উৎপাদন ২৫ ভাগ, মজুরি শতভাগ

Send
হেদায়েৎ হোসেন, খুলনা
প্রকাশিত : ১২:০৬, জুলাই ০৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৬, জুলাই ০৭, ২০২০

পাটকলখুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকলে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ২৫ ভাগ উৎপাদন হতো। কিন্তু শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হতো শতভাগ। এছাড়া অপচয়, বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে পাট ক্রয়, উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে পাটজাত পণ্য বিক্রি, সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের অভাব, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, সময়মতো কাঁচাপাট কিনতে না পারা, অদক্ষ শ্রমিক ব্যবহার, শ্রমিক অসন্তোষ, ৭০ বছরের পুরনো মেশিন ব্যবহারের কারণে বছরের পর বছর লোকসান দিয়েছে এসব পাটকল। বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) ও কর্মরত পাটকল শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিজেএমসি’র তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ৯ পাটকলে দৈনিক পাটজাত পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭২.১৭ মেট্রিক টন। সেখানে সম্প্রতি উৎপাদন হতো মাত্র ৮০ মেট্রিক টন। কার্পেটিং জুট মিলের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৭.৬৮ মেট্রিক টন, ক্রিসেন্ট জুট মিলের ৭০.৫০ মেট্রিক টন, দৌলতপুর জুট মিলের ১০.১১ মেট্রিক টন, ইস্টার্ন জুট মিলের ১৬.৩৪ মেট্রিক টন, যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রিজের (জেজেআই) ২২.২০ মেট্রিক টন, খালিশপুর জুট মিলের ৪৭.৫০ মেট্রিক টন, প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলের ৫০.৫৪ মেট্রিক টন, স্টার জুট মিলের ৩৬.৮০ মেট্রিক টন এবং আলীম জুট মিলের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১০.৫০ মেট্রিক টন ছিল। কিন্তু কোনও পাটকলই তাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি।

২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত ৫ বছরে খুলনা অঞ্চলের ৯টি পাটকলে লোকসান এক হাজার ৪৭৫ কোটি ৫৭ লাখ ১৫ হাজার টাকা।

বিজেএমসি জানিয়েছে, শ্রমিক মজুরি, কাঁচাপাট, যন্ত্রাংশ মেরামত, বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খাত মিলিয়ে প্রতি মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য উৎপাদনে ব্যয় প্রায় এক লাখ টাকা। কিন্তু বাজারে তা বিক্রি হয় ৭০ হাজার টাকায়। ফলে প্রতি মেট্রিক টনে লোকসান ৩০ হাজার টাকা। ৯টি পাটকলে বছরে ৮১ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন পণ্য উৎপাদন হয়। সে হিসাবে তা বিক্রিতে লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ২৪৫ কোটি টাকা।

৯টি পাটকলে স্থায়ী শ্রমিক ছিল ৮ হাজার ১০০ জন। আরও ১৪ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক এখানে কাজ করেন। এদের মজুরি বাবদ প্রতিমাসে প্রয়োজন হতো প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। স্বাভাবিক উৎপাদন ধরে রাখতে প্রতি মাসে ১৭ কোটি টাকার কাঁচাপাট দরকার পড়তো। এছাড়া যন্ত্রাংশ মেরামত, বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় আরও হতো ১৭ কোটি টাকা।

বিজেএমসি সূত্রে জানা যায়, পাটকলগুলোয় এখনও ২০ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ক্রিসেন্ট জুট মিলে ৫৪১৫ মেট্রিক টন, দৌলতপুর জুট মিলে ৭০৩ মেট্রিক টন, খালিশপুর জুট মিলে ৫১৭৮ মেট্রিক টন, প্লাটিনাম জুট মিলে ২৯৯৫ মেট্রিক টন, স্টার জুট মিলে ৪০৬ মেট্রিক টন, আলিম জুট মিলে ৮৯৫ মেট্রিক টন, ইস্টার্ন জুট মিলে ১৭৩৪ মেট্রিক টন, যশোরের কার্পেটিং জুট মিলে ৪৬০ মেট্রিক টন, যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রিতে (জেজেআই) ২৮৩৪ মেট্রিক টন।

সূত্র জানায়, গত শতকের ’৫০-এর দশকে খুলনা মহানগরীর ভৈরব নদের তীরে প্রথম জুট মিল স্থাপিত হয়। তা লাভজনক হওয়ায় একের পর এক পাটকল গড়ে ওঠে। দেশ স্বাধীনের পর পাটকলগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়। এরপর কিছু মিল ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়া হয়। বিজেএমসি নিয়ন্ত্রিত কিছু জুট মিল বন্ধ হওয়ার পর তিনটি নন-জুট মিলসহ ২৬টি জুট মিল চালু থাকে। এই ২৬টি জুট মিলের মধ্যে ৯টিই খুলনা অঞ্চলের। সর্বশেষ গত ৪ জুলাই সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত সব জুট মিলই বন্ধ ঘোষণা করে।

প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলের শ্রমিক মিজানুর রহমান বলেন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনিয়ম-দুর্নীতি ও চাহিদামতো কাঁচাপাট সরবরাহ করতে না পারা মিলগুলোর লোকসানের অন্যতম কারণ।

পাটকল শ্রমিক নেতা মুরাদ হোসেন বলেন, বিজেএমসি পাট কেনার মৌসুম শেষে ১ হাজার ২০০ টাকা মণের কাঁচাপাট কিনে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা দরে। অসময়ে পাট কিনতে গিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোকসান হয়। দায়ভার পড়ে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর। শ্রমিকরা কাজ না করেই মজুরি নেওয়ার অভিযোগ তোলেন কেউ কেউ। কিন্তু মিল কর্তৃপক্ষ যে কাঁচাপাটের অভাবে শ্রমিকদের কাজ দিতে পারে না, সে বিষয়টি আড়ালেই থেকে যায়।

প্লাটিনাম জুট মিলের সিবিএ সভাপতি শাহানা শারমিন বলেন, ‘পাটকলগুলো আর্থিক সংকটে থাকায় শ্রমিকরা কাজ করেও নিয়মিত মজুরি পায়নি। এ কারণেই আন্দোলন করতে হয়েছে। শ্রমিকরা কেবল মজুরির দাবিতে আন্দোলন করেনি। পাটখাতে অর্থ বরাদ্দ, আধুনিকায়ন করাসহ পাটকল সুরক্ষারও দাবি করেছেন।’

বিজেএমসি খুলনা’র সমন্বয়কারী বনিজ উদ্দিন মিয়া বলেন, ‘উৎপাদন ব্যয়ের কারণে মিলগুলোকে কখনও লাভজনক করা সম্ভব হয়নি। বেসরকারি পাটকলে একজন শ্রমিকের প্রতি সপ্তাহের মজুরি ৩০০-৩৫০ টাকা। সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে ২৫০০-৩২০০ টাকা। মজুরির ব্যবধান প্রায় ৮ গুণ। পাটকল বন্ধ হলে মজুরি, এরিয়া বিলসহ সব মিলিয়ে তাদের পাওনা হবে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।’

তিনি বলেন, খুলনা অঞ্চলের মিলগুলোয় এখনও মজুত রয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার পাটজাত পণ্য। বন্ধ অবস্থায় নিয়ম অনুযায়ী এগুলো নিলাম হতে পারে।

/আরআইজে/এসটি/এমএমজে/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ