যে কারণে এখনও করোনামুক্ত রাজশাহী নগরী

Send
দুলাল আবদুল্লাহ, রাজশাহী
প্রকাশিত : ০৩:০২, মে ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩৫, মে ১১, ২০২০

রাজশাহী শহর (ছবি: ইন্টারনেট থেকে)





রাজশাহীতে ১২ এপ্রিল প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর রাজশাহী বিভাগের অন্য জেলাগুলোতেও করোনা শনাক্ত হয়। ১০ মে পর্যন্ত রাজশাহীতে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৭ জন। তবে রাজশাহী নগরীসহ চারঘাট ও গোদাগাড়ী উপজেলা এখন রয়েছে করোনামুক্ত। প্রায় ৮ লাখ মানুষ বসবাস করা এই নগরী এখনও করোনামুক্ত থাকার পেছনে শহরের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা আর জনসচেতনতাই প্রধান কারণ। এজন্য শুরু থেকেই রয়েছে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) নিরলস প্রচেষ্টা। তদারকি করছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশাও। 

দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য সব শহরের মতো নিরাপত্তা ইস্যুকে সবচেয়ে অগ্রাধিকার দেয় রাজশাহী জেলা প্রশাসন। এজন্য সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে নানা ভূমিকা নেওয়া হয়। বিশেষ করে ১৪ এপ্রিল এই মহানগরীকে লকডাউন ঘোষণার পর বাইরে থেকে কারও প্রবেশ এবং তার হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে জেলা প্রশাসনসহ পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। আর সিভিল সার্জনসহ স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক তাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।

রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ঈদে দোকান খোলার ব্যাপারে আমরা আপত্তি জানিয়েছি। কারণ, দোকান খুললে লোক সমাগম হবে। এতে করে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যাবে। প্রথম থেকেই আমরা অন্য জেলার সঙ্গে রাজশাহীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করেছি। সেই সাথে ১ এপ্রিল থেকে রাজশাহীতে ল্যাব চালু করেছি। দ্বিতীয় ল্যাব মঙ্গলবার (১২ মে) থেকে চালু করতে যাচ্ছি। যেটা অন্য জায়গায় নেই। এরপর প্রথম থেকেই পিপিই, কিট আনা, স্যানিটাইজার বিতরণ, ডাক্তার, নার্সসহ স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে করোনা প্রতিরোধে কাজ করছি। জনগনকে সচেতনতা করছি। এভাবেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি করোনামুক্ত রাখতে। 
রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মুহাম্মদ শরিফুল হক বলেন, বিদেশ ফেরত ও অন্য জেলা থেকে আগতদের হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করেছি। সেইসঙ্গে পজিটিভ রোগীদের আইসোলেশনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি তাদের বাড়িতে খাবার ও ওষুধ নিয়মিত দিয়ে আসা হচ্ছে। হাসপাতালগুলোকে করোনার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়াও বাজার মনিটরিং, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা, টিসিবি’র মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে, প্রত্যেকদিন ভ্রাম্যমাণ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, জেলা প্রশাসকের ত্রাণ তহবিল গঠন করা, হটলাইন ও ফেসবুকের মেসেঞ্জারের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। দিনমজুর, কর্মহীনদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ত্রাণ তহবিলের খাদ্য সামগ্রী সঠিকভাবে পৌঁছানো হয়েছে। কেউ অন্যায় করলে দ্রুত তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে।

তিনি জানান, গত ১৪ এপ্রিল থেকে লকডাউন শুরু হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ অন্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিনিয়ত মিটিং করে রাজশাহী সিটিসহ জেলাকে কীভাবে ভালো রাখা যায় সে চেষ্টা করে যাচ্ছে জেলা প্রশাসন।

এদিকে, রাসিক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের দাবি, করোনা মোকাবিলায় ও মহানগরীকে পরিচ্ছন্ন রাখতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরগণসহ, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। নগরবাসীর সচেতনতা, সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশার সহযোগিতা, করোনা চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকবৃন্দ, নার্স, স্থানীয় প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর নজরদারি ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় রাজশাহী মহানগরীকে এখন পর্যন্ত নিরাপদ রাখা সম্ভব হয়েছে।

রাজশাহী শহর পরিচ্ছন্ন রাখতে সব উদ্যোগে সামনে থাকেন মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন
রাসিক সূত্র জানিয়েছে, করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে মার্চের প্রথম থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে সিটি করপোরেশন। মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন নিজে মাঠে থেকে মানুষের বাড়ি বাড়ি খাদ্য পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশনের সার্বিক কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করছেন। মেয়রের উদ্যোগে ১৯ মার্চ রাজশাহী থেকে সারাদেশের বাস চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হয়। এছাড়া মার্চের প্রথম থেকেই করোনায় জনসচেতনতা সৃষ্টিতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সচেতনতা সৃষ্টিতে দেড় লাখ লিফলেট বিতরণ, মাইকিং, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার, ডিস লাইন ও ডিজিটাল ডিসপ্লেবোর্ডে তথ্যচিত্র ও বক্তব্য প্রচার করা হয়। এছাড়া রাসিকের স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এবং সকল মসজিদে ইমামদের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়। করোনা মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ও ৩০টি ওয়ার্ডে কমিটি গঠন করে করণীয় নির্ধারণ, বিদেশ ফেরত ও দেশের ঝুঁকিপূর্ণ জেলা থেকে আগত ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা হয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে নিয়মিত চলছে তদারকি। ২০ হাজার মাস্ক ও এক হাজার লিটার স্যানিটাইজার বিতরণ, নগরীর ২৭টি পয়েন্টে স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৩০০ জন স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ৫টি ওয়াটার ট্যাংকার দিয়ে মহানগরীর প্রধান প্রধান সড়ক ও হাট বাজারে এবং ৩০টি ওয়ার্ডের সর্বত্র হ্যান্ড স্প্রে দিয়ে জীবাণুনাশক ছিটানো কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম জোরদারের পাশপাাশি স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নকর্মীদের জন্য নিরাপদ পোশাক মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস ও স্যানিটাইজার প্রদান করা হয়।

কোভিড-১৯ বিষয়ে দুস্থদের পাশে দাঁড়ায় ব্রাক ব্যাংক ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন।
করোনা রোগীর চিকিৎসা সেবায়ও বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) ও হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটকে শুধুমাত্র করোনা রোগী চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়াও করোনা রোগী শনাক্তে স্থাপন করা হয়েছে ল্যাব। সিটি হাসপাতালকে করোনা কর্নার হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। চিকিৎসকদের সুরক্ষায় পিপিই বিতরণ করা হয়েছে। করোনো ভাইরাস আক্রান্ত রোগীকে বহনে প্রস্তুত রয়েছে আলাদা অ্যাম্বুলেন্স। করোনায় আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিকে দাফনে কবরস্থান নির্ধারণ ও সহায়ক টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

মানুষকে যাতে ঘর থেবে বের হতে না হয় সেজন্য রাজশাহী প্রশাসন চালু করে ভ্যানে করে ভ্রাম্যমাণ বাজার


রাসিকের তথ্যমতে, বিত্তবানদের সহযোগিতায় মেয়রের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২২৩ টন চাল, ৪১ টন ডাল ও ৫২ টন আলু প্রায় ৪৫ হাজার পরিবারের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। মহানগর আওয়ামী লীগের ৩৭টি সাংগঠনিক কমিটির নেতাদের মাধ্যমে ১১ হাজার ১০০ পরিবারের প্রত্যেকের জন্য ৭ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল ও ১ কেজি মিষ্টি কুমড়া বিতরণ কার্যক্রম চলছে। এছাড়া ৫১৩ টন সরকারি চাল রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে জনপ্রতি ১০ কেজি করে ৫১ হাজার ৫০০ পরিবারের মাঝে এই চাল বিতরণ করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হবে। এছাড়া রাসিক ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে ৫ হাজার ২৩ পরিবারকে ৫০০ করে মোট ৭৫ লাখ ৩৪ হাজার ৫০০ টাকা নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে ৩০টি ওয়ার্ডের ৬০০ জন মায়ের প্রত্যেককে ৫০০ টাকা করে নগদ অর্থ এবং ৪৮০ শিশুর প্রত্যেককে এক প্যাকেট করে গুঁড়ো দুধ প্রদান করা হয়েছে। এমনকি ৫ এপ্রিল থেকে নগরীর অভুক্ত কুকুরগুলোকে খাবার দিচ্ছে রাসিক। সরকারি সহযোগিতা ছাড়াও মেয়রের ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রদান করা হচ্ছে খাদ্য সহায়তা। খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রাখতে গঠন করা হয়েছে ত্রাণ তহবিল।

সামাজিক দূরত্ব মেনে রাজশাহীতে মাঠে বসেছে বাজার




রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার (সদর) গোলাম রুহুল কুদ্দুস বলেন, লকডাউন ঘোষণার আগেই মহানগরীতে মানুষের যাতায়াত সীমিত করে ফেলি। সেইসঙ্গে নগরীতে চেকপোস্টের সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। দোকানপাট খোলার ব্যাপারে একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করি। এছাড়া টিসিবি এবং ওএমএসএর চাল বিক্রি, ত্রাণ তহবিল বিতরণের সময় সামাজিক দূরত্ব মানার ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। বাড়ি থেকেই যাতে করে সবজিসহ অন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পান তার জন্য ভ্যানে করে সবজি বিক্রির পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অটোরিকশা গ্যারেজ মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে সীমিত আকারে গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য চলাচল করতে দেওয়া হয়। এছাড়া বাইরে থেকে কেউ এলে নগরবাসী তাদের ব্যাপারে তথ্য দিয়ে আমাদেরকে সহযোগিতা করায় আগতদের হোম কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এজন্য নগরবাসীকে ধন্যবাদ জানাই। তারা নিজেরাও সচেতন আবার অন্যদের ব্যাপারে আমাদেরকে সহযোগিতা করছে। আর নগরীর প্রবেশ পথগুলোতে ২৪ ঘণ্টা চেকপোস্ট বসানো থাকে। যাতে করে অন্য উপজেলা কিংবা জেলা থেকে কেউ প্রবেশ করতে না পারে। এসব কারণেই আমাদের শহর এখনও করোনামুক্ত রাখা সম্ভব হয়েছে।

 

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. নওশাদ আলী বলেন, আমাদের জেলায় যেসব ব্যক্তি করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে তারা নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, গাজীপুর থেকে এসেছেন। আমাদের স্থানীয় পর্যায়ে কোনও ব্যক্তি এখনও করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হননি। তাই, রাজশাহী মহানগরীসহ আরও কয়েকটি উপজেলা এখনও করোনামুক্ত থাকার মূল কারণ এটা আমাদের স্থানীয় পর্যায়ের ব্যক্তির দ্বারা সংক্রমিত হয়নি। পরবর্তীতে ভালো রাখার জন্য তাই লকডাউন ভালোভাবে মানতে হবে। আর বাইরে থেকে লোকদের আনাগোনা বন্ধ করতে হবে।

 

 

/টিএন/

লাইভ

টপ