সাগরে বড় জাহাজে ওঠার কথা ছিল ওদের

Send
আবদুর রহমান, টেকনাফ
প্রকাশিত : ০১:১১, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:২৬, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০

একজনকে উদ্ধার করে নিয়ে আসছেন কোস্টগার্ডের সদস্যরাসাগর পথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) ভোরে সেন্টমার্টিনের অদূরে ট্রলার ডুবির ঘটনায় ১৫টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৭২ জনকে। এই যাত্রীদের সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে সাগরে নোঙর করে রাখা বড় জাহাজে তুলে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রচণ্ড বাতাসের কারণে বড় জাহাজে নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে যাত্রীভর্তি ট্রলারটি ফেরত আনার সময় সেন্টমার্টিনের কাছকাছি পাথরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ডুবে যায়। জীবিত উদ্ধার যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে লাশগুলো টেকনাফ মডেল থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। জীবিত উদ্ধার ৭২ জনের মধ্যে ৪ দালাল ছাড়া বাকিদের যাচাই-বাছাই শেষে ক্যাম্পে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। দালালরা হলেন—টেকনাফের নোয়াখালী পাড়ার ফয়েজ আহম্মদ (৪৮), সৈয়দ আলম (২৭), উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আজিম (৩০) এবং বালুখালীর ওসমান (১৭)।

ট্রলারের প্রধান মাঝি (দালাল) ফয়েজ আহম্মদ বলেন, ‘নুরুল আলম, সৈয়দ আলম ও মো. ইউনুছ—তিন জনই মানবপাচারকারী। তারা দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় বসবাস করে আসছেন। এই ট্রলারটির মালিকও তারা।’

ট্রলারটির প্রধান মাঝি বলেন, ‘ওই ট্রলারের বেশিরভাগ যাত্রী উখিয়াসহ টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরের বাস করেন। সেখান থেকে রওনা দেওয়ার আগে টেকনাফের জুম্মা পাড়া এলাকার একটি পাহাড়ে কেউ পাঁচ দিন, কেউ কেউ এক সপ্তাহ পর্যন্ত ছিলেন। সর্বশেষ দালাল ইউনুছের সঙ্গে কথা বলে সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টার দিকে তাদের বের করে ট্রলারে তোলা হয়। তার কথা মতে তাদের সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে সাগরে নোঙর করা বড় একটি জাহাজে তুলে দেওয়ার কথা ছিল। তবে বাতাস বেশি থাকায় নোঙর করা জাহাজ পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরে তাদের ফেরত আনার পথে সেন্টমার্টিনের কাছকাছি পাথরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ট্রলারটি ডুবে যায়। এই কাজের জন্য ইনুছ আমাকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার পর আরও টাকা দেওয়ার কথা ছিল। ’

কোস্টগার্ড টেকনাফের স্টেশন কমান্ডার লে. কমান্ডার সোহেল রানা জানান, ‘জীবিত উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে দালাল ও পাচারকারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তারা মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের সাগরে নোঙর করা বড় জাহাজে তুলতে চেয়েছিল।’
উদ্ধার অভিযানে বিজিবি ও কোস্টগার্ড সদস্যরাএক সপ্তাহ পাহাড়ে থাকা রোকেয়া বলেন, ‘পাহাড় থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় ছোট্ট নৌকা খারাপ হয়ে যায়। তখন আমরা বলেছিলাম—যাবো না, কূলে নৌকা ফেরত নিয়ে যান। কিন্তু তারা কিছু হবে না বলে আমাদের আরেকটি ট্রলারে তুলে দেন। পরে পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেলে ট্রালারে পানি ঢুকতে শুরু করে। এ সময় লোকজন হুইচই শুরু করে।’ তিনি বলেন, ‘দালাল সাইফুলের মাধ্যমে ক্যাম্প থেকে বের হই। কিন্তু প্রধান দালাল সৈয়দ আলম। তিনি মালয়েশিয়া থাকেন। এখানে আসার আগে ৩০ হাজার টাকা দিয়েছি। বাকি টাকা মালয়েশিয়া পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল।’

জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারির মধ্যে দেড় হাজারের বেশি আশ্রয়প্রার্থী বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর পাড়ি দিয়েছে; যা ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া মানুষের তুলনায় ৫০ গুণ বেশি। ২০১৫ সালে সমুদ্রযাত্রীদের বেশিরভাগই ছিল পুরুষ, কিন্তু ২০১৮ সালের সমুদ্রযাত্রীদের শতকরা ৫৯ ভাগই নারী ও শিশু।

জানা গেছে, ট্রলারে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাঠানো জন্য মানবপাচারকারীরা কক্সবাজারের উপকূলের বেশ কয়েকটি পয়েন্ট ব্যবহার করছে। এগুলো হলো—টেকনাফের শামলাপুর, শীলখালি, রাজারছড়া, নোয়াখালী পাড়া, জাহাজপুরা, শাহপরীর দ্বীপ, কাটাবনিয়া, মিঠাপানির ছড়া, জালিয়াপালং, ইনানী, হিমছড়ি, রেজুখাল, কুতুবদিয়াপাড়া, খুরুশকুল, চৌফলদণ্ডি ও মহেষখালী। এছাড়া সীতাকুণ্ড ও মাঝিরঘাট এলাকা হয়েও ট্রলারে মানবপাচার হয়ে থাকে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে স্থানীয়সহ বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা। তারা সবাই টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পের বাসিন্দা। এছাড়া মালয়েশিয়া অবস্থানকারী মানবপাচারকারী কয়েকজন রোহিঙ্গার নামও উঠে এসেছে।

টেকনাফের লেদা ডেভেলপমেন্ট ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘উন্নত জীবনের আশায় মালয়েশিয়া যাওয়ার বা ক্যাম্প থেকে পালানোর প্রবণতা রোহিঙ্গাদের মধ্যে বরাবরই ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর হওয়ায় বেশ কিছুদিন মানবপাচার বন্ধ ছিল। কিন্তু যাদের আত্মীয়-স্বজন বিভিন্নভাবে মালয়েশিয়ায় গিয়েছে, তাদের সে দেশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। তবে আমাদের ক্যাম্প থেকে মালয়েশিয়া পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা খুবই কম। ’

জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা অতিরিক্তি পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘হঠাৎ করে রোহিঙ্গা পাচার শুরু হওয়ায় আমরাও একটু চিন্তিত। এই ট্রলার ডুবির ঘটনার সঙ্গে পুরনো-নতুন দালালরা জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সাগরে নোঙরে থাকা একটি বড় জাহাজে তাদের তোলার কথা ছিল বলে শুনেছি।

উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গারা মানবপাচার চক্রের প্রলোভনের শিকার হয়ে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন জানিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘মানবপাচারকারীদের ধরতে মাঠে নেমেছে পুলিশ। দালালরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে টার্গেট করেছে। ফলে বিশেষ করে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মৃতদেহগুলো রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে কবরস্থানে দাফন করা হবে। উদ্ধার ভিকটিমদের নিজ নিজ ক্যাম্পে পাঠানো হবে।’

আরও পড়ুন...

কোরালের সঙ্গে বাড়ি খেয়েই ট্রলারডুবি, চার দালাল আটক (ভিডিও)

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা রোহিঙ্গারা (ফটোস্টোরি)

যেভাবে ডুবেছিল মালয়েশিয়াগামী ট্রলারটি

৯৯৯-এ ফোন দিয়ে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন আব্দুল

মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবি, ১৫ লাশ উদ্ধার

 

/আইএ/

লাইভ

টপ