বিলুপ্তির পথে মৌলভীবাজারের ৩১টি সম্প্রদায়ের ভাষা

Send
সাইফুল ইসলাম, মৌলভীবাজার
প্রকাশিত : ১৬:৫০, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪৬, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০

মৌলভীবাজার জেলায় ৩১টি সম্প্রদায়ের ৭০ হাজারেরও বেশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে পাঁচ উপজেলায় পাহাড়ে বসবাসরত এসব নৃ-গোষ্ঠীর প্রত্যেকের ভাষার রয়েছে নিজস্ব বর্ণমালা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব বর্ণমালার ব্যবহার ও সংরক্ষণের কোনও উদ্যোগ না থাকায় এবং প্রাথমিক শিক্ষায় সেগুলোর পরিচয় বা চর্চা না করায় হারিয়ে যেতে বসেছে এই সম্প্রদায়ের ভাষা। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় আদিবাসীদের বর্ণমালার পাঠ পরিচিতি এবং প্রযুক্তিতে এসব বর্ণমালা সংযুক্ত করা গেলে এসব বর্ণ এবং লিপি বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, মৌলভীবাজার জেলায় সাতটি উপজেলার মধ্যে পাঁচ উপজেলা যেমন- শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ি ও বড়লেখা পাহাড়ে বসবাস করে এসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ। এরমধ্যে মণিপুরি, খাসি, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল, মুন্ডা, উল্লেখযোগ্য।
কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের কালেঞ্জী পুঞ্জি সেন্ট যোসেফ গির্জা ১৯৭৫ সালে স্থাপিত। সেখানে এনজিও সংস্থা ‘আলোঘর’ দিয়ে পরিচালিত কালেঞ্জী পুঞ্জি শিশু শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষক জেম খাসিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষাকেন্দ্রে আদিবাসী বর্ণমালা ভাষা শেখানো হয় না। দেশে কয়েকটি নৃ-জনগোষ্ঠীর আলাদা আলাদা ভাষার প্রচলন রয়েছে। আইন অনুসারে দেশের সব নাগরিক নিজ নিজ মাতৃভাষা ব্যবহারের অধিকার রাখলেও সময়ের প্রয়োজনে বাংলা ভাষার প্রচলন বৃদ্ধি এবং নৃ-গোষ্ঠীর বর্ণমালা সংরক্ষণের উদ্যোগ না থাকায় অনেক নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষা হুমকির মুখে পড়েছে।’
কালেঞ্জী পুঞ্জির নৃ-গোষ্ঠীর কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী লটমন, লামিন, জেনি ও ছাত্র সুব্রত তজু, তাপস খংলা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই বাংলা ভাষায় পড়াশোনা করছি, নিজস্ব ভাষা বলতে পারলেও তা পুরোপুরি লিখতে পারি না।
মাগুরছড়া পুঞ্জি প্রাথমিক ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত ৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। পুঞ্জির খাসি মন্ত্রী এই স্কুলটি পরিচালনা করেন এবং তিনিই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ে ১০/১২ জন শিক্ষার্থী ইংরেজি ও বাংলা বই পড়ছে। মাগুরছড়া পুঞ্জির প্রধান শিক্ষক ও বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরামের সহ-সভাপতি জিডিশন প্রধান সুছিয়াং বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শ্রীমঙ্গলে সরকারিভাবে শুধু ত্রিপুরাদের ভাষার বই পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে। অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণ ও বইপত্রের মাধ্যমে প্রকাশ না করায় তা শুধু পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘খাসিয়াদের মাতৃভাষার বই না থাকায় বাধ্য হয়ে মেঘালয় থেকে বই এনে খাসিয়া শিক্ষার্থীদের দিয়ে যাচ্ছি। যদি সরকার এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার বইগুলো প্রকাশ করতো, তাহলে সহজ হতো। মেঘালয় থেকে বই এনে বিতরণ করা খুবই কষ্টকর। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি উদ্যোগ নেওয়া দরকার। বিশেষ করে বই থাকলে শিক্ষক সংকটও রয়েছে।’
ওই বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষিক অন্তরা ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘আমি এই বিদ্যালয়ে নিয়মিতভাবে পাঠদান দিয়ে যাচ্ছি। এর আগের আরেকজন শিক্ষক চলে যাওয়ায় আমি বছর ২/১ ধরে কর্মরত আছি। বিদ্যালয়ে নৃ-গোষ্ঠীরা নিজের মাতৃভাষায় কথা বলতে পারলেও নিজের বর্ণমালায় লিখতে বা পড়তে পারে না।’
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলবাট, ডরমিন তাবিশ টম্পে, দিব্র পাটং,মিন খাসিয়া বলেন, আমরা তো কথা বলতে পারি, তবে লিখতে পারি না। কয়েক মাস ধরে আমাদের ভাষার বই পাঠদান শুরু হয়েছে।
মাগুরছড়া পুঞ্জিতে ৮০ পরিবারের বসবাস। এসব পরিবারে ছেলে-মেয়েরা ওই বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে।
জানা যায়, সিলেটে নৃ-জনগোষ্ঠী তালিকায় খাসিয়া, গারো, ত্রিপুরা, মুন্ডা, সাঁওতাল, বিষ্ণপ্রিয়া মনিপুরী, মৈতৈ মনিপুরীসহ ১৩টি সম্প্রদায় রয়েছে। এর বাইরে চা বাগানে তেলেগু, রবিদাস, কৈরী-সহ আরও বেশকিছু জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। তাদের অধিকাংশ পাহাড়, টিলার পাদদেশে, বন-জঙ্গলে কিংবা সমতল ভূমিতে বসবাস করছেন।
চা শিল্পের সঙ্গে জড়িত এসব আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠী জাতীয় অর্থনীতিতে যথেষ্ট অবদান রয়েছে। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমির অধিকারসহ মাতৃভাষা রক্ষায়ও পিছিয়েও আছে এই জাতি-গোষ্ঠী।
ডমিন খাসিয়া বলেন, আমরা ভাষা সম্পর্কে কিছু জানি না। বাপ-দাদার আমল থেকে এই ভাষার ব্যবহার হয়ে আসছে। এই ভাষা আমাদের সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
তিনি আরও বলেন, খাসি ভাষার কোনও বই নেই। নিজেদের ভাষার দৈন্যদশা তুলে ধরার পাশাপাশি এগুলো সংরক্ষণের প্রয়োজন। ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পুরো পৃথিবী স্বীকৃতি দিয়ে যে মর্যাদা দিয়েছে, তা রক্ষা করতে সব ভাষার বর্ণমালা বা লিপি সংরক্ষণ এবং বাঁচিয়ে রাখা গুরু দায়িত্ব।’
এদিকে জেলার কুলাউড়া ও বড়লেখা উপজেলার ১৮টি পুঞ্জিতে (গ্রাম) আদিবাসী শিশুদের পড়ানো হচ্ছে খাসিয়া ভাষার দুটি বেই। কারিতাসের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংস্থার ‘আলোঘর’ প্রকল্পের উদ্যোগে গত বছর থেকে কুলাউড়ার মুরইছড়া, এওলাছড়া, কুকিজুড়ী, ফানাই, ভালাইরমা, নিউরাঙ্গি, মেঘাটিলা, নুনছড়া, লুতিজুড়ী, পুরান চইলতা, আমুলি, নার্সারি ও মেরিনা এবং বড়লেখার ৭ নম্বর, ৫ নম্বর, মাধব, গান্ধাই ও বাতামোড়ল আদিবাসী পুঞ্জি শিশু শিক্ষাকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে।
এসব শিক্ষাকেন্দ্রে আদিবাসী খাসিয়া ও গারো সম্প্রদায়ের ৫০০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। আর সেখানে পড়ান খাসিয়া ও গারো সম্প্রদায়ের ৩০ জন তরুণ-তরুণী। মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের লক্ষ্যে প্রকল্পের উদ্যোগে শিশু ও প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য খাসিয়া এবং গারো ভাষায় দুটি বই প্রকাশিত হয়। খাসিয়া ভাষার বইটির নাম নাংপুলে ইয়াকা কিটিন লাজং ও গারো ভাষার বইটির নাম আংনি কুতাঙনি শিখনা। দুটি ভাষার বইয়ের বাংলা অর্থ হচ্ছে, ‘এসো নিজের ভাষায় বই পড়ি’।
প্রতিটি শিক্ষাকেন্দ্রে বিভিন্ন শ্রেণিতে প্রতিদিন আধা ঘণ্টা করে মাতৃভাষার বই পড়ানো হয়। এ ছাড়া বাংলা, ইংরেজি, গণিতসহ অন্যান্য বইও সেখানে পড়ানো হয়। গতবছর জানুয়ারি মাস থেকে মাতৃভাষার বই পড়ানো হচ্ছে।
লাউয়াছড়া পুঞ্জির বাসিন্দা সাজু মাছিয়াং, সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেরায় ৭৪টি পান পুঞ্জিতে সরকারি ও বেসরকারি মিলে ১১-১২টি স্কুল রয়েছে। নিজ ভাষা চর্চা রাখার জন্য কিছু পুঞ্জিতে নিজেদের অর্থায়নে পরিচালিত স্কুলগুলোয় খাসিয়া ভাষা ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। তবে ধর্মীয় মিশনারীতে নিজস্ব ভাষা চর্চা চলছে।
বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ সিলেট অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দেববর্মা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ত্রিপুরা ভাষার বই আমাদের শিক্ষার্থীরা পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই ভাষা পড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই। শিক্ষকের অভাবে আমাদের ভাষার বইগুলো পাঠদান হচ্ছে না।’
লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মন্ত্রী (গ্রাম প্রধান) ফিলা পতমী বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ না থাকায় আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের বাংলা ভাষায় পড়ানো হচ্ছে। ফলে ছোটবেলা থেকেই তারা বাংলা ভাষা রপ্ত করছে। এ কারণে অনেকেই নিজেদের ভাষায় কথা বলতে পারলেও লিখতে পারে না।’
কমলগঞ্জের মহারাজ গম্বীর সিংহ মোমোরিয়াল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ফালগুনী সিংহ বলেন, ‘স্কুল বা ভাষা শিক্ষার প্রতিষ্ঠান, মাতৃভাষা চর্চাকেন্দ্র এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় মণিপুরীসহ সব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা হারিয়ে যাওয়ার পথে।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে একটি বৃহৎ আকারে প্রতিষ্ঠান করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে তাদের ভাষার বই ও অন্য সবকিছু থাকবে। এ জন্য এরই মধ্যে একটি জায়গাও নির্ধারণ করা হয়েছে। নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব যে ভাষা, সেটি আমাদের ধরে রাখতে হবে।’

কমলগঞ্জের লেখক ও লোক গবেষক আহমদ সিরাজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘বড় ও ক্ষুদ্র ভাষাভাষির মানুষ আছে। অন্য কোনও উপজেলায় তা নেই। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতির পর থেকে এসব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষার প্রতিও তাদের নিজেদের দায়িত্ববোধ বেড়ে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা একাডেমিক ব্যবস্থা না থাকায় নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে এসব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি অদূর ভবিষ্যতে হারিয়ে যাবে।’

/এআর/

লাইভ

টপ