জটিলতা থাকলেই প্রসূতি রেফারড!

Send
আমিনুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জ
প্রকাশিত : ১৩:০০, ডিসেম্বর ১১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০০, ডিসেম্বর ১১, ২০১৯

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালজটিলতা থাকলেই প্রসূতিকে হাসপাতালে রাখা হয় না। উন্নত চিকিৎসার কথা বলে তাকে রেফার করা হয় বগুড়ায়। আর  প্রসূতি যদি দুপুরের পর বা ছুটির দিনে ভর্তি হন তাহলে তো কথাই নেই। প্রসূতির স্বাস্থ্যও পরীক্ষা করা হয় না। অযত্ন-অবহেলায় তাকে ফেলে রাখা হয় হাসপাতালের মেঝেতে। এমনই অবস্থা সিরাজগঞ্জ জেলা সদরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, চিকিৎসক না থাকাতেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।  

গাইনি ওয়ার্ডের অধিকাংশ চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে  অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। তবে শুধু গাইনি বিভাগেই নেই নয়, একই অবস্থা পুরো হাসপাতালেই। অভিজ্ঞ, দায়িত্বশীল ও দক্ষ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে হাসপাতালে।

অভিযোগ রয়েছে, দু-একজন বাদে এ ওয়ার্ডের অধিকাংশ চিকিৎসক দায়সারাভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। দুপুরের পর বা ছুটির দিনে অনেক চিকিৎসকের হাসপাতালে আসার কথা থাকলেও তারা সময়মতো আসেন না। পার্শ্ববর্তী মেডিক্যাল কলেজের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা,  যারা হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন, তারাও অনেকটা দায়সারভাবে কাজ করেন। 

জানা গেছে, ১ ডিসেম্বর রহিমা খাতুন নামে এক রোগী জটিলতা নিয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে আসেন। গাইনি বিভাগ থেকে তাকে বগুড়ায় রেফার করা হয়। এরপর হাসপাতাল গেটে মৃত সন্তান প্রসব করেন তিনি।

৮ ডিসেম্বর রাতে মরিয়ম খাতুন নামে আরেক প্রসূতি সদর হাসপাতালের করিডোরে সন্তান জন্ম দেন। ওই দিন সকালেই গুরুতর অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উপযুক্ত চিকিৎসা না দিয়ে তাকেও বগুড়ায় রেফার করা হয়।

রহিমার ঘটনাটি জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে তদন্ত হলেও এখনও ফলাফল জানা যায়নি। আর মরিয়মের  ঘটনার তদন্ত তো দূরের কথা এখনও সেভাবে আমলে নেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসন।  

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে সাবেক সিভিল সার্জন ডা. শামসুদ্দিন হাসপাতালের অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলেন। তখন হাসপাতালের চিত্র কিছুটা পাল্টাতে শুরু করে। তিনি অবসরে যাওয়ার পর গত ৪ বছরেও সেটি আর নতুন করে চালু হয়নি।

হাসপাতালের করিডোরে সন্তান জন্ম দেন মরিয়ম বেগমসদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. ফরিদুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালের সিনিয়র কানসালট্যান্টের পদটিই শূন্য। জুনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে যিনি আছেন তিনি প্রশিক্ষণে। ওয়ার্ডের ইনচার্জ শহীদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাহবুবা খাতুন প্রসূতি মরিয়ম খাতুনকে দেখার পর জটিল ভেবে তাকে বগুড়ায় শজিমেক হাসপাতালে রেফার করেন। তাকে নিয়ে যাওয়ার সময় সন্তান জন্ম দেন।  বিষয়টি নিয়ে আমরাও চিন্তিত। আগের ঘটনায় জেলা প্রশাসন থেকে তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত কমিটিতে আমিও আছি। দু-একদিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

তিনি আরও  বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরও একটি তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু সমস্যা হলো গাইনি ওয়ার্ডের ইনচার্জ যিনি তিনি এক সহযোগী অধ্যাপক এবং তার বেতন স্কেল অনেক বেশি। সরকারি বিধি অনুযায়ী, তার চেয়ে বেশি বেতন স্কেলের যারা রয়েছেন, তদন্ত দলের প্রধান তাদের মতো একজন  হওয়া উচিত। যেটি খুঁজে না পাওয়ায় একটু বিলম্ব হচ্ছে। তবে, প্রাথমিক তদন্তে দুটি ঘটনার কোনোটিতে তার গাফিলতি বা দায়িত্ব অবহেলা খুঁজে পাওয়া যায়নি।’

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রমেশ চন্দ্র সাহা বলেন, ‘আমি ছুটিতে থাকলেও দুটি ঘটনা তদন্ত করে দেখতে আবাসিক মেডিক্যাল অফিসারকে বলা হয়েছে।’

ঘটনা দু’টির বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দুটি ঘটনাই অনাকাঙ্ক্ষিত। দুটি ঘটনারই দায় এড়ানো যায় না। আগেরটি জেলা প্রশাসন থেকে তদন্ত করা হচ্ছে। পরেরটি তদন্ত করতে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ককে অনুরোধ করা হয়েছে।’
জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহাম্মদ বলেন, ‘ঘটনা দুটি সম্পর্কে গণমাধ্যমে দেখেছি এবং  স্থানীয়ভাবে জেনেছি। প্রথম ঘটনাটি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি তদন্ত করছেন। পরের ঘটনাটি ওই কমিটিকে তদন্ত করতে বলা হয়েছে।’
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘ঘটনা দুটি প্রায় একই ধরনের। প্রথমটির তদন্ত প্রায় শেষ। প্রথম তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিতীয়টির বিষয়ে আমাদের সুপারিশ থাকবে।’

গাইনি ওয়ার্ডের ইনচার্জ ডা. মাহবুবা খাতুন বলেন, ‘রহিমা খাতুন ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। জ্বর ছাড়াও প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়াসহ নানা জটিলতা ছিল তার। সেজন্য তাকে রেফার করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার গর্ভপাত হয়। আর মরিয়ম খাতুনের জরায়ুতে সমস্যা ছিল।এছাড়া তার প্রস্রাবের সঙ্গে রক্তপাতও হচ্ছিল। ওই অবস্থায় তার অপারেশন করলে আইসিইউ এবং নবজাতকের জন্য এনআইসিইউ সাপোর্ট দরকার হতো, যা এই  হাসপাতালে ছিল না। তাই তাকে বগুড়ায় রেফার করা হয়।’

 

/এসটি/এমওএফ/

লাইভ

টপ