পানি কমলেও তীব্র হয়েছে নদীভাঙন

Send
বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
প্রকাশিত : ২২:২৯, জুলাই ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:২৭, জুলাই ১০, ২০২০

সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি ফের বাড়ার আশঙ্কা পাউবোরদেশের বিভিন্ন এলাকার বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। উজানের ঢল ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কিছুটা কমায় বিভিন্ন নদীর পানি কমেছে। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন এলাকায় গত দুই-একদিনের ভারী বৃষ্টিতে নদীর পানি কিছুটা বেড়েছে। ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে মধ্য জুলাইয়ে ফের বন্যার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে বন্যার্তরা রয়েছেন চরম দুর্ভোগে। খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও গোখাদ্যের সংকট এবং পয়োনিষ্কাশন নিয়ে তারা রয়েছেন চরম ভোগান্তিতে।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও মানিকগঞ্জে বাড়তে শুরু করেছে ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা, ইছামতিসহ জেলার অন্যান্য নদীর পানি। গত এক সপ্তাহে আড়াই হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল তলিয়ে গেছে বন্যার পানিতে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. শাহজাহান আলী বিশ্বাস জানান, দুই হাজার ৩৯০ হেক্টর জমির বোনা আমন, ৩৫ হেক্টর জমির আউশ, ১৮০ হেক্টর জমির ভুট্টা, ৫০ হেক্টর জমির তিল ও পাঁচ হেক্টর জমির সবজি এখন পানির নিচে। জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে হরিরামপুরে ৮০৩ হেক্টর, ঘিওরে ৭৩২ হেক্টর ও শিবালয়ে ৬৫০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া দৌলতপুরে ৩৪০ হেক্টর ও সাটুরিয়ায় ১৪৯ হেক্টর জমির ফসল ডুবে গেছে।

এদিকে জেলায় নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইন উদ্দিন বলেন, নদীতে জোয়ারের পানি আসা-যাওয়ার কারণে গত এক মাসে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় তীব্র নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে ১৫টি স্থানে ভাঙন মারাত্মক রূপ নিয়েছে।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান সার্বিক বন‌্যা প‌রি‌স্থি‌তির উন্ন‌তি হ‌লেও ভা‌রী বৃ‌ষ্টির কারণে কুড়িগ্রামের বন‌্যাদুর্গত‌দের ভোগা‌ন্তি বে‌ড়ে‌ছে। অনেক বা‌ড়িঘর থে‌কে পা‌নি নে‌মে গে‌লেও নতুন ক‌রে বৃ‌ষ্টিপাতে দু‌শ্চিন্তায় ফের বন্যার আশঙ্কা করছেন নদী তীরবর্তী মানুষ।

পা‌নি উন্নয়ন বো‌র্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, আমা‌দের নদীগু‌লো এখনও পা‌নি‌তে ভরপুর। উজা‌নে ভারী বৃ‌ষ্টিপাত হ‌চ্ছে। দুই এক‌দি‌নের ম‌ধ্যে পা‌নি বাড়ার তেমন সম্ভাবনা না থাক‌লেও ঢল ও বৃ‌ষ্টিপাত অব‌্যাহত থাক‌লে জুলাই‌য়ের মাঝামা‌ঝিতে আবারও বন‌্যা প‌রি‌স্থি‌তির সৃ‌ষ্টি হ‌তে পা‌রে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ফের বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকাল ৬টায় যমুনার পানি সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৭ সে.মিটার কমলেও দুই-একদিনের মধ্যে ফের বাড়ার আশঙ্কার কথা জানান জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী এ. কে.এম. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, যমুনার পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ১৭ সে.মিটার কমে বিপদসীমার ৩৪ সে.মিটার নিচে অবস্থান করছে। তবে, পাউবোর আবহাওয়া ফোরকাস্ট অনুযায়ী আগামী দুই-একদিনের মধ্যে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঈদের আগে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কাও রয়েছে।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান জেলার ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও ঘাঘট নদীর পানি কমায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে করতোয়া নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে নতুন করে গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে বন্যা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বন্যার কারণে জেলার সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের ২৬টি ইউনিয়নের অর্ধলাখ মানুষ গত ১০ দিন ধরে পানিবন্দি মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

এছাড়া বন্যাকবলিত অধিকাংশ এলাকার বাড়িঘর থেকে এখনো পানি নামেনি। ফলে সরকারিভাবে খোলা আশ্রয় কেন্দ্র, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও সড়কে আশ্রয় নেওয়া মানুষ এখনই ঘরে ফিরতে পারছে না। আশ্রয় নেওয়া অধিকাংশ মানুষ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছেন। এছাড়া পয়োনিষ্কাশনসহ বিভিন্ন সমস্যা ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

অপরদিকে পানি কমে যাওয়া নদী ভাঙন তীব্র হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও ঘাঘট নদীর পানি নেমে যাওয়ার পর ফুলছড়ি, সাঘাটা ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার নদী তীরবর্তী ১৩টি পয়েন্টে গত দুইদিনে প্রায় দেড় শতাধিক ঘরবাড়ি ও প্রচুর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, ডালিয়া পয়েন্টে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও স্বস্তিতে নেই নীলফামারীর বানভাসি মানুষেরা। ডিমলার ছয় ইউনিয়নের তিন হাজার ২৪৫ বানভাসি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি পরিমাপক উপসহকারী প্রকৌশলী আমিনুর রশিদ জানান, ডালিয়া পয়েন্ট দিয়ে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল ৬টা ১০, ৯টা ১২ ও দুপুর ১২টায় বিপদসীমার ১৫ সে.মিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়া তথ্য রেকর্ড হয়েছে। পয়েন্টের বিপদসীমা ৫২ দশমিক ৬০ সে.মিটার।

এদিকে বন্যার কারণে স্থানীয়দের হাতে কাজ না থাকায় আয় উপার্জন বন্ধ। বন্যার পানিতে জলবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় কাজের সন্ধানও মিলছে না। দেখা দিয়েছে খাদ্যাভাব। গোখাদ্য ও বিশদ্ধ পানির (সুপেয়) সংকটে ভোগান্তি বেড়েছে।

জেলায় নদী ভাঙনও তীব্র আকার ধারণ করেছে। জেলার ত্রাণ, দুর্যোগ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এসএ হায়াত জানান, ডিমলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত তিন হাজার ২৪৫ পরিবারকে ১৫ কেজি করে চাল ও শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নদী ভাঙনের শিকার ৭৯ পরিবারের মাঝে নগদ দুই হাজার করে বিতরণ করা হয়েছে। তাদের পুনর্বাসনের জন্য পুনরায় তালিকা করে পাঠানো হয়েছে।

নাটোর প্রতিনিধি জানান, সিংড়া পয়েন্টে আত্রাই নদীর পানি বিপদসীমার ১৫ সে.মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর প্রভাবে নিমজ্জিত হয়েছে ৪৯ হেক্টর জমি। পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে অনেক পরিবার। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি বিভাগ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রায়হান জানান, সিংড়া পয়েন্টে আত্রাই নদীর পানি বিপদসীমার ১৫ সে.মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বারনই ও পদ্মার পানি এখনও বিপদসীমা ক্রস করেনি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সুব্রত কুমার জানান, নদীর পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি অব্যাহত বৃষ্টির পানিতে ইতোমধ্যে জেলায় ৯ হেক্টর জমির রোপা আমনের বীজতলা ও ৪০ হেক্টর জমির আউশ ধান তলিয়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকার জনপ্রতিনিধিরা জানান, বিভিন্ন গ্রামের যাতায়াতের রাস্তা ও বাড়ি এখনও পানির নিচে। ডুবে গেছে।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, যমুনা নদীর পানি কমে গেলেও যাওয়ায় জামালপুরের বন্যা পরিস্থিতির তেমন কোনও উন্নতি হয়নি। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে এক সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকাল ৩টায় বিপদসীমার ২৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিলো। নতুন করে পানি না বাড়লেও জেলার সাত উপজেলার ৮টি পৌরসভা ও ৪৩টি ইউনিয়নে বন্যার পানি ঢুকে পানিবন্দি হয়েছে চার লাখের বেশি মানুষ। দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট। বন্যার পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ১০ জন।

যমুনার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় ভেসে গেছে পুকুরের মাছ, গরুর খাবার, মুরগির খামার, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। ক্ষতির মুখে পড়েছে পানিতে তলিয়ে থাকা কাঁচা-পাকা প্রায় শত কোটি টাকার সড়ক। সড়ক পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন দুর্গত মানুষেরা। অনেকেই আশ্রয়ের জন্য উচুঁ সড়ক ও ব্রিজে অবস্থান নিয়েছে। পানি বাড়ার কারণে প্রায় শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তলিয়ে গেছে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট।

রাজশাহী প্রতিনিধি জানান, রাজশাহীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ রিডার এনামুল হক জানান, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল ৯টার পর থেকে পদ্মার পানি কমতে শুরু করে। সকাল ৬টায় ১৫ দশমিক শূন্য সে.মিটার, সকাল ৯টায় ১৪ দশমিক ৯৯ সে.মিটার, বেলা ১২টায় ১৪ দশমিক ৯৮ সে.মিটার, বেলা ৩ টায় ১৪ দশমিক ৯৭ সে.মিটার, সন্ধ্যা ৬টায় ১৪ দশমিক ৯৬ সে.মিটার রেকর্ড করা হয়েছে।

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান যমুনা নদীসহ সবকটি নদীতে পানি কমতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে জেলার নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ির পানিও নেমে গেছে। তবে নদী তীরবর্তী দুর্গম চরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি গ্রামের বাড়ি-ঘর এখনও পানির নিচে।

যমুনা নদীর কালিহাতী উপজেলার গোহালিয়াবাড়ি ইউনিয়নের বেলটিয়া উত্তরপাড়া এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে এ ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) যমুনা ও পুংলী নদীর পানি কমে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে ধলেশ্বরী নদীর পানি কমলেও এখনও বিপদসীমার ৩৮ সে.মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, জেলার সবগুলো নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর জামান খান বলেন, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুর পর্যন্ত সব নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কোথাও বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করেনি। তবে পানি বৃদ্ধির কারণে বাঁধ ভেঙে গেলে আত্রাই ও ছোট যমুনা নদীর দুই পাশে বসবাসরত মানুষের জান মালের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

 

/আরআইজে/টিটি/

লাইভ

টপ