ৬ ডিসেম্বর বিকালে মিত্রবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল বারাতের নেতৃত্বে মিত্র ও মুক্তিবাহিনী সেনানিবাস দখল করে।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ যশোর জেলার সাবেক কমান্ডার রাজেক আহমদ বলেন, ‘৬ ডিসেম্বরেই আমরা যশোর শহর থেকে শত্রু সেনাদের বিতাড়িত করি। কিন্তু সেদিন যশোর শহর ছিল জনশূন্য। ফলে পরদিন ৭ ডিসেম্বর বিজয় মিছিল বের হয়।’

কুড়িগ্রাম

উত্তরের জনপদ কুড়িগ্রাম হানাদারমুক্ত দিবস ৬ ডিসেম্বর। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কুড়িগ্রাম জেলা ইউনিট কমান্ড এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠন সম্মিলিতভাবে কর্মসূচি পালন করেছে। শুক্রবার (৬ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টায় জেলা শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বর থেকে একটি র‌্যালি বের হয়। এছাড়া বিজয় স্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণসহ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এই দিনে মুক্তিবাহিনীর কে ওয়ান এফএফ কোম্পানি কমান্ডার আব্দুল হাই সরকারের (বীর প্রতীক) নেতৃত্বে ৩৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল বিকাল ৪টা দিকে কুড়িগ্রাম শহরে প্রথম প্রবেশ করেন। এরপর তারা নতুন শহরের ওভার হেড পানির ট্যাংকের ওপরে (বর্তমান সদর থানার উত্তরে অবস্থিত) স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে চারিদিকে ছড়িয়ে দেন বিজয়বার্তা। সেদিন বিজয় মিছিলে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাগত জানাতে হাজারও মুক্তিকামী মানুষ রাস্তায় নামেন। ২৩০ দিন পাক হানাদার বাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ থাকার পর মুক্ত হয় কুড়িগ্রাম।

ফেনী

১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদর বাহিনীকে হটিয়ে ফেনীকে স্বাধীন ঘোষণা করা হয়। ওই দিন সকাল থেকে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের নেতৃত্বে দলে দলে ফেনী শহরে প্রবেশ করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন সাধারণ মানুষ।

দিবসটি উপলক্ষে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আয়োজনে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ভোরে ফেনীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন।সকাল ১০টায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

দিবসটি পালনকালে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম বীর বিক্রম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ৬ ডিসেম্বর বীরদর্পে ফেনীতে প্রবেশ করি। তখন ফেনী সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত। এই যুদ্ধে আমাদের প্রায় ১৩৭ জন যোদ্ধা শহীদ হন। আহত হন প্রায় ২০০ জন।
ঝিনাইদহ
৬ ডিসেম্বর ঝিনাইদহ মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর আক্রমণে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসররা। আকাশে ওড়ে লাল সবুজের পতাকা। মুক্তির মিছিল ছড়িয়ে পড়ে জেলা থেকে গ্রাম-গ্রামান্তরে।
দিবসটি উপলক্ষে শুক্রবার সকালে জেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আয়োজনে শহরের পুরাতন ডিসি কোর্ট চত্বর থেকে একটি র‌্যালি বের করা হয়। র‌্যালিটি শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে পায়রা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে জাতীয় ও মুক্তিযুদ্ধের পতাকা উত্তোলন করা হয়। পরে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা।
জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং শৈলকুপা-১ আসনের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য খালেদা খানম, পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মকবুল হোসেন।
সুনামগঞ্জ
১৯৭১ সালের আজকের দিনে সুনামগঞ্জ শহর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়েছিল। দিনটি উদযাপনের জন্য জেলা ও সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর শহরে পাকবাহিনীর ওপর আক্রমণের পরিকল্পনা করেন মুক্তিযোদ্ধারা। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভোর রাতে মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন দিক থেকে শহরে প্রবেশ করেন। পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের বিষয়টি বুঝতে পেরে রাতেই সুনামগঞ্জ শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা শহরে প্রবেশ করার পর স্থানীয় ছাত্র-জনতা মুক্তির আনন্দে শহরের রাস্তায় নেমে আসেন। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিকামী জনতার ‘জয়বাংলা’ শ্লোগানে প্রকম্পিত হয় পুরো শহর।
আজ সকাল ১০টায় জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে সুনামগঞ্জ মুক্ত দিবসের কর্মসূচি শুরু করে। এরপর সুনামগঞ্জ শহরে প্রথম নির্মিত শহীদ মিনারে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, শোভাযাত্রা এবং পরে শহরের শহীদ আবুল হোসেন মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও মেডিক্যাল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে র‌্যালি ও বর্ণাঢ্য শুভাযাত্রায় বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ অংশ নেন।
এছাড়া লালমনিরহাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলা; দিনাজপুরের বীরগঞ্জ, বোচাগঞ্জ, বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলা আজকের দিনে শত্রু মুক্ত হয়। দিবসটি উপলক্ষে এসব জেলা ও উপজেলায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

 

/আইএ/

লাইভ

টপ