কেন বাদ পড়লেন নাছির

Send
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত : ১৪:৫৮, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:০৪, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২০

আ জ ম নাছির উদ্দিন (ফাইল ছবি)সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ আস্থা রাখলো দলের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা নগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক রেজাউল করিম চৌধুরীর ওপর। আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনিই হলেন নৌকার মাঝি। দলীয় মনোনয়নে এগিয়ে থাকা বর্তমান মেয়র নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনকে বাদ দিয়ে শনিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে তার নাম ঘোষণা করে দলের মনোনয়ন বোর্ড। ঠিক কী কারণে নাছিরকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি, তা নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত রেজাউল করিমকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ায় নেতাকর্মীরা বেশ উৎফুল্ল। তারা মনে করছেন, রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের ত্যাগের শেষ দিকে মূল্যায়ন পেয়েছেন রেজাউল করিম। অন্যদিকে, হেভিওয়েট হয়েও দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন নাছির উদ্দিনের অনুসারীরা।
নগর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মী জানিয়েছেন, একই ব্যক্তিকে দল ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখতে চায়নি আওয়ামী লীগ। এই কারণেই তাকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। সংগঠন শক্তিশালী করার জন্য নাছিরকে নগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদে রেখে রেজাউল করিমকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
আ জ ম নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল নগর আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে তার মানসিক দূরত্ব ও দ্বন্দ্বের। তার বিরুদ্ধে কেউ কেউ সিনিয়র নেতাদের মূল্যায়ন না করার অভিযোগও তুলেছেন।
জানা যায়, প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে আ জ ম নাছিরের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। এ কারণে মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। বিষয়টি নিয়ে নগর আওয়ামী লীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। অন্যদিকে, নগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের ঠিকমতো মূল্যায়ন না করায় এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়। দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে এই পক্ষ আ জ ম নাছির উদ্দিনের বিরোধিতা করেছে। এই বিরোধিতার কারণেই দলীয় মনোনয়নে পিছিয়ে পড়েন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগর আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নাছির উদ্দিনের কর্মকাণ্ডে অবগত ছিলেন। তিনি নিজের অনুসারীদের বাইরে গিয়ে সবার হতে পারেননি। তাকে মনোনয়ন দেওয়া হলে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের রাজনীতি একজনের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতো। তা যেন না হয়, সে কারণেই তাকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।’
কেউ কেউ বলছেন, নাছির উদ্দিন তার মেয়াদে নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছেন। তাকে মনোনয়ন দিলে সাধারণ ভোটাররা ভোট নাও দিতে পারেন। অন্যদিকে, দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকায় নেতাকর্মীরাও তার জন্য কাজ করতে চাইবেন না। তাই নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করতেই ক্লিন ইমেজের রেজাউল করিমকে বেছে নিয়েছে মনোনয়ন বোর্ড।
নগর ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও আগ্রাবাদ কমার্স কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি লুৎফুল এহসান শাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসন, গ্রিন ও ক্লিন সিটির প্রতিশ্রুতি নিয়ে নাছির উদ্দিন ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু এগুলোর একটিও তিনি ভালোভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তাকে নিয়ে আমাদের যে আশা ছিল, বিশেষ করে চট্টগ্রামবাসীর বাসযোগ্য নগরীর, সেই প্রত্যাশা তিনি পূরণ করতে পারেননি। জলাবদ্ধতা নিরসন করতে তো পারেননি, এর জন্য অনুশোচনাও করেননি। উল্টো বিভিন্ন সময় কিছু শব্দ ব্যবহার করে জলাবদ্ধতাকে এড়িয়ে গেছেন। তার ব্যর্থতার কারণেই জলাবদ্ধতা প্রকল্পটি পরে সিডিএ বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেয়।’
লুৎফুল এহসান শাহ আরও বলেন, ‘গ্রিন ও ক্লিন সিটির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তার সময়ে নগরীর রাস্তায় সবচেয়ে বেশি ধুলাবালি উড়েছে। সড়কের অবস্থাও ছিল নাজুক। নেত্রী হয়তো এসব কারণেই উনাকে দলীয় মনোনয়ন দেননি। কারণ, তাকে মনোনয়ন দিলে আমরা নির্বাচনে জয়লাভ নাও করতে পারি।’
দলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, মেয়রের পাশাপাশি নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকার পরও অন্তত অর্ধশতাধিক সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন নাছির উদ্দিন। চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির সভাপতি, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সহ-সভাপতিসহ অনেক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের দায়িত্বে মেয়র নাছির। এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরসহ ব্যক্তিগত কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সময় দিতে গিয়ে তিনি মূল দায়িত্বে অবহেলা করেছেন। এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানেন। এসব কারণেই তাকে এবার মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। আর ঠিক একই কারণেই মেয়র থাকাকালে প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হয়নি তাকে। চট্টগ্রামের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ সিটির মেয়রদের প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হলেও গত ৫ বছর ধরে মুকুটশূন্য ছিলেন আ জ ম নাছির। ঢাকার পরেই গুরুত্ব বিবেচনায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অবস্থান হলেও মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনকে ধারাবাহিকভাবে পদমর্যাদার বাইরে রেখে দেওয়া হয়। ঠিক একই কারণেই হয়তো তাকে এবার মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, নানা কারণে দলীয় মনোনয়ন দৌড়ে এবার সুবিধাজনক স্থানে ছিলেন রেজাউল করিম চৌধুরী। একদিকে মুক্তিযোদ্ধা, অন্যদিকে কোনও ধরনের দলীয় কোন্দল ছাড়া দীর্ঘদিন একনিষ্ঠভাবে রাজনীতি করার পাশাপাশি মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা তার পক্ষে কাজ করেছে। অন্য মনোনয়ন প্রত্যাশীর প্রায় সবারই সমালোচনা ছিল। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন রেজাউল করিম চৌধুরী। পরিচ্ছন্ন রাজনীতি চর্চার পাশাপাশি তার কোনও নিজস্ব অনুসারী না থাকাটাও পক্ষে কাজ করেছে। যে কারণে দলীয় প্রার্থী হিসেবে তাকে বেছে নিয়েছে দলীয় মনোনয়ন বোর্ড।
কে এই রেজাউল করিম চৌধুরী
মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম ১৯৫৩ সালে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ডের ঐতিহ্যবাহী জমিদার বংশ বহরদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম হারুন-অর-রশীদ চৌধুরী ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন রেজাউল করিম। ১৯৬৭ সালে কলেজে ছাত্রাবস্থায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সদস্য পদে ফরম পূরণের মাধ্যমে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৬৯-১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ১৯৭০-১৯৭১ সালে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে ছাত্রাবস্থায় তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৭৩-১৯৭৫ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রেজাউল করিম চৌধুরী। ১৯৮০ সালে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৭-২০০৬ সালে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক, ২০০৬-২০১৪ সালে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি নগর আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

/আইএ/এমএমজে/এমওএফ/

লাইভ

টপ