নতুন সংগঠনের কার্যক্রম চালুর কারণেই হত্যাকাণ্ড?

Send
মো. নজরুল ইসলাম (টিটু), বান্দরবান
প্রকাশিত : ১৪:১২, জুলাই ০৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১২, জুলাই ০৮, ২০২০

86193bfc48b0ae57631c4f34d81e9657-5f04391696720বান্দরবান সদর উপজেলার বাঘমারা, জামছড়ি, নাসালং পাড়া, আন্তা পাড়া, ক্যনাইজু পাড়া, মনজয় পাড়া, রাজবিলা এখনও সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। প্রায়ই এসব এলাকায় চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন, গুমসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটছে। একসময় রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার সীমান্তবর্তী এসব এলাকা পুরোপুরি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মূল সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বান্দরবানে জেএসএস (মূল)-এর সংগঠন থাকলেও এখানে জেএসএস (সংস্কার)-এর কোনও সংগঠন ছিল না। প্রায় বছর খানেক আগে জয় বাহাদুর ত্রিপুরা আহ্বায়ক হয়ে বান্দরবানে জেএসএস (সংস্কার)-এর কার্যক্রম চালু করেন। তাদের অভিযোগ, নতুন এ সংগঠনের কার্যক্রম চালু করার বিষয়টিকে মেনে নিতে পারেনি জেএসএস (মূল)। এ কারণেই মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ছয় জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, জেএসএস (সংস্কার) সাংগঠনিক কার্যক্রম চালু করায় অন্য আঞ্চলিক সংগঠনের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না। এর আগেও বেশ কয়েকবার তাদের মধ্যে সমস্যা হয়েছিল। প্রায় মাসখানেক আগেও বেশ কয়েকবার নতুন অফিসের সামনে ফাঁকা গুলি করা হয়েছিল। তখন কাউকে হত্যা করা হয়নি।

জেএসএস (সংস্কার)-এর আহ্বায়ক জয় বাহাদুর ত্রিপুরা জানান, তিনিও একসময় জেএসএস (মূল)-এর কমিটিতে ছিলেন। কিন্তু সংগঠনটির কিছু ভুল রয়েছে। তাদের সদস্যরা পাহাড়ে নানা ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছেন। মানুষের স্বাধীনতা নষ্ট করছেন। কাউকে স্বাধীন মতে চলতে দিচ্ছেন না। তাই বান্দরবানের মানুষের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে এবং এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনতেই জেএসএস (সংস্কার) সংগঠনটির শাখা বান্দরবানে প্রবেশ করানো হয়েছে।

সম্প্রতি চলতি বছরের ১৩ মার্চ চট্টগ্রামে এক প্রেস কনফারেন্সের মধ্য দিয়ে রতন তঞ্চঙ্গ্যাকে সভাপতি করে ২২ জনের একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে বান্দরবানে জেএসএস (সংস্কার)-এর কার্যক্রম শুরু হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন–ছোদু মং মারমা (সহ সভাপতি), মোম্রা থোয়াই চৌধুরী (সহ সভাপতি), উবামং মারমা (সাধারণ সম্পাদক), কুসুম বিকাশ চাকমা (সহ সাধারণ সম্পাদক), মেঅং মারমা (সহ সাধারণ সম্পাদক), রামতন সাং বম ওরফে মালেক বম (সাংগঠনিক সম্পাদক), ক্য ক্য মারমা (সহ সাংগঠনিক সম্পাদক), মাসিংহ্লা মারমা (মহিলা বিষয়ক সম্পাদক), মিসেস মল্লিকা ত্রিপুরা (সহ মহিলা বিষয়ক সম্পাদক), জুয়েল ত্রিপুরা (তথ্য ও প্রচার সম্পাদক), মাউয়ে খুমি (সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক), গঙ্গাধন চাকমা (আইন বিষয়ক সম্পাদক), হ্লাচিং থোয়াই মারমা (যুব বিষয়ক সম্পাদক), মেঅং মারমা (সহ যুব বিষয়ক সম্পাদক), সুশীল চাকমা (ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক), জমা চন্দ্র ত্রিপুরা (সদস্য), মংক্য মারমা (সদস্য), উক্যশৈ মারমা (সদস্য), চাইনচা প্রু মারমা (সদস্য), লাল সাং বম (সদস্য), ক্যচিউ মারমা (সদস্য)।

কমিটি গঠনের পর বান্দরবান জেলা শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে বাঘমারা বাজার এলাকায় সভাপতি রতন তঞ্চঙ্গ্যার বাসার পাশেই সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি অফিস নেওয়া হয়। এ অফিসটি নেওয়ার পর খাগড়াছড়ি থেকে সংগঠনের কাজে বান্দরবান আসেন বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। তারাসহ বান্দরবানের বেশ কিছু নেতাকর্মী রতনের বাসায় থাকতেন এবং প্রতিদিন সকালে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করতেন। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকালেও খাওয়া-দাওয়ার জন্য সবাই একত্র হন। কিন্তু তার আগেই সশস্ত্র একদল লোকের গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তাদের দেহ।

এ ঘটনায় গুলিতে আঞ্চলিক জেএসএস (সংস্কার)-এর এমএন লারমা গ্রুপের জেলা সভাপতিসহ ছয় জন নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন আরও তিনজন। নিহতরা হলেন–জেলা সভাপতি রতন তঞ্চঙ্গ্যা, সহ সভাপতি প্রজিত চাকমা, সদস্য ডেবিট বাবু, মিলন চাকমা, জয় ত্রিপুরা ও দীপেন ত্রিপুরা। গুলিবিদ্ধ তিনজন হলেন–বিদ্যুৎ ত্রিপুরা, নিরু চাকমা ও মেমানু মারমা।

এ বিষয়ে নিহত রতন তঞ্চঙ্গ্যার স্ত্রী মিনি মারমা বলেন, ‘সকালে আমার স্বামীসহ সবাই প্রতিদিনের মতো খাওয়া-দাওয়া করতে একত্র হয়। আমি বাসায় রান্না করছিলাম। হঠাৎ গুলির শব্দ শুনে বাইরে এসে দেখি স্বামীসহ ছয় জনের লাশ পড়ে আছে।’ দলীয় ষড়যন্ত্রের কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানান তার স্ত্রী।

এদিকে, এ ঘটনার জন্য জেএসএস (মূল)-এর দলের লোকদের দায়ী করছেন জেএসএস (সংস্কার)-এর সাধারণ সম্পাদক উবামং মারমা। তিনি বলেন, ‘সংগঠনটি কীভাবে সুন্দরভাবে চালানো যায় তা নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনার পর খাওয়া দাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। হঠাৎ করে একদল সশস্ত্র লোক এসে গুলি চালায়। যদিও কাউকে চিনতে পারিনি, এটি জেএসএস (মূল) সংগঠনই করেছে।’

এ ঘটনার জন্য জনসংহতি সমিতির সংস্কারপন্থী গ্রুপ সন্তু লারমার গ্রুপকে দায়ী করলেও এখনও সন্তু লারমা গ্রুপের পক্ষের কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, এ ঘটনার পর থেকে এলাকার জনগণের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিয়মিত সেনা ও পুলিশের টহল অব্যাহত রয়েছে। বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি। লাশ ময়নাতদন্ত করার পর সৎকার করে স্বজনরা মামলা করবেন বলে জানান তিনি।

আরও পড়ুন- বান্দরবানে জেএসএস’র দুই গ্রু‌পের গোলাগু‌লিতে নিহত ৬

/এমএএ/এমএমজে/

লাইভ

টপ