গারো পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ভাষা রক্ষার উদ্যোগ নেই

Send
শাহরিয়ার মিল্টন, শেরপুর
প্রকাশিত : ১০:১৭, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৪, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০

শেরপুর জেলায় ছয়টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের বসবাস। এই গারো পাহাড় রেঞ্জে বসবাসরত গারো, হাজং, হদি, বর্মণ, কোচ ও ডালু সম্প্রদায়ের প্রত্যেকের নিজস্ব ভাষা রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর কোনও লিখিত রূপ নেই, কালের বিবতর্নে হারিয়ে গেছে বর্ণমালা। শুধু মুখে মুখে প্রচলিত কথ্য ভাষাও আজ বিলুপ্তির পথে। সরেজমিনে ঝিনাইগাতী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত বেশ কয়েকজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় হারিয়ে যাচ্ছে তাদের মাতৃভাষা। ভাষা রক্ষায় তাদের শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিসহ ভাষা সংরক্ষণ, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন এবং নিজস্ব ভাষার শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন তারা।

জানা গেছে, একটা সময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের নিজস্ব ভাষা ছাড়া অন্য কোনও ভাষা জানতেন না বা ব্যবহার করতেন না। কিন্তু জীবন-জীবিকার তাগিদে অথবা লেখাপড়া করতে প্রত্যন্ত এলাকার গারো সম্প্রদায়ের লোকেরা এসেছেন আশপাশের বাঙালিপ্রধান এলাকায়। আর ধীরে ধীরে বাঙালিরাও গিয়ে বসতি স্থাপন করেছেন তাদের অঞ্চলে। এভাবে একসময় নিজ এলাকাতেই গারোরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছেন। এখন গারো, কোচ, বর্মণ ও হদি সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া বাংলা মাধ্যমেই করতে হয়। কর্মজীবনেও তাদের বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে হয়। এ কারণে তাদের মাতৃভাষার চর্চা কমে গেছে।

হাজী অছি আমিরুন্নেসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা রবেতা ম্রং জানান, গারো ভাষা বা মান্দি ভাষা একটি চীনা-তিব্বতি ভাষা। গোত্র ভেদে গারোদের মধ্যে আলাদা আলাদা উপভাষার প্রচলন রয়েছে। আচিক উপভাষাটি গারোদের মাতৃভাষা। নিজস্ব ভাষায় ‘আচিক’ শব্দের অর্থ পাহাড়। অন্যান্য উপভাষার মধ্যে আছে আবেং, আওয়ে, চিসাক, দাক্কা, গাঞ্চিং, কামরূপ, মাতচি। তার অভিযোগ, তাদের মাতৃভাষা রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে এই ভাষা।

কোচ নেতা যুগল কিশোর কোচ জানান, তাদের মাতৃভাষা হচ্ছে কোচ ভাষা। এটি তিব্বতী-বর্মী ভাষা। এদেশের কোচ জাতির মানুষরা এই ভাষাতেই কথা বলেন। কোচ জাতির নিজস্ব ভাষা থাকলেও নিজস্ব কোনও বর্ণমালা নেই। উদ্যোগের অভাবে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে।

ঝিনাইগাতী উপজেলা ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মি. নবেশ খকশি বলেন, ‘মাতৃভাষা ধরে রাখার জন্য আমরা নিজেরা বাড়িতে সব সময আচিক ভাষায় কথা বলি। তবু আমাদের ভাষা রক্ষা করা যাচ্ছে না। বাংলার সঙ্গে ক্রমেই মিশে যাচ্ছে। গারো শিশুদের জন্য মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। না হলে আগামী প্রজন্ম হয়তো এই ভাষা হারিয়ে ফেলবে।’

সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্পের ফেলো  সুমন্ত বর্মণ  বলেন, ‘শেরপুর জেলায় গারো, হাজং, হদি, বর্মণ ,কোচ ও ডালু সম্প্রদায় বসবাস করলেও ইতোমধ্যে বানাই ও মারগান সম্প্রদায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে এই নৃগোষ্ঠীদের ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ। কিন্তু এদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় তেমন কোনও উদ্যোগ নেই। এই বিলুপ্তপ্রায় ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় দ্রুত একটি কালচারাল একাডেমি স্থাপন করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাই।’

এ বিষয়ে ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুবেল মাহমুদ বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার্থে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ রয়েছে। তারা আবেদন জানালে, এই উপজেলায় কালচার একাডেমি স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’



 

/এএইচ/

লাইভ

টপ
X