ভাষা রক্ষায় সেদিন মাঠে নেমেছিল পাঁচশ’ স্কুল শিক্ষার্থী

Send
কামাল মৃধা, নাটোর
প্রকাশিত : ১৩:৩১, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪৪, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০

স্মৃতিচারণ করেছেন ভাষা সংগ্রামী ফজলুল হক

মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার রক্ষায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যে আন্দোলন শুরু করেছিল, পরের দিন তার ঢেউ আছড়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে। ২২ ফেব্রুয়ারি নাটোরের রাস্তাও বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। কিন্তু ব্যতিক্রম হলো, এই আন্দোলন ছিল ক্ষুদ্রে শিক্ষার্থীদের। স্কুলগামী বালক ও বালিকা বিদ্যালয়ের প্রায় পাঁচশ’ শিক্ষার্থী সেদিন রাজপথে নেমেছিল।

জানা যায়, ১৯৫২ সালে নাটোরে কোনও কলেজ বা উচ্চ-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। কিন্তু তিনটি বিদ্যালয়ের প্রায় পাঁচশ’ শিক্ষার্থী মিছিলে মিছিলে উত্তপ্ত করে তোলে শহরের রাজপথ। পরে পুলিশের হাতে গ্রেফতারের ভয়ে সপ্তাহব্যাপী তাদের অনেককেই শহর ছেড়ে লুকিয়ে থাকতে হয় পাড়াগাঁয়ে। ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়া ওই শিক্ষার্থীদের অনেকেই আজ নেই। তবে এখনও শৈশবের জ্বলন্ত স্মৃতি বুকে বয়ে বেড়াচ্ছেন ভাষা সংগ্রামী ফজলুল হক (৮২)। তার কাছেই জানা যায় এসব তথ্য।

শহরের কান্দিভিটুয়া মহল্লায় বাড়ি ফজলুল হকের। এখন পেশায় তিনি একজন ওষুধ ব্যবসায়ী। লেখাপড়া শেষে তিনি জেলা বোর্ডের সেকশন অফিসার হিসেবে দীর্ঘদিন চাকরি শেষে অবসর নিয়েছেন। ৮০-এর দশকে নাটোরে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র ‘প্রকাশ’ এর পাবলিকেশন্স বোর্ডের সদস্য ছিলেন তিনি।

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করে ভাষা সংগ্রামী ফজলুল হক জানান, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় শাসকদের রক্ত চোখ উপেক্ষা করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ছাত্রদের তাজা রক্তে রক্তাক্ত হয় রাজপথ। বিভিন্নভাবে খবর ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। শিক্ষার্থীদের রক্তদানের কথা সকালে জানতে পারেন তারা। ওই আন্দোলনে নিজেদের যুক্ত করার জন্য মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন। এরপর ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়েন বিদ্যালয়ের উদ্দেশে।

জানা যায়, তৎকালীন জিন্নাহ মেমোরিয়াল বয়েজ হাইস্কুলের (বর্তমানে নাটোর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়) নবম শ্রেণির ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিলেন ফজলুল হক। ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে স্কুলে যেয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন অন্যান্য ক্লাস ক্যাপ্টেনদের জন্য। এক সময় সব ক্যাপ্টেন বিদ্যালয়ে পৌঁছালে ক্লাসের আগেই তারা বৈঠক করেন। সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে নাটোরেও আন্দোলন গড়ে তোলার। কিছুক্ষণ পরেই তারা দেখা করেন প্রধান শিক্ষক দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যর সঙ্গে। তাদের অনুরোধে প্রধান শিক্ষক অনুমতি দেন।

এসময় নিজ বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় দেড়শ’ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে মিছিলটি বিদ্যালয় চত্বর পার হয়ে শহরের আলাইপুর মহল্লায় প্রবেশ করে। এরপর মিছিলটি নিয়ে যাওয়া হয় নাটোর গার্লস হাইস্কুলে (বর্তমানে নাটোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়)।

ফজলুল হক জানান, গার্লস স্কুলের তৎকালীন ক্যাপ্টেন ছিলেন শামসুন নাহার। শামসুন নাহারের সঙ্গে তার আগে থেকেই জানা-শোনা ছিল। বিদ্যালয় চত্বরে গিয়ে শামসুন নাহারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছাত্রীদের ওই আন্দোলনে যোগ দিতে বলেন তিনি। রাজি হন শামসুন নাহার। তারপর তারা দেখা করেন প্রধান শিক্ষিকা সুকুমারী দেবীর সঙ্গে। আন্দোলনের ব্যাপারে সহমত পোষণ করলেও ছাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রধান শিক্ষিকা। এ ব্যাপারে নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে অবশেষে প্রধান শিক্ষিকার অনুমতির মাধ্যমে মিছিলে যোগ দেয় গার্লস স্কুলের ছাত্রীরা।  

এরপর দুই স্কুলের শিক্ষার্থীরা শহরের লাল বাজার এলাকা দিয়ে রওনা হয় শহরের বঙ্গোজ্জ্বল এলাকায় মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ স্কুলের দিকে (বর্তমান মহারাজা জেএন উচ্চ বিদ্যালয়)। স্কুলের প্রধান শিক্ষক গিরিজাশংকর চৌধুরীর অনুমতি পেয়ে তারাও যোগ দেয় শিক্ষার্থীদের যৌথ মিছিল হয়ে ওঠে সম্মিলিত। প্রায় পাঁচশ’ শিক্ষার্থীর কন্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই,মানতে হবে, মানতে হবে’।

মিছিলটি শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে। এরপর তারা শহরের কাপুড়িয়াপট্টি মহল্লার রাস্তা বেয়ে কাঁচারি রোড ধরে পৌঁছে যায় চৌধুরী বাড়ির কামান সংলগ্ন আম বাগানে।

ফজলুল হক জানান, সেই সময় সব আন্দোলন-সংগ্রামের সমাবেশ কেন্দ্রবিন্দু ছিল ওই আম বাগান। সেখানেই আয়োজন করা হয় প্রতিবাদ সমাবেশের। সমাবেশে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এসময় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পরবর্তীতে নাটোর পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট ও সাহিত্যিক ও জিয়াউল হক, দৌলতুজ্জামান, ফজলুল হক শাহ, মহারাজা স্কুলের ক্যাপ্টেন তরুণ রায় প্রমুখ।

ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জের তুলে ধরে ফজলুল হক আরও জানান, সমাবেশ শেষে তারা পৌঁছে দেন গার্লস স্কুলের ছাত্রীদের। এরপর ফেরেন বাড়িতে। বাড়ি ফিরেই তাদের বাবা-মার বকাবকি শুনতে হয়। বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে গ্রেফতার আতঙ্ক। লোকমুখে শোনা যেতে থাকে যে, যারা মিছিলে যোগ দিয়েছে তাদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশ নেমেছে। অবশেষে বাবা-মার আদেশ আর নিজ প্রাণ বাঁচাতে তারা এলাকা  ছুটে চলেন পাড়াগাঁয়ে। সপ্তাহ পার হলেও কেউ গ্রেফতার না হওয়ায় ধীরে ধীরে তারা বাড়ি ফেরেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আগুনঝরা ওই সব দিনের আন্দোলন পূর্ণতা পেয়েছে, বাংলা হয়েছে রাষ্ট্রভাষা, পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে শহীদ দিবসের স্বীকৃতি, এসবই অনন্য অর্জন।’ তবে অফিস-আদালতে বাংলার ব্যবহার আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

ভাষা আন্দোলনে অনন্য ভূমিকা রাখায় নাটোর সরকারি বালক বিদ্যালয়ে ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত শতবর্ষ উৎসবে সম্মাননা প্রদান করা হয় ভাষা সংগ্রামী ফজলুল হককে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পাওয়ায় আক্ষেপ ঝরেছে তার কণ্ঠে।



/এএইচ/

লাইভ

টপ
X