ইথানল প্রয়োগে করোনাভাইরাস ধ্বংস হবে দাবি গবেষকের, উড়িয়ে দিলেন চিকিৎসকরা

Send
জাকিয়া আহমেদ ও আতাউর রহমান জুয়েল, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত : ১৫:২৮, এপ্রিল ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৯, এপ্রিল ০৯, ২০২০

ড. মো. আলিমুল ইসলামইথানল প্রয়োগে করোনাভাইরাস ধ্বংস হবে! বাংলা ট্রিবিউনের কাছে এমন দাবি করেছেন ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের গবেষক অধ্যাপক ড. মো. আলিমুল ইসলাম। যদিও ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় এখনও এর প্রমাণ মেলেনি। তবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মুরগির ওপর এক গবেষণায় ইথানলের এমন কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে বলে জানান আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই বিজ্ঞানী।  ড. আলিমুল বলেন, ‘যে কোনও ভাইরাসের দুটি আবরণ থাকে। ইথানল কিংবা সাবান প্রয়োগে ওই দুটি স্তর গলে যায়। এমতাবস্থায় ধ্বংস হতে বাধ্য ভাইরাসটি।’

সরকার চাইলে কোভিড-নাইনটিন ভাইরাসের ওপর এই গবেষণা করা যেতে পারে উল্লেখ করে তিনি আরও জানান, এজন্য প্রয়োজন বিসিএল-৩ টাইপের ল্যাব ও করোনার রোগী।

এদিকে তার এই গবেষণা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, যথাযথ পরীক্ষার আগে এ ধরনের দাবি করা কোনোভাবেই উচিত নয়।  

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ড. মো. আলিমুল ইসলাম জানান, ‘আরএনএ গোত্রের করোনা ভাইরাসের বেশ কয়েকটি জাত রয়েছে। কোভিড-নাইনটিন এর একটি। এর আগে মুরগি আক্রান্ত হয়েছিল এভিয়ান ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস ভাইরাস ও ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে। ইথানল প্রয়োগ করে এই ভাইরাসটি ধ্বংস করা গেছে। গত মার্চের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ল্যাবে এটি প্রমাণ করতেও সক্ষম হয়েছি। আরএনএ গোত্রের প্রতিটি ভাইরাসের চরিত্র প্রায় কাছাকাছি বলে ইথানলে কোভিড-নাইনটিন ধ্বংস হবে মনে করছি আমি।’ড. মো. আলিমুল ইসলাম

এই ক্ষেত্রে করোনা আক্রান্ত রোগী কী মাত্রায় এই ইথানল ব্যবহার করবেন সে বিষয়ে ড. আলিমুল জানান, ‘কুলকুচা কিংবা গারগলের জন্য ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ পিউর ইথানলের ৬০% স্টক সলিউশন তৈরি করতে ৬০ এমএল ইথানলের সঙ্গে ৪০ এমএল পানি মেশাতে হবে। ইথানলের স্টক সলিউশন থেকে ২৫ এমএলের সঙ্গে ২৫ এমএল ফোটানো পানি যোগ করে যে মিশ্রণ তৈরি হবে, সেটি দিনে তিনবার গারগল করলেই ধ্বংস করবে করোনা। সেই সঙ্গে মিশ্রণের ভাপ নিলে ফল মিলবে আরও  দ্রুত। গারগলের সময় প্রথমবার ৩০ সেকেন্ড করে ব্লিচিং যুক্ত পানির বালতি কিংবা কোনও পাত্রে ফেলে দিতে হবে। দ্বিতীয়বার গারগলের সময় ফের ৩০ সেকেন্ড করার পর এক মিনিট মুখের ভেতর রেখে দিয়ে ফেলে দিতে হবে। এভাবে প্রতিদিন তিনবার করলেই ফল মিলবে। আরও কার্যকর ও দ্রুত ফল পেতে গারগলের ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর সমপরিমাণ মিশ্রণের ভাপ নিতে হবে দিনে তিনবার। এভাবে তিন দিন করলেই পুরোপুরি সুস্থতা মিলবে।’

তিনি দাবি করেন, সাধারণ সর্দি জ্বর-কাশি ও গলা ব্যথার রোগীরাও এটি করে ফল পেতে পারেন। করোনায় আক্রান্ত রোগীরাও এটি করে কার্যকর ফল পেতে পারেন।

এই গবেষক বলেন, ‘ইথানল ব্যবহারে সরকারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অনুমতি নিতে হবে। কারণ ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরিতে গবেষণার কাজ ছাড়া এর ব্যবহারে অনুমতি নেই। সরকার চাইলেই এটি সম্ভব।’

ড. আলিমুলের মতে, ইথানল একাই আরএনএ ইনভেলপড ভাইরাসগুলোর লিপিড পদার্থ সহজেই ধ্বংস করতে যথেষ্ট। তবে উষ্ণ গরম ইথানল ভাইরাসের ইনভেলপড দ্রুত ধ্বংস করতে সহায়তা করবে। এছাড়া প্রদাহজনিত গলা ব্যথার ক্ষেত্রে উক্ত এলাকার কোষগুলো থেকে জলীয়বাষ্প সহজেই শোষণ করে নেবে। ফলে গলার প্রদাহ কমে আরামবোধ করবেন রোগী।

তিনি আরও জানান, মানুষের ওপর এই গবেষণায় প্রয়োজন বিসিএল-৩ টাইপের পিসিআর ল্যাব ও করোনা আক্রান্ত রোগী। সরকার চাইলে এই কাজটি করতে চান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. আলিমুল ইসলাম ও তার দলের অণুজীব বিজ্ঞানীরা। এই বিজ্ঞানী নিজে ও তার আট জন ছাত্র ইথানল ব্যবহার করে এরই মধ্যে জ্বর ও সর্দি কাশিসহ শ্বাসকষ্টের সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়েছেন বলেও দাবি করেছেন তিনি। তবে ইথানল ব্যবহারে এলার্জি রয়েছে এমন হৃদরোগী, অ্যাজমা ও ডায়াবেটিস রোগীদের এটি ব্যবহার করা যাবে না বলে উল্লেখ করেছেন ড. আলিমুল। 

ইথানল জীবাণু ধ্বংস করার কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে দাবি করে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. চিত্ত রঞ্জন দেবনাথ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বাকৃবির বিজ্ঞানী ইথানল নিয়ে গবেষণার ফলাফলের বিষয়টি সরকারকে কিংবা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানাতে পারেন।  

এ  বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন  অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘করোনার চিকিৎসায় ইথানল ব্যবহারের কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। সারা বিশ্বে করোনার প্রতিষেধক নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। তবে কোনোটাই এখন পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি। আমরা দেখেছি, ইরানে গুজবের কারণে অ্যালকোহল খেয়ে কত মানুষ মারা গেছে। আমাদের সবার মনে রাখা দরকার, করোনার প্রাদুর্ভাবের পর অনেক গুজব দেখা যাচ্ছে। এভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করা যাবে না। স্বাস্থ্যবিধি সঠিকভাবে মেনে চলতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, কোনও ধরনের বিভ্রান্তি যাতে না ছড়ায়।’

শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘৭০ পারসেন্ট অ্যালকোহল ব্যবহার করা হয় হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও অন্যান্য বস্তু জীবাণুমুক্ত করার ক্ষেত্রে। কিন্তু শরীরের ভেতরে এধরনের পদার্থ ব্যবহারের কোনও ইন্ডিকেশন নেই। আমি জানি না কীভাবে তিনি এই রেসিপি দিলেন। এটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। এটা শ্বাসকষ্টসহ মারাত্মক প্রদাহ তৈরি করতে পারে। আর সংবাদমাধ্যমকেও এধরনের তথ্য প্রচারের আগে বিশেষজ্ঞদের মত নিয়ে যাচাই করা উচিত।’

/এফএস/এমএমজে/

লাইভ

টপ