‘বাড়ি ফিরলে গ্রামীণ প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতেন বঙ্গবন্ধু’

Send
মোজাম্মেল হোসেন মুন্না, গোপালগঞ্জ
প্রকাশিত : ১২:৫৬, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৩, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০২০

টুঙ্গিপাড়ার সড়ক

নারিকেল-সুপারির ছায়াঘেরা মধুমতি নদীর তীর ছোঁয়া সবুজ শ্যামল গ্রাম টুঙ্গিপাড়া। তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার পাটগাতি ইউনিয়নের এই গ্রামেই ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এখানকার শ্যামলছায়াতেই দুরন্তপনায় কেটে গেছে বঙ্গবন্ধুর ছোটবেলা। মধুমতির জলে গাঁয়ের ছেলেদের সঙ্গে সাঁতার কাটা, দৌড়-ঝাঁপ, দল বেঁধে হা-ডু-ডু, ফুটবল খেলায় তিনি ছিলেন দশ্যি বালকদের নেতা। তখন কে জানতো, এই দশ্যি বালকদের এই নেতাই একদিন হবেন বিশ্বনেতা, হবেন বাঙালির জাতির পিতা! কিন্তু বাস্তবে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতাই হয়েছেন তিনি।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতির ছোটবেলার বিষয়ে কথা বলেছেন টুঙ্গিপাড়ার স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা। বঙ্গবন্ধু যখন উঠতি ছাত্রনেতা, তখনই তৎকালীন মুরুব্বিদের কাছে তার (বঙ্গবন্ধুর) শৈশব-কৈশোরের গল্প শুনেছেন তারা (এখন যারা বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি), কথা হয় তাদের সঙ্গে, স্মৃতি ঘেঁটে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন তারা।

টুঙ্গিপাড়া গ্রামের শেখ বোরহান উদ্দিন (৭৫) বলেন, ‘নিজ গ্রামের মানুষের কাছে তিনি সব সময়ই ছিলেন মুজিবুর। তিনি একজন সাধারণ মানুষের মতো জীবন-যাপন করতেন। ঢাকা থেকে যখন গ্রামের বাড়িতে যেতেন, মিশে যেতেন গ্রামের প্রকৃতি ও গ্রামীণ খেলাধুলার সঙ্গে।’

বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স

গ্রামীণ জীবনের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসার ব্যাপারে স্থানীয় বেশ কয়েকজনের কণ্ঠেই একই সুর। তারা বলেছেন, ‘মধুমতির জলে গাঁয়ের ছেলেদের সঙ্গে সাঁতার কাটা, দৌড়-ঝাঁপ, দল বেঁধে হা-ডু-ডু, ফুটবল খেলতে ভালোবাসতেন তিনি।  

তারা আরও মনে করেন, বঙ্গবন্ধু বেড়ে ওঠেন টুঙ্গিপাড়ার গ্রামীণ জীবনপ্রবাহের মধ্যে। তার রাজনৈতিক জীবনের জন্য সেই পরিবেশ বেশ সহায়ক হয়েছে বলেই তাদের ধারণা।

জানা যায়, গৃহশিক্ষা শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভর্তি হন পূর্ব পুরুষের গড়া প্রতিষ্ঠান জিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বর্ষাকালে স্কুলে যাওয়ার সময় নৌকাডুবি হলে শেখ মুজিব পড়ে যান খালের পানিতে। এরপর বঙ্গবন্ধুর দাদি তার আদরের নাতিকে আর ওই স্কুলে যেতে দেননি। এরপর বঙ্গবন্ধুর ঠিকানা হয় বাবার কর্মস্থল গোপালগঞ্জ শহরের মিশনারি স্কুলে। তিনি যখন গোপালগঞ্জ মিশনারি হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, তখনকার কথা উল্লেখ করে গোপালগঞ্জ সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘মুরুব্বিরা বলতেন, মুজিব যখন নবম শ্রেণির ছাত্র, তখন ছাত্রদের উদ্দেশে এক ভাষণ দেওয়ার সময় তাকে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। সম্ভবত এটিই ছিল তার জীবনের প্রথম গ্রেফতার। পরে ছাত্রদের চাপের মুখে পুলিশ শেখ মুজিবকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।’

বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ

হাবিবুর রহমান আরও বলেন, ‘গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করা শেখ মুজিবুর রহমান পরবর্তীতে মুখ্য ভূমিকা রাখেন আজকের সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজ প্রতিষ্ঠায়।’

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ও স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানকে জানার সুযোগ করে দিতে টুঙ্গিপাড়ার সমাধি কমপ্লেক্সে গড়ে তোলা হয় একটি পাঠাগার। এ বিষয়ে পাঠাগারের লাইব্রেরিয়ান যোগেন্দ্র নাথ বাড়ৈ বলেন, ‘আধুনিক সুযোগ সম্বলিত এই লাইব্রেরিতে ১০ ক্যাটাগরিতে রয়েছে ৮ হাজার বইয়ের এক বিশাল সমাহার। সংরক্ষিত বইগুলোর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা বইয়ের সংখ্যাই বেশি। কমপ্লেক্সে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে সপ্তাহে ৭ দিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা রাখা হয় পাঠাগারটি।’

বঙ্গবন্ধু সমাধি কমপ্লেক্সের লাইব্রেরি

উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে ঘাতকের বুলেটে সপরিবারে প্রাণ হারান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তী সময়ে টুঙ্গিপাড়ার পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশেই সমাহিত করা হয় তাকে। বাঙালির ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানকে চির অম্লান করে স্মরণ করতে তার সমাধিসৌধকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয় বঙ্গবন্ধু সমাধি কমপ্লেক্স। লাল সিরামিক ইট আর সাদা-কালো মার্বেল পাথর দিয়ে নির্মিত এই সৌধের কারুকার্যে ফুটে উঠেছে বেদনার চিহ্ন।

/এএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ