শিক্ষার্থীর খাতা পুনর্মূল্যায়ন, জানে না পরীক্ষা কমিটি

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৭:৩১, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫১, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৯

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ফল প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা কমিটিকে না জানিয়ে এক শিক্ষার্থীর খাতা পুনর্মূল্যায়নের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষকরা। তাদের অভিযোগ, ওই শিক্ষার্থীকে বিশেষ সুবিধা দিতে পরীক্ষা কমিটিকে না জানিয়ে ‘অনৈতিকভাবে’ খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য অন্যত্র পাঠিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বাবুল ইসলাম বলছেন, ‘উপাচার্য চাইলে পরীক্ষা কমিটিকে না জানিয়ে অন্যত্র খাতা পাঠাতে পারেন।’

এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালে ২৪৫তম অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল সভায় সিদ্ধান্ত হয়, যদি কোনও শিক্ষার্থী তার রেজাল্ট নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন, পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করেন, সেটি প্রক্রিয়ার জন্য একটি কমিটি করা হবে। কমিটি না হওয়া পর্যন্ত উপাচার্য বিষয়টি দেখবেন। পরে বিষয়টি ৪৭৪তম সিন্ডিকেটে পাস হয়।’

তবে খাতা অনত্র পাঠাতে অবশ্যই পরীক্ষা কমিটির সুপারিশ প্রয়োজন দাবি করে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সফিকুন্নবী সামাদী বলেন, ‘অ্যাকাডেমিক কমিটির সুপারিশ লাগবে। শুধু একটি নোটিশে খাতাগুলো নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরীক্ষা কমিটি ও অ্যাকাডেমিক কমিটি কাউকে জানানো হয়নি। এমনকি বিভাগের সভাপতিকে কিছু জানানো হয় নি। এটা কী যথেষ্ট অন্যায় নয়?’

নিয়মের প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যে এসব আইনগত ব্যাপার ভেবে দেখিনি তা নয়, তারপরও আমরা কেন অভিযোগ করছি- সেটা খেয়াল করুন। সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা জান্নাতুল ফেরদৌস শিল্পীর ভাগ্নে নাহিদ ইসলামকে নিয়ে সমস্যা। এর আগেও তারই আরেক ভাগ্নে শিবলি ইসলামের নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। অনার্সে শিবলির প্রথম শ্রেণি ছিল না। তারপরও বিশেষ অনুমতি নিয়ে দরখাস্ত করেছেন। পরে তার মাস্টার্সের রেজাল্ট হওয়ার পরেই ইন্টারভিউ ডাকা হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি নিয়োগ পান এবং সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর এবার তার ছোট ভাইয়ের খাতা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা আর কী প্রমাণ আর দেবো?’

ইংরেজি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নাহিদ ইসলাম ২০১৬-১৭  শিক্ষাবর্ষের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০১৭ সালের লিখিত পরীক্ষা ২০১৮ সালে ২২ জুলাই শুরু হয়ে ১৯ সেপ্টেম্বর শেষ হয়। ফল প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালের ৫ মার্চ। ওই শিক্ষার্থীর স্নাতকোত্তরের ছয়টি কোর্সের একটিতে ‘এ মাইনাস’, পাঁচটিতে ‘বি’ এবং ১০০ নম্বরের ভাইভা পরীক্ষায় ‘বি প্লাস’ পেয়েছেন। তার মাস্টার্সের মোট সিজিপিএ ৩.১১ এবং অনার্সের মোট সিজিপিএ ৩.২২।

বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর অনেকদিন অতিবাহিত হলেও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দফতর খাতা নেয় না। বিভাগ থেকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে একাধিকবার চিঠি দিতে হয় খাতা নেওয়ার জন্য। কিন্তু ২০১৭ সালের স্নাতকোত্তরের খাতাগুলো জমা দেওয়ার জন্য ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বাবুল ইসলাম ফোন করেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে এই বছরের ১ জুলাই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তরের খাতা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে পাঠানো হয়।

এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বাবুল ইসলাম বলেন, ‘২০১৮ সালের শেষের দিকে একটি নিয়ম করা হয়, অনার্স এবং মাস্টার্সের ফল প্রকাশের পর খাতা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দফতরে পাঠাতে হবে। এই কারণে আমরা খাতা চেয়ে পাঠিয়েছি।’

নাম প্রকাশ না করা শর্তে ইংরেজি বিভাগের একজন শিক্ষক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সম্প্রতি পরীক্ষা কমিটির সভাপতির নিকট থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেছেন উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান।’

জানতে চাইলে পরীক্ষা কমিটির সভাপতি জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘এই বছরের অক্টোবরের মাঝামাঝি উপাচার্য আমাকে ফোন করে ২০১৭ সালের মাস্টার্সের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দিতে বলেন। পরে আমি একসেট প্রশ্নপত্র তার কাছে পাঠাই।’

ফলাফল পুনর্মূল্যায়নের আবেদনের বিষয় জানতে চাইলে ইংরেজি বিভাগের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, ‘আমরা কিছুই জানি না। তবে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের কাছে শোনার পর আমি বিভাগের শিক্ষক ও পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছি। বিষয়টির ব্যাপারে তারা কেউ অবগত নন বলে জানিয়েছেন। তবে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দফতর থেকে ২০১৭ সালের স্নাতকোত্তরের খাতা চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ১ জুলাই খাতা পাঠিয়েছে। কোনও বিভাগে থেকে খাতা চেয়ে নেওয়া ঘটনা এটিই প্রথম।’ 

খাতা পুনর্মূল্যায়নের এই পদ্ধতির প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে তবে তা দুঃখজনক। কোনও শিক্ষার্থী যদি মনে করেন যে, তার প্রতি ফলাফলে অবিচার করা হয়েছে। তবে তিনি আবেদন করতিই পারেন। কিন্তু পরীক্ষা কমিটিকে না জানিয়ে, খাতা মূল্যায়নের জন্য অন্য কোথাও পাঠানোর মাধ্যমে বিভাগের প্রতি অসম্মান জানানো হয়।’

তবে অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌস শিল্পী বলেছেন, ‘আমার ভাগ্নে আবেদন করেছেন কিনা তাও জানি না। প্রভাবের কোনও প্রশ্নই আসে না।’

এদিকে নিজের নিয়োগের ব্যাপারে সহকারী প্রক্টর ও সহযোগী অধ্যাপক শিবলি ইসলাম বলেন, ‘আমি অ্যাপিয়ার্ড সার্টিফিকেট নিয়ে আবেদন করেছিলাম। বাংলা বিভাগের শিক্ষক সুপ্রিয়া রানী দাস, ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের শিক্ষক আব্দুল্ল্যাহ আল মারুফ, রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলামসহ  (বর্তমানে অবসরে আছেন ) অনেক শিক্ষক এরকম অ্যাপিয়ার্ড সার্টিফিকেট নিয়ে আবেদন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকেই এই পদ্ধতিতে অনেকেই আবেদন করেছেন এবং পরবর্তীতে শিক্ষকও হয়েছেন। এক্ষেত্রে আমাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। সুবিধার কথা বলে তারা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।’

উল্টো দুই বছর তার পদন্নোতি আটকে রাখা হয়েছিল বলে গত প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন শিবলি ইসলাম। তিনি আরও বলেন, ‘আমার নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছিল। মামলায় আমি জয়ী হয়েছি। মামলা চলাকালে আদালত থেকে আমার পদন্নোতির বিষয়ে কোনও ধরনের নিষেধাজ্ঞা না থাকার পরও গত প্রশাসন দুই বছর আমার পদোন্নতি আটকে রেখেছিল।

পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়নের আবেদনের বিষয়ে জানতে শিবলি ইসলামের ছোট ভাই মো. নাহিদ ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি ঠিক কবে আবেদন করেছেন তা সঠিকভাবে বলতে পারেননি।

তবে এই আবেদন ও খাতা মূল্যায়নের বিষয়ে উপাচার্য বিস্তারিত বলতে পারবেন বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বাবুল ইসলাম।

এ বিষয়ে জানতে দুই দফা উপাচার্যের দফতরে গিয়েও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে উপচার্যের সচিব মীর শাহজাহান আলী উপাচার্যের কক্ষ থেকে ফিরে বলেছেন, ‘স্যার বলেছেন, আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুরো ব্যাপারটি প্রসেস করা হচ্ছে।’ এরপর একাধিকবার মুঠোফোনে উপাচার্যের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি। 

 

/এএইচ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ