করোনায় থেমে নেই কৃষক

Send
বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
প্রকাশিত : ০৮:০০, এপ্রিল ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:০০, এপ্রিল ০২, ২০২০

করোনা পরিস্থিতিতেও মাঠে কাজ করছেন কৃষকরাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে থমকে গেছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স, গার্মেন্ট শিল্পে পড়েছে করোনার প্রভাব, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে রফতানি বাণিজ্য। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি হুমকির মুখে। তবে এই পরিস্থিতিতেও থেমে নেই কৃষক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষকরা অনিরাপদ পরিস্থিতিতেও মাঠে চাষাবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের জন্য নেই কোনও বিশেষ সরকারি প্রণোদনা।

ময়মনসিংহ সদরের চরকালিবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায় মাঠে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। বোরো চাষি আব্দুল মজিদ বলেন, ‘আর মাত্র এক মাসের মধ্যেই বোরো ধান ঘরে উঠবে। এই সময় করোনার ভয়ে ঘরে বসে থাকলে কী করে চলবে? ধান ঘরে উঠাতে না পারলে সারাবছর কীভাবে ছেলেমেয়েদের নিয়ে সংসার চলবে। এখনও আমাদের সাহায্যের জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি।’

একই এলাকার আরেক সবজি চাষি আজহার আলী বলেন, ‘সবজি ক্ষেতে এখনও বেগুন, কাঁচামরিচ, ডাঁটা, ঢেঁড়শ, লালশাক ও শসা রয়েছে। এসব সবজি প্রতিদিন তুলে আশপাশের বাজারে এবং ময়মনসিংহ শহরের মেছুয়া বাজারে বিক্রি করতাম। করোনার কারণে সেনাবাহিনী মাঠে নামায় আশপাশের বাজারগুলোতে সবজি বিক্রি করছি। আগের মতো দাম নেই। আতঙ্কের কারণে ময়মনসিংহ শহরে যাওয়ার সাহস পাচ্ছি না।’

কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ২ লাখ ৫৯ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। এছাড়া ময়মনসিংহের চরাঞ্চলে ব্যাপক হারে সবজি চাষ হয়েছে।

ময়মনসিংহ জেলা কৃষি খামারবাড়ির উপপরিচালক কৃষিবিদ আব্দুল মাজেদ বলেন, ‘করোনাভাইরাস মোকাবিলায় কৃষকদের সুরক্ষায় সরকারি কোনও ব্যবস্থা এখনও করা যায়নি। এছাড়া সরকারি কোনও নির্দেশনাও নেই। শুধু কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীরা কৃষকদের সচেতন করতে পরামর্শ দিচ্ছেন।’

খুলনায় তরমুজ চাষিরা শেষ মুহূর্তের নজরদারিতে ব্যস্ত। বোরো ধান নিয়েও কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। ডুমুরিয়া উপজেলার কৃষক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এখন শেষ সময়ে জমিতে না গেলে তরমুজ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে এ তরমুজ বাজারে তোলা সম্ভব হবে। বোরো ধানেরও শেষ মুহূর্তের পরিচর্যা দরকার। তা না হলে ব্লাস্ট রোগের হানায় ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’

খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ পঙ্কজ কান্তি মজুমদার বলেন, ‘খুলনার কৃষকরা সচেতন আছে। তারা নিয়ম মেনেই কাজ করছেন। কিছু কৃষক মাস্ক ব্যবহার করছেন। মাঠে তারা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করেছেন। আর সার ও কীটনাশকের দোকান খোলা রাখা হচ্ছে। সেখানে হাত ধোঁয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কৃষক প্রয়োজনীয় সার ও কীটনাশক সংগ্রহ করতে পারছেন।’

বাগেরহাটেও ব্যাপকভাবে চাষ হয়েছে বোরো ধান। তাই কৃষকদের বাধ্য হয়েই জমির ধান পরিচর্যা করতে যাওয়া লাগে। জেলার ফকিরহাট, সদর, চিতলমারী এলাকার কৃষকরা মাঠে ব্যস্ত। তবে বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক রঘুনাথ জানান, করোনার কোনও প্রভাব কৃষিখাতে পড়েনি। কৃষি বিভাগ সবকিছু মনিটর করছে। পূর্বে কৃষকদের অনেক প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। করোনার কারণে কিছু দেওয়া হয়নি। কাঁচাবাজার বন্ধ, তাই কৃষকদের উৎপাদিত ফসল স্থানীয় বাজারেই বিক্রি হচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গায় কৃষকরা চাষ অব্যাহত রেখেছে। এখন পর্যন্ত নেই কোনও বিশেষ প্রণোদনা। উৎপাদিত নিত্যপ্রয়োজনীয় কাঁচামাল বাজারজাত হচ্ছে। এ ব্যাপারে কোনও ধরনের নিষেধাজ্ঞা নেই।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বসন্তপুর ও সাব্দিপুর এলাকায় কৃষক ও কৃষি শ্রমিকরা গম ও পেঁয়াজ ক্ষেতে ব্যস্ত। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করলেও হাতে গ্লাভস কিংবা মুখে মাস্ক নেই তাদের।
গোদাগাড়ী উপজেলার কদম হাজি মোড় এলাকার আজিমসহ কয়েকজন কৃষক জানান, তাদের কৃষি অফিস থেকে কোনও দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে অন্যদের দেখাদেখি কেউ কেউ মাস্ক পরেছেন।

ভাটুপাড়া এলাকার শ্রমিক মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এখনও এই ভাইরাস আসেনি। তাই আমরা মাস্ক ব্যবহার করিনি।’

জানা গেছে, শুধু রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় নয়, জেলার অন্য উপজেলায় কৃষকদের কোনও বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়নি।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক শামসুল হক বলেন, ‘চাষাবাদ অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া কৃষকদের মাঠে যেতে মানা করছি। আর গেলেও মাস্ক পরতে বলা হচ্ছে। আর বাড়িতে ফিরে সাবান দিয়ে হাত পা মুখ পরিষ্কার করার জন্য মেসেজ দিচ্ছি। কোনও কৃষকের সার দিতে সমস্যা হলে প্রশাসনের মাধ্যমে কৃষকদের হেল্প করা হচ্ছে। সরকার থেকে এখনও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়নি। সামলে গম ও পেঁয়াজ ঘরে উঠবে। তবে গম পচনশীল নয়, পেঁয়াজ আরও পাঁচ মাস ঘরে রাখা যাবে।’

গোপালগঞ্জে বর্তমানে বোরো আবাদের মৌসুম চলছে। কৃষকেরা তাদের জমিতে আগের মতোই কাজ করে যাচ্ছে। শহরে যেভাবে জনসাধারণ করোনা সম্পর্কে সচেতন, গ্রামের লোকজন আসলে তেমন সচেতন নয়। বিশেষ করে যারা কৃষক তারা আগের মতোই মাঠে যাচ্ছেন, কাজ করছেন, আবার বাড়ি ফিরে দৈনন্দিন কাজ করছেন।

গোপালগঞ্জের মাঠে এখন মূলত ধানের আবাদের পাশাপাশি সদর উপজেলার তেলিভিটার তরমুজ বাজারে এসেছে। বেশির ভাগ গম মাঠ থেকে তোলা হয়ে গেছে। টমেটো প্রায় শেষের দিকে। অন্য সবজি মাঠে আছে। শাকসবজি জেলার বাইরে যেতে না পারায় কমদামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কাজী লুৎফুল বারী বলেন, ‘বোরো উৎপাদন স্বাভাবিক আছে। মাঠকর্মী ও কৃষিকর্মীরা ত্রাণ বিতরণে আছেন। ব্লাস্ট রোগের আশঙ্কা আছে। সরকারের কাছে আহ্বান কীটনাশকের দোকান যাতে খোলা রাখা হয়। বোরো চাষ হয়েছে এবার ৫৩ হাজার ৫৫০ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৩ হাজার ৫০০ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫০ হেক্টর বেশি হয়েছে। আর সূর্যমুখী চাষ হয়েছে জেলায় ৫৮ হেক্টর। দ্রুত ফসল তোলা শুরু হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শাকসবজি যেগুলো চাষ হয়, স্থানীয় বাজারে সেগুলো বিক্রি করা যাবে। সবজির অনেক চাহিদা আছে। বোরো ধান কাটা হবে আগামী মে মাসে। সরকারকে মাথায় রাখতে হবে, বেশি করে ধান ক্রয় করে মজুত রাখতে হবে। অন্যথায় করোনার কারণে দেশের পরিস্থিতি খারাপের দিকে চলে যেতে পারে।’

প্রসঙ্গত, ১ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৫৪ জন। এদের মধ্যে মারা গেছেন ৬ জন।

/এনএস/

লাইভ

টপ