বগুড়া-১ উপনির্বাচনবিএনপির অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে জয় দেখলেও মাঠে আ.লীগ

Send
মো. নাজমুল হুদা নাসিম, বগুড়া
প্রকাশিত : ২২:০৪, জুলাই ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:২২, জুলাই ০৬, ২০২০

বগুড়ার সেনাতলায় বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে নির্বাচনি প্রচারণার বক্তব্য রাখছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাহাদারা মান্নান।

করোনাকালে কোনও নির্বাচনেই আর অংশ নেবে না বিএনপি। রবিবার (৫ জুলাই) দলটির স্থায়ী কমিটির নেওয়া এই সিদ্ধান্তের কারণে বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনের উপ-নির্বাচনেও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে কোনও প্রার্থীর আর অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিএনপির প্রার্থীও বলছেন, করোনা ও বন্যার মধ্যে কোনও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা তার নেই। প্রধান প্রতিপক্ষের এমন সিদ্ধান্তে ভীষণভাবে উৎফুল্ল এখন বগুড়া-১ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ শিবির। হাফ ছেড়ে বেঁচেছেন তারা। যদিও আওয়ামী লীগের প্রার্থী মুখে বলছেন, বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে চলে যাওয়ায় তার কোনও লাভ-ক্ষতি নেই। তিনি মাঠে তার প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন।

বগুড়ার বাস্তবতা হচ্ছে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের বাড়ি এই জেলায় হওয়ায় এখানকার সব কটি আসনেই বিএনপির প্রার্থী থাকা মানে যে কোনও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অবশ্যম্ভাবী। সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করোনাকালের এই উপনির্বাচনে যে আর হবে না সেটা এখন নিশ্চিত। তাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার রঙ হারানো এই নির্বাচনে আসনটি ধরে রাখার যুদ্ধে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে আর কে কে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন সেটাই এখন কেবল দেখার বিষয়।  

বগুড়া-১ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান গত ১৮ জানুয়ারি হৃদরোগে মারা যান। পরপর তিনবার নির্বাচিত জনপ্রিয় এই সংসদ সদস্যের মৃত্যুর কারণে নির্বাচন কমিশন আসনটি শূন্য ঘোষণা করে গত ২৯ মার্চ এই আসনে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছিল। কিন্তু, সারাবিশ্বের মতো করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশেও লকডাউন পরিস্থিতি শুরু হলে উপনির্বাচনের ১০ দিন আগে তা স্থগিত করা হয়। করোনার প্রকোপ বাড়তে থাকায় এরপর আরও তিন মাস আসনটিতে নির্বাচন না দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নির্বাচন কমিশন। তবে করোনার প্রকোপ যখন অনির্দিষ্টকালের দিকে এগিয়েই যাচ্ছে তখন বাধ্য হয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মানতেই নির্বাচন কমিশন বগুড়া-১ আসনটিতে আগামী ১৪ জুলাই উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নির্বাচনি প্রজ্ঞাপনে স্বাস্থবিধি মেনে নির্বাচন আয়োজন করার কথা বলা হয়েছে।

এদিকে, এ উপনির্বাচন থেকে বিএনপি সরে যাওয়ায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী টেনশনমুক্ত রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ তথ্য বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন। তাদের ধারণা এবার প্রয়াত আবদুল মান্নানের স্ত্রী সাহাদারা মান্নান সহজেই এ উপনির্বাচনে জয়ী হতে পারবেন।

তবে নৌকার প্রার্থী সাহাদারা মান্নান শিল্পী নির্বাচনে নেমে এই ইস্যুকে বড় করে দেখছেন না। তিনি ভোটারদের কাছে তার দলের ও তার স্বামীর উন্নয়ন প্রচারের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। সাহাদারা মান্নান বলেন, ‘বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে চলে যাওয়ায় আমার কোনও লাভক্ষতি নেই। আমার স্বামী প্রয়াত আবদুল মান্নান পর পর তিনবার এমপি থেকে এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। তাই দলমত নির্বিশেষে ভোটাররা আমাকে ভোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন।

এদিকে ১৪ জুলাই উপ-নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সাহাদারা মান্নান শিল্পী মাঠে নেমে পড়েছেন। তিনি নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সকাল থেকে রাত অবধি নির্বাচনি এলাকার দুটি উপজেলায় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে আলোচনা করছেন। সোমবার সোনাতলা উপজেলায় বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে নির্বাচনি সমাবেশ করেছেন। 

এদিকে নির্বাচনে অন্য প্রার্থীরা মাঠে নেই বললেই চলে। এ আসনে নৌকা প্রার্থীর সঙ্গে ধানের শীষের প্রার্থীর মূল লড়াই হওয়ার কথা ছিল। বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে  যাওয়ায় নৌকা প্রার্থী সাহাদারা মান্নানের সঙ্গে এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী অধ্যক্ষ মোকছেদুল আলম (লাঙ্গল) ও স্বতন্ত্র ইয়াসির রহমতুল্লাহ ইন্তাজের (ট্রাক)। তবে তাদের মাঠে এখনও দেখা যায়নি।

বগুড়া জেলা অতিরিক্ত নির্বাচন কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভোট গ্রহণের সকল প্রস্তুতি চলছে। এ আসনে মোট তিন লাখ ১৭ হাজার ৫৬৯ জন ভোটার। এর মধ্যে সারিয়াকান্দি উপজেলায় এক লাখ ৭১ হাজার ৫৫১ ভোট ও সোনাতলা উপজেলায় এক লাখ ৪৬ হাজার ১৮ ভোটার।

এদিকে, উপনির্বাচনে আগে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ায় বিএনপির প্রার্থী একেএম আহসানুল তৈয়ব জাকিরের নাম ও তার প্রতীক ধানের শীষ ব্যালটে থেকে যাচ্ছে। শেষ মুহূর্তে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে গেলেও ব্যালটে নাম প্রত্যাহারের আইনগত কোনও উপায় নাই।

নির্বাচন থেকে সরে আসা প্রসঙ্গে বগুড়া-১ (সোনাতলা-সারিয়াকান্দি) আসনে উপ-নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী একেএম আহসানুল তৈয়ব জাকির জানান, শত শত ভোটার করোনায় আক্রান্ত। ১৫/২০টা কেন্দ্র পানির নিচে, লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। এ অবস্থায় কোনোভাবেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার সংবিধানের দোহাই দিয়ে নির্বাচন করতে যাচ্ছে। কিন্তু সংসদে বিল উত্থাপন করে নির্বাচনের তারিখ পরেও ধার্য করা যেত।

তিনি বলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটি নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই তিনিও দলের নির্দেশ মেনে চলবেন। তবে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করলে আবারও অংশ নেবেন।

উপনির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা হলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রয়াত সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের স্ত্রী সাহাদারা মান্নান শিল্পী (নৌকা), বিএনপি প্রার্থী একেএম আহসানুল তৈয়ব জাকির (ধানের শীষ), জাতীয় পার্টির অধ্যক্ষ মোকছেদুল আলম (লাঙ্গল), প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলের মো: রনি (বাঘ), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নজরুল ইসলাম (বটগাছ) ও স্বতন্ত্র ইয়াসির রহমতুল্লাহ ইন্তাজ (ট্রাক)।

এ নির্বাচন সম্পর্কে স্থানীয় সারিয়াকান্দি উপজেলার নারচী গ্রামের রায়হান কবীর, হাটশেরপুরের রোস্তম আলী, দেবডাঙ্গার আবদুর রশিদ, সোনাতলার গনসারপাড়ার শাহাদত হোসেন লিটন, শেখাহাতীর নজরুল ইসলাম, হুয়াকুয়ার আতোয়ার রহমান গেদা, তেকানী এলাকার জাহিদুল ইসলাম, পাকুল্লার বিল্লাল মাষ্টারের সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের। তারা জানান, পরপর তিনবারের এমপি আবদুল মান্নান এলাকায় নদী ভাঙনসহ বিভিন্ন খাতে কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন করেছেন। দুটি উপজেলার এমন কোনও উন্নয়ন নেই যেটি আবদুল মান্নানের সময় হয়নি। পিছিয়ে পড়া এলাকাটিকে সামনে এগিয়ে নেওয়ায় তার অবদান এলাকার মানুষ কোনোদিন অস্বীকার করতে পারবে না।

বালুয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রভাষক রুহুল আমিন ও সারিয়াকান্দি উপজেলার নারচী ইউপি চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন বান্টু তরফদার দাবি করেন, তারা নির্বাচিত হওয়ার পর প্রয়াত এমপি আবদুল মান্নানের সহযোগিতায় গত ৫ বছরে এলাকায় যে উন্নয়ন হয়েছে তা স্বাধীনতা পরবর্তী অন্য কোনও সময়ে হয়নি। তাই উন্নয়ন উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রাখতে নিশ্চয় জনগণ নৌকা প্রার্থীকে বেছে নিবেন। ভোটাররা এলাকার উন্নয়ন বোঝেন তাই বিএনপি সরে যাওয়ায় নির্বাচনে তেমন প্রভাব পড়বে না।

নির্বাচন বিষয়ে সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা রাসেল মিয়া এবং সোনাতলা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন জানান, উপ-নির্বাচনে বন্যার কোনও প্রভাব পড়বে না। সোনাতলায় দুইটি কেন্দ্রে বন্যার পানি উঠলেও তা ইতোমধ্যেই নেমে যেতে শুরু করেছে।

অপরদিকে সারিয়াকান্দির কয়েকটি কেন্দ্রে পানি প্রবেশ করলেও পার্শ্ববর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প ভোট কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারে প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।

তবে বগুড়ায় করোনায় আক্রান্তের হার দিন দিন বাড়তে থাকায় উপনির্বাচনে সব ভোটারকে আনা প্রার্থীদের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বগুড়ায় করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা এরইমধ্যে তিন হাজার অতিক্রম করেছে। এরইমধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৬২ জন। করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যাও শতাধিক। আজ সোমবারও ( ৬ জুলাই) জেলায় করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ৬৮ জন । অবশ্য এরমধ্যে সোনাতলা ও সারিয়াকান্দির কেউ নেই।

/টিএন/

লাইভ

টপ