ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী

Send
আবদুল আজিজ, কক্সবাজার
প্রকাশিত : ০৩:৩৯, জানুয়ারি ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:৪৬, জানুয়ারি ৩০, ২০২০

 

দূরশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে ঢাকার শিক্ষকরা ক্লাস নিচ্ছেন স্থানীয় শিশুদের

কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী। একসময় কক্সবাজার জেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপ এখন আগের মতো নেই। একদিকে সরকারের বড় মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পথে, অন্যদিকে ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে মহেশখালী। স্বাস্থসেবা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য,  কৃষি ও দ্রুতগতির ইন্টারনেটসহ নানা নাগরিক সুবিধা এখন উপভোগ করছে দ্বীপবাসী। ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীকে ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড’  করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরপরই বদলে যেতে থাকে মহেশখালী।

মহেশখালীকে দ্রুতগতির ইন্টারনেটের আওতায় নিয়ে আসার কারণে এর সুফল ভোগ করছে দ্বীপের মানুষ। তথ্য প্রযুক্তির সেবা গ্রামের তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার পাইলট প্রকল্প হিসেবে মহেশখালী দ্বীপকেই বেছে নিয়েছে। দ্বীপে ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ই-সেবা পৌঁছে যাচ্ছে জনগণের কাছে। গত সোমবার (২৭ জানুয়ারি) মহেশখালী উপজেলায় বিভিন্ন ই-সেবা, কেন্দ্র, ই-কমার্স সেন্টার এবং ডিজিটাল স্কুল সরেজমিনে গিয়ে এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে।

ভিডিও কনফারেন্সে পরামর্শ নিচ্ছেন কৃষকরা

সরেজমিন পরিদর্শনের সময় কথা হয় মহেশখালী আদিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসফিয়া, ইশান দে অন্তু, জয়ন্ত দে-সহ একাধিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। এরা সবাই একই শ্রেণিতে মাল্টিমিডিয়া স্কুলে পড়ে। প্রতিদিন সকাল ৯ থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত তাদের ক্লাস নেন ঢাকার অভিজ্ঞ শিক্ষকরা। দূরশিক্ষণের মাধ্যমে তারা নিজ বিদ্যালয়ে বসেই ইংরেজি, গণিত, বাংলা পাঠ নিচ্ছে। জাগো ফাউন্ডেশনের জাগো ডিজিটাল স্কুলের শিক্ষক ফারিহা আহমদ ঢাকায় বসেই সরাসরি তাসনিয়াদের ইংরেজি পড়াচ্ছেন।

দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী ঘোরকঘাটার বাসিন্দা জাহানারা বেগম। চর্ম রোগের চিকিৎসা নিতে এসেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। চর্মরোগের চিকিৎসাটি জটিল হওয়ায় আনোয়ারা বেগমকে কক্সবাজার কিংবা চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক শিব শেখর ভট্টাচার্য্য ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে জাহানারা বেগমের চর্ম রোগের ব্যবস্থাপত্র দেন। জাহানারা বেগম দ্বীপে থেকেই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে পারছেন। তিনি বলেন, মহেশখালীতে বসেই চিকিৎসা করাতে পারছি। এতে সময় এবং অর্থ দুটোই বেঁচে গেলো।

ভিডিও কনফারেন্সে পাচ্ছেন চিকিৎসাসেবাও

দ্বীপের বাসিন্দা দিদারুল ইসলাম, মারুফা নাসরিন লোপা এবং রোমেনা আকতার। মূল ভুখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে শুধু পড়ালেখা নিয়েই বসে থাকেনি এই তরুণ-তরুণীরা। পাশাপাশি যুক্ত হয়েছেন অনলাইন ব্যবসায়। নিজেদের গড়ে তুলেছেন উদীয়মান ‘উদ্যোক্তা’ হিসেবে। তারা ৯ জন মিলে গড়ে তুলেছেন অনলাইনে বিষমুক্ত শুটকি বিক্রির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘ই-বিজনেস সেন্টার’। ওই তরুণ-তরুণীরা মাঠ পর্যায় থেকে বিষমুক্ত শুটকি সংগ্রহ করে অনলাইনে বিক্রি করেন। সেই শুটকি পৌঁছে দিচ্ছে দেশের নানাপ্রান্তের গ্রাহকদের কাছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর ডিজিটাল আইল্যান্ড প্রকল্পটি দেশের দ্রুততম ইন্টারনেট গতির মাধ্যমে মহেশখালীকে একটি বিচ্ছিন্ন উপদ্বীপ থেকে একটি উদীয়মান প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসাবে রূপান্তর করতে সহায়তা করছে। এই প্রকল্পটি আইওএম বাংলাদেশ মিশনের প্রথম পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্প। আইওএম, কোরিয়া টেলিকম, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল যৌথভাবে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ডিজিটাল আইল্যান্ড প্রকল্পটি দ্বীপের একটি পৌর এলাকাসহ আরও দুইটি ইউনিয়ন এলাকার মানুষের মাঝে ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিচ্ছে।

অনলাইনে বিষমুক্ত শুটকি বিক্রির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান

আইওএম-এর ট্রানজিশন অ্যান্ড রিকভারি ডিভিশন (টিআরডি)-এর প্রধান প্যাট্রিক শেরিগনন জানান, মহেশখালী দ্বীপটিকে এই প্রকল্পের জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল কারণ এটি বাংলাদেশের অন্যতম স্বল্পোন্নত দ্বীপ। এখানে নিরক্ষরতার হার বেশি এবং মাটির লবণাক্ততা কৃষি ফলনকে বাধাগ্রস্ত করে। স্থানীয় যুবসমাজ দ্বীপ থেকে স্থানান্তরিত হচ্ছে এর ফলে এই দ্বীপের ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। ডিজিটাল দ্বীপ প্রকল্পটির লক্ষ্য হল সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের বিদ্যমান সুবিধাগুলোর আরো প্রসার ঘটিয়ে মহেশখালীর বাসিন্দাদের জন্য সুযোগ তৈরি করা।

মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জামিরুল ইসলাম বলেন, ডিজিটাল আইল্যান্ড একটি বহুমুখী প্রকল্প যা বাংলাদেশের অন্যতম বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীটিকে দেশের দ্রুততম গতির ইন্টারনেট মাধ্যমে বিশ্বের সাথে যুক্ত করেছে। ডিজিটাল আইল্যান্ড প্রকল্পটির মাধ্যমে দ্বীপে পজিটিভ পরিবর্তন এসেছে। সুফল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। টেলিমেডিসিন, দুর-শিক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও কমিউনিটি ক্লাবের মাধ্যমে সেবা পাচ্ছেন জনগণ।

তরুণরা নিচ্ছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ

তার মতে, দ্রুতগতির ইন্টারনেটের মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসন ই-ফাইলিংয়ের মাধ্যমে ৮০ শতাংশ দাফতরিক কাজ করছে। ই-ফাইলিংয়ের মাধ্যমে মহেশখালী উপজেলা প্রশাসন সারাদেশের সবগুলো উপজেলার মধ্যে ১৪তম স্থান করে নিয়েছে। এছাড়াও প্রকল্পটির আওতায় মহেশখালীতে বিদ্যমান একটি টাওয়ার সংস্কার এবং গিগা মাইক্রোওয়েভ স্থাপন যার ফলে মহেশখালীর বাসিন্দারা ১০০ এমবিপিএসেরও বেশি গতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সুবিধা পাচ্ছেন।

মহেশখালী দ্বীপ সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা স্থানীয় জনগোষ্ঠীটিকে উন্নত স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের পরিষেবাগুলো নিশ্চিতে ভূমিকা রাখছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে দ্বীপটির বাসিন্দাদের শিক্ষার সরঞ্জামাদি এবং চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য অনলাইন স্বাস্থ্য পরিষেবাও দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়  উৎপাদনকারীদের উৎপাদিত শুটকি বিক্রির জন্য ই-কমার্সের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পূরণে ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড দ্বীপ’ উদ্যোগও বাংলাদেশের অগ্রগতির একটি অংশ হয়ে প্রকাশ পেয়েছে।

ডিজিটাল মহেলখালী

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, প্রকল্পটি ই-টিচিং এবং ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। প্রকল্পটি শেষ হওয়ার পরে এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেওয়া শিক্ষা-উপাদানগুলো স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষকদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। কীটনাশক এবং সংরক্ষণকারী রাসায়নিক উপকরণগুলোর ব্যবহার কমিয়ে স্থানীয়দের জৈব কৃষি এবং অর্গানিক পদ্ধতিতে মাছ শুকানোতে উৎসাহিত করছে এই প্রকল্প। পাশপাশি ই-কমার্সের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য বিক্রির মাধ্যমে আয় বাড়ানো ও মধ্যস্বত্তভোগীদের দৌরাত্ম দূর করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, জাগো ফাউন্ডেশন মাধ্যমে দশটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দূরশিক্ষণ পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় রাজধানী ঢাকার শিক্ষকরা মহেশখালী দ্বীপের শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ইংরেজি কোর্সে শিক্ষা দেন। এছাড়াও চারটি কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিক এবং একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে মোবাইল স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়া যাচ্ছে। এসব পরিষেবাগুলো হলো স্বয়ংক্রিয় স্বাস্থ্যগত রেকর্ড সিস্টেম, টেলিমেডিসিন পরামর্শ, মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা ডিভাইসগুলোর মাধ্যমে রোগ নির্ণয় ইত্যাদি। স্থানীয় এবং সরকারী কর্মকর্তাদের কম্পিউটার দক্ষতা বিষয়ক প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে আইওএমের গড়া ডিজিটাল সেন্টারে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি কমিউনিটি ক্লাব এবং কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে কম্পিউটার এবং দ্রুতগতির ইন্টারনেট সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে বলে জানান তারা।

ডিজিটাল ক্লাস

/এমআর/

লাইভ

টপ