করোনার কারণে বাড়ি ফিরে জীবিকা নিয়ে দিশেহারা

Send
বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর
প্রকাশিত : ১০:০১, জুলাই ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:০৮, জুলাই ১০, ২০২০

 

করোনা পরিস্থিতির কারণে জীবিকা নিয়ে দিশেহারা শ্রমজীবী মানুষকরোনা পরিস্থিতির কারণে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও আয়-উপার্জন নিয়ে চাপে আছেন শ্রমজীবী মানুষ। শিক্ষকসহ অনেক পেশাজীবীও এর বাইরে নন। চাকরি হারিয়ে বা অন্যান্য কারণে বাধ্য হয়ে গ্রামে ফিরে এখন সংসার চালানো নিয়ে তারা সংকটে পড়েছেন। দিনাজপুর জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, করোনাকালীন সময়ে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দিনাজপুরের নিজ বাড়িতে ফিরেছেন ছয় থেকে সাত হাজার কর্মজীবী মানুষ। যাদের মধ্যে অনেকেই কর্মস্থলে ফিরে গেলেও হারিয়েছেন তাদের চাকরি। যারা এখন তাদের নিজ বাড়িতে এসে কর্মহীন অবস্থায় রয়েছেন, অনেকেই পেশা বদলের চেষ্টায় আছেন।

দিনাজপুরের সদর উপজেলার চেহেলগাজী ইউনিয়নের বড়ইল গ্রামের মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে সোহেল রানা নিজ বাড়িতে ফিরেছেন ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে। তিনি ঢাকায় একটি খাবার হোটেলে রান্নার কাজ করতেন। কিন্তু করোনায় সবকিছু বন্ধ হয়ে যাবে এমন সংবাদের পর তিনি ঢাকা থেকে বাড়িতে ফেরেন। এরপর সেই চাকরিটা তার চলে যায়। এখন বাড়ির পাশের বাজারে একটি লন্ড্রি দিয়েছেন। কিন্তু সেখানেও তেমন উপার্জন নাই। সোহেল রানা বলেন, এখন সংসার চালাচ্ছেন ভাই আর বাবা। তবে এখন চেষ্টায় আছি লন্ড্রিটি সচল করার। এর পাশাপাশি অন্য কিছু করতে হবে সেই চিন্তায় রয়েছি।করোনা পরিস্থিতির কারণে জীবিকা নিয়ে দিশেহারা শ্রমজীবী মানুষ

জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার নাম পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক বলেন, তিনি ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। করোনার উপসর্গ থাকায় জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে তিনি চাকরি ছেড়ে বাড়িতে অবস্থান করেন। তাকে করোনা নেগেটিভের সনদ নিয়ে চাকরিতে যোগদানের জন্য বলা হয়। কিন্তু নমুনা দিয়েও রিপোর্ট আসতে দেরি হওয়ায় তিনি চাকরিতে যোগ দিতে পারছিলেন না। অবশেষে গত ২ তারিখে করোনা নেগেটিভের সনদ নিয়ে তিনি চাকরিতে যোগদান করেন। তিনি বলেন, আমি সুস্থ হয়েছি অনেক আগেই। কিন্তু রিপোর্ট আসতে দেরি হওয়ায় আমার চাকরিতে যোগদান করা হয়নি। যার কারণে জুন মাসের বেতন হয়েছে অর্ধেকের কম।

দিনাজপুরের সদর উপজেলার বটতলী এলাকার ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালক সিরাজুল ইসলাম। চার জনের সংসারে করোনাকালীন সময়ে খরচ বেড়েছে কিন্তু উপার্জন কমেছে অর্ধেকে। যাতে করে প্রহর গুনছেন কবে এই করোনার অসময় দূর হবে। তিনি বলেন, আগে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬শ’ টাকা উপার্জন হতো। কিন্তু এখন নিয়ম করে দিয়েছে ইজিবাইকে দুই জনের বেশি ওঠানো যাবে না। একইসঙ্গে অনেকেই ইজিবাইকে উঠতে চান না করোনার আতঙ্কে। যাত্রী কমায় উপার্জন অর্ধেকেরও কম হয়। কিন্তু করোনার সময় সব জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। কবে যে এই দুর্যোগ শেষ হবে সেই আশায় আছি।

নশিপুর এলাকার ইজিবাইকচালক মোস্তাক জানান, করোনার প্রথম অবস্থায় অনেক দিন ইজিবাইক চালাতে পারিনি। ফলে তখন বসে বসে জমানো টাকায় সংসার চালাতে হয়েছে। এখন আবার উপার্জন কমেছে। ভাড়া ঠিকভাবে পাওয়া যায় না। আবার বিকাল ৪টার পর লোকসমাগম একদম কমে যায়। ফলে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত যা উপার্জন হয় তা দিয়েই সংসার কোনোমতে টেনে নিতে হচ্ছে। 

ইজিবাইক চালক মুক্তার হোসেন বলেন, নিত্য প্রয়োজনীয় যেসব জিনিসপত্র তা তো লাগবেই। খরচ কমার মতো কিছুই নেই। পরিবারের সদস্যদের শখ-আল্লাদ এসব বাদ দিতে হয়েছে। বেঁচে থাকার জন্য যা খেতে হবে তা তো আর না খেলে চলবে না।

বেতন নেই তিন মাস ধরে, বিপাকে শিক্ষকরা 

করোনার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন কিন্ডারগার্টেন আর নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। প্রতিষ্ঠান ও পড়ালেখা বন্ধ থাকায় দীর্ঘদিন যাবত বেতন পাচ্ছেন না তারা। আবার যারা টিউশনি করে রোজগার করতেন বন্ধ হয়ে গেছে তাদেরও আয়। যেসব শিক্ষককে বেতন দেওয়া হচ্ছে না সেসব প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনার কথা চিন্তা করছে শিক্ষা অফিস। 

জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার সিটি রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে (নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান) শিক্ষকতা করেন সদর উপজেলার রামনগর এলাকার সত্যজিৎ রায়। গত কয়েক মাস ধরে বিদ্যালয় বন্ধ, সেই সঙ্গে বন্ধ বেতনও। যে কয়েকটি টিউশনি করতেন সেগুলোও বন্ধ। তাই এখন জমানো অর্থ খরচ করেই চলছে সংসার।

তিনি বলেন, বিদ্যালয় আমাদের দিয়ে অর্থ উপার্জন করলেও এখন আমাদের দিকে তাকায় না। বেশিরভাগ নন এমপিও প্রতিষ্ঠানেই এটি হচ্ছে। এখন অনেক কষ্টে আছি, আগে যে অর্থ উপার্জন করে জমা করেছিলাম এখন সেগুলোই খরচ করে সংসার চালাচ্ছি।করোনার কারণে বেতন হচ্ছে না নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে

নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান বোচাগঞ্জ উপজেলার মাহেরপুর ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম সাগর বলেন, প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হয়নি। করোনার এই সময়টাতে কলেজের কোনও শিক্ষক বেতন পাচ্ছেন না। অন্য সময়গুলোতে টিউশনি বা অন্য কোনও উপায়ে চলে। আমাদের কলেজে মোট ২২ জন শিক্ষক ও ৫ জন কর্মচারী রয়েছেন। এখন তারা কেউই বেতন পাচ্ছেন না, আমি নিজেও কোনও বেতন পাচ্ছি না।

দিনাজপুর জুবলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আকরাম হোসেন বাবলু বলেন, আমার বিদ্যালয়ে মোট পাঁচ জন নন-এমপিও শিক্ষক আছেন। তাদেরকে এখন পর্যন্ত বেতন দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে হয়তো বেতন দেওয়া সম্ভব হবে না। কারণ, তহবিলের টাকা এখন অনেক কম পর্যায়ে চলে এসেছে। দিনাজপুরে নন-এমপিও শিক্ষকদের জন্য কোনও সংগঠন এখনও গড়ে উঠেনি।

দিনাজপুর সারদেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নন-এমপিও শিক্ষক মোসাদ্দেক হুসেন বলেন, আমার স্কুলে ৯ জন শিক্ষক রয়েছি যারা বর্তমানে কোনও বেতন পাচ্ছি না। হয়তো কোনও কোনও প্রতিষ্ঠান বেতন চালু রেখেছে, আবার কেউ কেউ বন্ধ রেখেছে। এটা সাধারণত ওই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত দিনাজপুরে নন-এমপিও শিক্ষকদের কোনও সংগঠন নাই, তাই দাবিগুলোও জোরালো হয় না। নন এমপিও শিক্ষকদের সংখ্যা কত সেটাও জানা নেই।করোনার কারণে বেতন হচ্ছে না কিন্ডারগার্টেনগুলোতে

সদর উপজেলার কিষাণবাজার আশালিপি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের বিজন কুমার দাস। বেসরকারি নার্সারি স্কুলের শিক্ষকতার পাশাপাশি অবসর সময়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়ান। কিন্তু গত ৩ মাস ধরে তার স্কুল বন্ধ। টিউশনিও নেই। তিনি বলেন, স্কুল কর্তৃপক্ষের উপার্জন বন্ধ এই অজুহাতে এখন আমাদেরকে বেতন দেওয়া হচ্ছে না। পাশাপাশি বর্তমানে টিউশনিও বন্ধ, ফলে সব প্রকারের উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন অপেক্ষা করছেন কবে চালু হবে স্কুল ও টিউশনি।

হলিটাচ পাবলিক স্কুলের শিক্ষক পলাশ দাসেরও একই অবস্থা। প্রতিষ্ঠান বন্ধ তাই বেতনও বন্ধ তার। গত তিন মাস ধরে চলছে এই অবস্থা।

টিউলিপ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষক মুকিদ হায়দার শিপন বলেন, করোনার এই পরিস্থিতিতে আমাদের বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। সরকার নন-এমপিও শিক্ষকদের যে অর্থ দিচ্ছে সেটিও আমরা পাচ্ছি না। শিক্ষকতা ছাড়া যাদের অন্য পেশা আছে তারা হয়তো কোনোরকমে সংসার নির্বাহ করছেন, কিন্তু যাদের অন্য পেশা নেই তাদের অবস্থা করুণ।

দিনাজপুরের সুইহারী এলাকার বাপ্পী দাস। পড়ালেখা শেষ করলেও কোনও চাকরি জোটাতে পারেননি। তাই সংসার পরিচালনা করেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিউশনি পড়িয়ে। কিন্তু গত তিন মাস যাবত টিউশনি বন্ধ, তাই বন্ধ হয়েছে উপার্জনও। কিন্তু সংসার পরিচালনার খরচ রয়েছে ঠিক আগের মতোই। তিনি বলেন, গত বছরে বিয়ে করেছি। বাবা-মা ও স্ত্রীর খরচ নির্বাহ করতে হয়। কিন্তু ৩ মাস ধরে উপার্জন বন্ধ, কবে চালু হবে সেটাও ঠিক নাই। এখন একটি সমিতিতে ঋণের জন্য আবেদন করেছি, কিন্তু সেখান থেকেও ঋণ দেওয়া হচ্ছে না। এভাবে আর কতদিন কাটাতে হবে ঠিক জানা নেই, কিন্তু দিন যে আর চলে না।

দিনাজপুর কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ রাহিনুল ইসলাম বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠিত প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান বা নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান আছে তাদের অবশ্যই শিক্ষকদের বেতন দেওয়া উচিত। কারণ, এক সময়ে ওই শিক্ষকদের দিয়েই তারা উপার্জন করেছে। প্রতিষ্ঠানের যদি সামর্থ থাকে এবং এরপরেও বেতন না দেয় তাহলে সেটি অন্যায়। স্কুল খুললে তো ওইসব প্রতিষ্ঠান আবার ব্যবসা করবে। কিন্তু যেসব শিক্ষক বেতন পাচ্ছেন না তারা তো অন্য পেশায় চলে যাবেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে। সামর্থ্য থাকার পরেও যারা শিক্ষকদের বেতন দিচ্ছেন না এরাই হচ্ছে প্রকৃত পুঁজিবাদি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের বলতে হবে যে শিক্ষকরা দিনমজুর নয়, তারা জাতি তৈরি করেন। তাদের ব্যাপারে মানবিক হোন। আমার প্রতিষ্ঠানও ননএমপিও, কিন্তু আমরা তো সেটা করতে পারছি না। একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক পেশা বদল করলে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয় সেটা সবাইকে মনে রাখা উচিত।

দিনাজপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যে ভাবেই পড়াক সম্পূর্ণই ননএমপিওভুক্ত শিক্ষক। যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান ইআইএন নম্বর আছে এমন প্রতিষ্ঠান ৫ হাজারের ওপরে। এছাড়াও আরও অনেক ননএমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। তাই কত সংখ্যক শিক্ষক আছে তাদের সংখ্যা সঠিকভাবে জানা নাই। তবে এই সময়টাতে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা তাদের শিক্ষকদের বেতন দিচ্ছেন না, অথচ এক সময়ে তারা ব্যবসা করেছেন। তাদেরকে কোনও আইনের আওতায় নিয়ে আসা যায় কিনা সেটা দেখা হচ্ছে।

দিনাজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএইচএম মাগফুরুল হাসান আব্বাসী বলেন, করোনার সময়ে যারা বেকার হয়েছে বা কর্মসংস্থান হারিয়েছে তাদের জন্য সরকারের এই মুহূর্তে কোনও পরিকল্পনা নেই। ৫০ লাখ বেকারকে ২৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে। সরকার পেশাভিত্তিক যেমন মটর পরিবহন শ্রমিকদের তালিকা, ননএমপিওভুক্ত শিক্ষকদের তালিকা, কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকদের তালিকা, ইমাম-মোয়াজ্জেমদের তালিকা নেওয়া হয়েছে আবার গার্মেন্টসকে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এভাবে গ্রুপ করে তাদের সহায়তা করছে সরকার। যারা বেকার হয়ে আছেন তারা তো কোনও না কোনও গ্রুপের সদস্য। এছাড়া অন্যান্যভাবে সহযোগিতা করার কোনও পরিকল্পনা নেই। যারা চাকরি হারিয়ে বাড়িতে বেকার হয়ে আছেন তাদের তালিকা জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে করবেন বা ২৫০০ টাকা করে যে দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে আসতে পারতেন। উদ্যোক্তা বা ব্যবসার করার জন্য ঋণ দেওয়ার মতো এখনও কোনও পরিকল্পনা নেই।

দিনাজপুর জেলা করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব ও জেলা সিভিল সার্জন ডা. আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, করোনাকালীন সময়ে ছয় থেকে সাত হাজারের মতো কর্মজীবী মানুষ ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে দিনাজপুরে এসেছিলেন বলে আমরা স্থানীয় সূত্রে জানতে পারি। যাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো আবার তাদের কাজে যোগদান করেছেন। এ বিষয়ে কোনও পরিসংখ্যান নেই।

 

 

/টিএন/এফএস/

লাইভ

টপ