চাটখিলে বিশেষ সহায়তার তালিকায় সরকারি চাকরিজীবী, ইউপি সদস্য, দলীয় নেতাদের নাম!

Send
নোয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ০২:৩১, মে ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:১৬, মে ৩০, ২০২০

নোয়াখালী

নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নে করোনা পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহায়তার জন্য যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে সে তালিকার এক পঞ্চমাংশ নিয়েই আপত্তি জানিয়েছে এলাকাবাসী। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ২৬০ জনের নামের তালিকা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের নোটিশ বোর্ডে টাঙিয়ে দেওয়ার পর তালিকা তৈরিতে মাত্রাতিরিক্ত স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রায় অর্ধশত ব্যক্তির নাম রয়েছে এ তালিকায় যারা সক্ষম, সচ্ছল এবং ধনী ব্যক্তি। বিশেষ করে তালিকায় সরকারি  প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যাংক কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা,তাদের স্ত্রী, মুক্তিযোদ্ধা, ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, অন্যান্য ভাতাভোগী ও প্রবাসীসহ উচ্চবিত্তদের নাম এসেছে। আর ১৩টি নাম আছে যেগুলোর জাতীয় পরিচয় পত্র দেওয়া হলেও মোবাইল নম্বরগুলো তাদের নয় বলে একটি সূত্রের দাবি। এ তালিকা প্রকাশের পর স্থানীয় এলাকাবাসী এর প্রতিবাদে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

প্রসঙ্গত: তালিকাভুক্তরা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহায়তা হিসেবে এককালীন ২ হাজার ৫০০ টাকা পাবেন।

স্থানীয় এলাকাবাসী এই তালিকা বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, তালিকায় ২৫৮ নম্বরে রয়েছে হোসেনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. বোরহানের নাম। এছাড়াও ২৩৫ নম্বরে রয়েছে আবু তোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক আনোয়ার হোসেনের নাম। এরা সক্ষম এবং বিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও সরকারের পূর্ণ বেতন বোনাসসহ সব সুবিধা ভোগ করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা এ তালিকায় ক্ষমতাসীন দলের কিছু সচ্ছল নেতা ও তাদের পরিবার সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে সুবিধা নেওয়ার পাঁয়তারা করছেন বলেও অভিযোগ তোলেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, এ তালিকার ২৪৯ নম্বরে আছে চাটখিল সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং পাঁচগাঁও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি কামাল হোসেনের নাম। তালিকাভুক্ত অন্য সচ্ছল আওয়ামী লীগ নেতা ও তাদের পরিবার সদস্যরা হচ্ছেন ২৪৭ নম্বরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক একেএম সালেহ উদ্দিন (রাহেল) এর স্ত্রী তানিয়া করিম, ২২৫ নম্বরে ১ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. শাহজাহান, ২২৩ নম্বরে আ. লীগ নেতা মো. শাহজাহানের ছেলে রেজাউল করিম, ২৩২  নম্বরে ১ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ আলম, ১৯১ নম্বরে ৮ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মো. আবু তাহেরের ছেলে মো. নোমান, ১৭৫ নম্বরে তার পুত্রবধূ শিল্পী বেগম, ২৫২ নম্বরে ৫ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, ২৪৮ নম্বরে ৭ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি শওকত আলী, ২৩৯ নম্বরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কুন্তল কুমার ঘোষ, ১৩১ নম্বরে ১ নং ওয়ার্ডের সদস্য এবং প্যানেল চেয়ারম্যান ও সাবেক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মোস্তফা কামালের ছেলে মেহেদি হাসান, ২২১ নম্বরে ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ফুয়াদ আল মতিনের নাম রয়েছে।

এছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব একাধিক সদস্য ও তাদের পরিবার সদস্যদের নামও আছে এই তালিকায়। এরমধ্যে তালিকার ২৫০ নম্বরে আছে ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নং ওয়ার্ডের সদস্য জুয়েল পাটোয়ারি, ২৩১ নম্বরে ১ নং ওয়ার্ডের সদস্য এবং প্যানেল চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি মোস্তফা কামালের ছেলে মেহেদি হাসান, ২৩৮ নম্বরে ২ নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. হানিফের ছেলে মো. নাছির, ২২৪ নম্বরে ১,২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নাসিমা বেগম এর স্বামী মো. খোরশেদ এর নাম।

তালিকাভুক্ত আরও অনেকে পারিবারিকভাবেই ধনী ও সচ্ছল। অনেকের রয়েছে পাকা বাড়িঘর। আবার অনেকের পরিবার সদস্যরা থাকেন বিদেশে। যেমন তালিকার ৩৮ নম্বরে থাকা ২ নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. হানিফের ছেলে মো. নাছিরের রয়েছে একতলা পাকা ভবন। তার ৫ ভাই সৌদি আরবে থাকেন। তালিকার ৭ নম্বরে নাম থাকা ইউনিয়ন যুবলীগ কর্মী আরিফ হোসেন সাইফুল পাকা ভবনের মালিক, ২২২ নম্বরে রয়েছে এই যুবলীগ নেতার ভাই মাইন উদ্দিনের নাম। তিনিও সচ্ছল এবং ধনী ব্যক্তি। ২৫১ নম্বরে আছে গত ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন চাওয়া মো. মেজবাহর নাম-যার ভাই জুয়েল আমেরিকা প্রবাসী। ১৯৯ নম্বরে আছে রোকসানা আক্তারের নাম, যার ৫ ছেলে প্রবাসী। এ তালিকার ২৩৪ নম্বরে রয়েছে তালিকাভুক্ত হওয়া ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ফুয়াদ আল মতিনের মা সাবেক মেম্বার পারভীন আক্তারের নাম। তিনি শুধু সচ্ছলই নন, ধনী ব্যক্তি। তার ছেলেরাও সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। তার এক ছেলে ফয়সল আল মতিন অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন, আরেক ছেলে ফরহাদ আল মতিন চাটখিল মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ। এই নারীর নাম কী করে এই তালিকায় দেওয়া হলো তা নিয়েও এলাকার অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।

এছাড়াও তালিকার ১২৪ নম্বরে রয়েছে ইরাক প্রবাসী স্বপন মজুমদার এর স্ত্রী শিপ্রা মজুমদারের নাম যার ৫ নং ওয়ার্ডে পাকা ভবন রয়েছে। একইভাবে ২৫৩ নম্বরে রয়েছে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য পাকা ভবনের মালিক সিরাজুল ইসলামের নাম। ১২৫ নম্বরে রয়েছে ৫ নং ওয়ার্ডের ইরাক প্রবাসী দিলীপ চন্দ্র তরফদারের স্ত্রী বিন্দু রানী তরফদারের নাম যার জেলা শহর মাইজদীতে দোতলা ভবন রয়েছে। ১৯৬ নম্বরে প্রবাসী আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী আল্পনার নাম রয়েছে, তিনিও দোতলা ভবনের মালিক। তালিকার ১১ নম্বরে উল্লিখিত আবদুর রহমান একটি দোতলা ভবনের মালিক ও ১১৪ নম্বরে নাম থাকা মাহফুজও পাকা ভবনের মালিক। এছাড়াও ১৩৩ নম্বরে দেওয়া হয়েছে এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জগন্নাথ চন্দ্র পালের নাম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানায়, তালিায় নাম থাকাদের কেউ দরিদ্র নন, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া আড়াই হাজার টাকার লোভ সামলাতে না পেরেই তাদের নাম তালিকায় তুলেছেন। আবার তালিকায় নাম থাকা অনেকেই জানেনও না তাদের নাম কী করে তালিকায় উঠলো।

এদিকে, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তার অফিস ও বাসায় কাজ করা দুই ব্যক্তির নামও তালিকাতে উঠিয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি সূত্র জানায়, তালিকার ২৫১ নম্বরে থাকা জাকির উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা অফিসে মাস্টার রোলে চাকরি করেন আর ২১৫ নম্বরে নাম থাকা নাজমুল হোসেন এই এলাকারই বাসিন্দা নন। তিনিও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার বাড়িতে কনস্ট্রাকশনের কাজ করার সুবাদে তালিকাভুক্ত হয়েছেন, তার বাসা ঢাকার শান্তিনগরে। একইভাবে ২৩৩ নম্বরে নাম থাকা সুজন চন্দ্রের বাড়ি দিনাজপুরে। তালিকায় তার নাম উঠেছে ১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহজাহান পুলিশের বাড়িতে কাজ করার সুবাধে,আর ২০৫ নম্বরে নাম থাকা নূর মোহাম্মদ এর বাড়ি কুমিল্লায়।

এছাড়াও তালিকার ১০৮,১৩৪ ও ৭৯ নম্বরে নাম থাকা ব্যক্তিদের নিয়েও বিতর্ক আছে। এরা প্রত্যেকেই সরকারি অন্য ভাতা পেয়ে আসছেন। এছাড়াও তালিকায় পাঁচগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদ হোসেন তরুণের রাইটারের স্ত্রীর নামও রয়েছে বলে একটি সূত্র দাবি করেছে। তবে তিনি এ ভাতার জন্য যোগ্য বলে আরেক সূত্র দাবি করেছে।

এলাকাবাসী ওই সূত্রগুলোর দাবি তালিকার ১৪২, ১৪৫, ১৫৩, ১৭৮, ১৮০, ১৮৬, ১৮৯, ১৯২, ২০০, ২০৩, ২১৩, ২১৮ ও ২৫৪ নম্বরে যাদের নাম রয়েছে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দেওয়া হলেও মোবাইল নম্বরটি অন্য কারও। অথচ মোবাইল নম্বরেই বিকাশের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ সহায়তা পাঠানো হচ্ছে।

তালিকায় নাম থাকা কেউ তাৎক্ষণিকভাবে এসব অভিযোগের ব্যাপারে মুখ খোলেননি। তবে তাদের নাম থাকা নিয়ে এলাকায় যে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে সে বিষয়ে অনেকে অবগত রয়েছেন বলে জানান।

দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই একজন নাম প্রকাশ করতে না চেয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দীর্ঘদিন থেকে দল করেন তারা। তাই সরকারি এসব সুবিধা তাদের প্রাপ্য।    

তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ দিদারুল আলম দাবি করেছেন অর্ধ শতাধিক নয়, মাত্র ১৫ নামের ব্যাপারে তার কাছে অভিযোগ এসেছে। বলেন, পাঁচগাঁও ইউনিয়নে ২৬০ জনের নামের তালিকা ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশ বোর্ডে তালিকা টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জনের নামের তালিকার ব্যাপারে আমার কাছে অভিযোগ এসেছে। তালিকা যাচাই-বাছাই করার জন্য ট্যাগ অফিসার উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ফারুক হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্রুততম সময়ের যাচাই-বাছাই করে জমা দিতে বলা হয়েছে।

 পাঁচগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদ হোসেন তরুণ বলেন, যে ভুলগুলো হয়েছে, তা সংশোধন করে দেওয়া হচ্ছে। 

/টিএন/

লাইভ

টপ