শহীদ রফিকের স্মৃতিচিহ্ন নেই তার নামের জাদুঘরে

Send
মতিউর রহমান, মানিকগঞ্জ
প্রকাশিত : ১১:৫৭, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:১০, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০

রফিক স্মৃতি জাদুঘর৫২’র ভাষা আন্দোলনে প্রথম শহীদ সিঙ্গাইর উপজেলায় বলধরা ইউনিয়নের পারিল গ্রামের সন্তান রফিক উদ্দিন আহমেদ রফিক। এই বীরের স্মৃতি রক্ষায় সিঙ্গাইরে নির্মাণ করা হয়েছে গ্রন্থাগার ও জাদুঘর। তবে তার স্মৃতি বহন করে এমন কিছুই নেই এই জাদুঘরে। শুধু নামকরণের মধ্যেই ব্র্যাকেটবন্দি আছে রফিক স্মৃতি জাদুঘর। গ্রন্থাগারটিতে ৯ হাজারেরও বেশি বই থাকলেও ভাষাশহীদ রফিকের ওপর রচিত বই মাত্র দুটি।

গ্রন্থাগারের লাইব্রেরিয়ান ও শহীদ রফিকের ভাতিজা ফরহাদ হোসেন খান জানালেন, ‘রফিক স্মৃতি জাদুঘরে ভাষাশহীদ রফিবের স্মৃতি বহন করে এমন কিছুই নেই। নেই রফিকের নকশি কাঁথা, কলমসহ ব্যবহার্য কোনও জিনিস। পরিপাটি গ্রন্থাগারে ৯ হাজারেরও বেশি বই থাকলেও ভাষাশহীদ রফিকের ওপর রচিত বই মাত্র দুটি। মুক্তিযুদ্ধের ওপর বিস্তর বই । এছাড়া গ্রন্থাগার ও জাদুঘরটি নিভৃত পল্লি এলাকায় হওয়ায় এখানে ফেব্রুয়ারি মাস আর বিশেষ দিবস ছাড়া দর্শনার্থীদের আগমনও থাকে কম। এখানে আসা যাওয়ার রাস্তাটির অবস্থাও বেহাল।  আমার মনে হয় এই গ্রন্থাগারে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ওপর বইয়ের সংখ্যা বাড়াতে হবে।’

স্মৃতি রক্ষার চেষ্টা

ভাষাশহীদ রফিকের স্মৃতি রক্ষার্থে ২০০৮ সালে ৩৪ শতাংশ জমিতে জেলা পরিষদের উদ্যোগে নির্মাণ করা হয়  একটি গ্রন্থাগার ও জাদুঘর।  তবে এর আগেই ২০০০ সালে রফিকের স্মৃতি রক্ষার্থে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ড. কাজী ফারুক সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে একটি ঘর তৈরি করে দিয়েছিলেন। সেখানেই  বসবাস করেন শহীদ রফিকের পরিবার। রফিকের নামে গড়া স্মৃতি জাদুঘরে রফিকের শৈশবের কোনও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা হয়নি। কিছু স্মৃতিচিহ্ন রাখা আছে তাদের পরিবারের কাছে। ২০১৬ সালে শহীদ রফিকের বাড়ির আঙিনায় নির্মিত হয়েছে শহীদ মিনার।রফিক স্মৃতি গ্রন্থাগার

৩৭ শতাংশ জমির ওপর ভাষাশহীদ রফিকের পৈতৃকভিটা। এই জমিটি সব ভাইয়ের সন্তানদের মাঝে বন্টন করা হয়েছে। রফিকের নামে তিন শতাংশ জমি রাখা হয়েছে। পৈতৃকভিটার তাদের বড় ভাই আব্দুল খালেকের স্ত্রী গোলেনূর বেগম, ভাতিজা শাহজালাল ও তার স্ত্রী বাড়িটির হাল ধরে রেখেছেন। রফিকের একমাত্র জীবিত ভাই খোরশেদ আলম মানিকগঞ্জ সদরে সরকারি বরাদ্দকৃত বাড়িতে থাকেন। 

শহীদ রফিক পরিবারের বর্তমান অবস্থা

বাড়ির ঐতিহ্য রক্ষা করতে শহীদ রফিকের ছোট ভাই মরহুম আব্দুল খালেকের স্ত্রী গোলেনূর বেগম (৭৩) বাস করছেন পারিল গ্রামে। একমাত্র জীবিত আছেন রফিকের ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদ আলম। ৫২ সালে তার বয়স ছিল আড়াই বছর। তিনি জানান, বড় ভাই রফিকের কোনও স্মৃতিই তার মনে নেই। তবে মায়ের মুখে রফিকের অনেক গল্পই তিনি শুনেছেন। সেই গল্পই তার অন্তরে লালন করে আছেন।

শহীদ রফিকের ভাতিজা আব্দুর রউফ বলেন, ‘শুধু একুশে ফেব্রুয়ারিতেই আমাদের খোঁজ পড়ে। সাংবাদিক ও বিভিন্ন মিডিয়ার ভিড় জমে যায় বাড়িতে। এছাড়া অন্য কোনও অনুষ্ঠানে আমাদের কোনও ডাক পড়ে না।’শহীদ রফিক

পরিচয়

‘সৈকত আসগরের ভাষা আন্দোলন ও শহীদ রফিক’ এবং ‘বাংলা একাডেমীর চরিতাভিধান’ থেকে জানা যায়, পারিল গ্রামে ১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন রফিক উদ্দিন আহমদ। বাল্যকাল থেকেই রফিক ছিলেন চঞ্চল প্রাণোচ্ছল। প্রাণোচ্ছলতার শিল্পীত প্রকাশও ঘটেছিল কৈশোর বয়সেই। সুঁই-সুতায় নকশা আঁকায় তার হাত পাকা ছিল বেশ। রফিকের দুরন্তপনার মুখ্য বিষয়ে ছিল গাছে চড়া। আর গাছে চড়তে গিয়েই একবার তার পা ভাঙে। চিকিৎসার জন্য সে সময় তাকে কলকাতা পর্যন্তও পাঠানো হয়েছিল। চঞ্চল রফিকের ভবিষ্যত ভেবে তার বাবা তাকে কলকাতার মিত্র ইন্সটিটিউটে ভর্তি করিয়ে দেন। কিন্তু সেখানে তার মন টেকেনি। কয়েক বছর পর ফিরে আসেন দেশে। ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় স্থানীয় বায়রা হাই স্কুলে। এ স্কুল থেকেই ম্যাট্রিক পাশ করেন তিনি। এরপর কলেজ জীবন। ভর্তি হন দেবেন্দ্র কলেজের বাণিজ্য বিভাগে এবং দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। তারপর লেখাপড়া বন্ধ। তবে লেখাপড়া ছেড়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আবারও ভর্তি হন ঢাকার জগন্নাথ কলেজে। জগন্নাথ কলেজেল ছাত্র থাকাকালেই ভাষার জন্য শাহাদাৎ বরণ করেন তিনি।রফিক স্মৃতি জাদুঘর

ইতিহাসের পাতায় দেখা একুশে ফেব্রুয়ারি

একুশে ফেব্রুয়ারি রফিক তার মামাতো ভাই মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে লক্ষ্মীবাজারের দিকে যাওয়ার পথে মেডিক্যাল কলেজের গেটের কাছে এলে পুলিশ তাদের উত্তর দিকে যেতে বাধা দেয়। তখন তারা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণের মধ্য দিয়ে লক্ষ্মীবাজারের দিকে রওনা দেন এবং মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের উত্তর-পশ্চিম দিকের গেটের কাছে পৌঁছান। সেখানেও একদল বন্দুকধারী পুলিশকে দেখতে পান তারা। তখন মোশাররফ হোসেন হোস্টেলের ১৩ ও ১৯ নম্বর শেডের পেছনে দাঁড়িয়ে একজনের সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। রফিক তখন দাঁড়িয়েছিলেন ২২ নম্বর শেডের কাছে। কিছুক্ষণ পরই একদল পুলিশ হোস্টেলে ঢুকেই গুলি শুরু করে। এদের গুলিতে হোস্টেলের বারান্দাতেই নিহত হন রফিক।  এ তথ্যগুলো গবেষক বশীর আল হেলাল তাঁর ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। যা শহীদ রফিক হত্যা মামলা থেকে নেওয়া।

ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ

শতভাগ নিশ্চিত হওয়া না গেলেও বিভিন্ন সূত্রে এটা প্রতিষ্ঠিত যে রফিকই ছিলেন ৫২’র ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ। পুলিশের গুলিতে তার মাথার খুলি উড়ে গিয়েছিল । ১৯৫২’র ২২ ফেব্রুয়ারি সংখ্যার দৈনিক আজাদ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, ‘গতকল্য (বৃহস্পতিবার) বিকাল প্রায় ৪টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলি চালনার ফলে বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের পুত্র রফিকুদ্দিন আহমদের মৃত্যু হয়’। সাপ্তাহিক নতুন দিন পত্রিকা তাদের ২য় বর্ষ ১৬-১৭শ সংখ্যায় দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সৌজন্যে শহীদ রফিকের মাথার খুলি উড়ে যাওয়ার ছবি ছাপে। বিশিষ্ট গবেষক ও সাহিত্যিক বশীর আল হেলাল তার ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ প্রন্থে  তথ্য-উপাত্ত-যুক্তি দিয়ে রফিককেই প্রথম ভাষাশহীদ হিসাবে প্রমাণ করতে চেয়েছেন।

‘ভাষা আন্দোলন ও শহীদ মিনার’ গ্রন্থে ড. রফিকুল ইসলাম ভাষা আন্দোলনকালে ঢাকায় অবস্থানরত শহীদ রফিকের ভগ্নিপতি মোবারক আলী খানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রমাণের চেষ্টা করেন রফিকই ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শহীদ রফিকের মৃতদেহ শনাক্ত করেন তার ভগ্নিপতি মোবারক আলী খান। তাকে কবর দেওয়া হয় আজিমপুর কবরস্থানে রাত ৩টায়। পাকিস্তানি পুলিশ নিজেরাই লাশ দাফন করেছিল। আজিমপুর কবরস্থানের অসংরক্ষিত এলাকায় লাশ দাফনের কারণে আজো অজ্ঞাত রয়ে গেছে তার কবর।

১৯৫২ সালের ২৮ মার্চ রফিকের মামাতো ভাই মোশাররফ হোসেন খান ঢাকার সদর মহকুমা হাকিম এন আহমদের এজলাসে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু বিচারক ফৌজদারী দণ্ডবিধির ১৩৭ এবং ১৩২ ধারার কথা বলে মামলা গ্রহনে অপারগতা প্রকাশ করেন ।

এর আগে ১৯৫১ সালের নভেম্বরে নিজ গ্রামের নাসির উদ্দিনের মেয়ে পানু বিবির সঙ্গে রফিকের বিয়ের কথা পাকা হয়। বাবা মায়ের অনুরোধে বিয়েতে রাজি হন তিনি। ৫২’র ফেব্রুয়ারিতে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করবার জন্য রফিকের বাবা কর্মস্থল ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি যান। কিন্তু বিয়ের তারিখ ঠিক হওয়ার আগেই শহিদ হন রফিক।

স্মৃতিগ্রন্থাগারে নেই ভাষা আন্দোলনের পর্যাপ্ত বই

এই ভাষাশহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এলাকাবাসী তার সম্মানে পারিল গ্রামের নামকরণ করেন রফিকনগর। আর সেখানেই নির্মাণ করা হয় ভাষাশহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ স্মৃতি পাঠাগার ও জাদুঘর। ২০০৮ সালে গড়ে তোলা জাদুঘরে রফিকের স্মৃতিবিজড়িত তেমন কিছু না থাকায় নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে পারেনি।

স্থানীয় কলেজ পড়ুয়া ছাত্র আফজাল হোসেন জানান, প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকার অনেক মানুষ আসে এই জাদুঘর দেখতে। তবে এ জাদুঘরে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসসমৃদ্ধ বইয়ের সংখ্যা খুবই কম যা সত্যিই দুঃখজনক।

মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট গোলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘সরকার শহীদ রফিকের নামে তার নিজ গ্রামে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছে। জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তার বসতবাড়িতে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে।  আগের নির্মিত রফিকের মুরালের ছবির সঙ্গে সাদৃশ্য না থাকার তার মুখের অবয়ব রেখে নতুন আরেকটি মুরাল নির্মাণ করা হয়েছে।’রফিক স্মৃতি জাদুঘর

একুশে উদযাপন

এবারে শহীদ রফিকের গ্রামের বাড়িতে অমর একুশে পরিষদ পাঁচ দিন ব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানমালার মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকারি-বেসরকারি ৫১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, হাতের লেখা প্রতিযোগিতা, সংগীত, নৃত্য, শুদ্ধ উচ্চারণে বই পড়ার আয়োজন।

অমর একুশে পরিষদের সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার তোবারক হোসেন লুডু জানান, এছাড়া ২১ ফেব্রুয়ারির দিন রয়েছে প্রভাত ফেরি ও শহীদ রফিকের বাড়ির আঙিনায় স্থাপিত মহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন, শহীদ রফিক মঞ্চে মুক্তিযোদ্ধা নতুন প্রজন্ম জনতার সমাবেশ। এছাড়া দিনব্যাপী স্থানীয় ব্যারিস্টার আসফাক মেমোরিয়াল হাসপাতাল ও ডায়াবেটিক সমিতির উদ্যোগে রক্তদান কর্মসূচি ও  বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা কর্মসূচি।

 

/এফএস/

লাইভ

টপ