করোনা ও বন্যায় বিপর্যস্ত হাওরবাসী

Send
হিমাদ্রি শেখর ভদ্র, সুনামগঞ্জ
প্রকাশিত : ০৯:৫০, জুলাই ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:৫৯, জুলাই ১১, ২০২০

দ্বিতীয় দফা বন্যায় প্লাবিত রাস্তাঘাট


পাহাড়ি ঢলের পানিতে সুরমা, যাদুকাটা, চলতি ও রক্তি নদীর পানি  বৃদ্ধি পেয়ে আবারও প্লাবিত হয়েছে সুনামগঞ্জের হাওর ও লোকালয়। প্রবল বেগে পানি ঢুকছে ঘরবাড়িতে। পানি আর বাতাসের শো শো আওয়াজে ভীত হয়ে পড়েছেন হাওর এলাকার মানুষ। ১০ দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফা বন্যায় গরু, ছাগল ও গৃহপালিত পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন লোকজন।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (১০ জুলাই) সন্ধ্যায় সুরমা নদীর পানি বিপদ সীমার ২৫ সেন্টিমিটার ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার শক্তিয়ারখলা পয়েন্টে সেন্টিমিটার  যাদুকাটা নদীর পানি  বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১২৩ সেন্টিমিটার ও সুরমা নদীর পানি ৭৬ সেন্টিমিটার বেড়েছে। গতমাসের  শেষের দিকে প্রথম দফা বন্যা শুরু হয়েছিল। 

দ্বিতীয় দফা বন্যায় প্লাবিত লোকালয়
প্রথম দফার বন্যার পানি নামতে না নামতেই হানা দিয়েছে দ্বিতীয় দফা বন্যা। এর সঙ্গে রয়েছে করোনা। এ যেন মড়ার ওপর খারার ঘা। জেলার তাহিরপুর দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মেঘালয় সীমান্তের শতাধিক ঝরনা পানি উজান থেকে প্রবল বেগে নামছে ভাটিতে। ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বসত ভিটে, গবাদি পশু, পুকুরের মাছ। এরকম চিত্র দেখা গেছে সদর উপজেলার লালপুর, রাধানগর, কুতুবপুর, রসুলপুর, চালবন, ভাদেরটেক গ্রামে। যত দূর চোখ যায় পানি আর পানি। 
সুরমা নদীর দুকূল ছাপিয়ে প্রবল বেগে পানি ঢুকছে গ্রামগুলোয়। পানিতে সুনামগঞ্জ-সাচনা, সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর, সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ-দোয়ারাবাজার সড়কের ২০টি জায়গা তুলিয়ে গেছে। পানির তোড়ে কালর্ভাটগুলোর সংযোগ সড়ক থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।  

দ্বিতীয় দফা বন্যায় প্লাবিত লোকালয়
সদর উপজেলা গৌরারং ইউনিয়নের লালপুর গ্রামের জামাল উদ্দিন বলেন, ১০ দিনের ব্যবধানে দু’বার বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে এলাকা। প্রথম দফা বন্যার পানি এখনও ঠিকমতো সরেনি। এরই মধ্যে দ্বিতীয় দফা বন্যা।

হানিফ মিয়া বলেন,  সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর সড়কের দেড় কিলোমিটার জায়গা দিয়ে প্রবল বেগে পানি ঢুকছে। পানি তোড়ে সড়কে সৃষ্টি হয়েছে শতশত গর্ত। গর্তে আটকে যাচ্ছে গাড়ি। সড়কটি খুব নিচু করে তৈরি করায় প্রতিবছর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

দ্বিতীয় দফা বন্যায় প্লাবিত লোকালয়
সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফুল মিয়া বলেন,  দুই সপ্তাহের মধ্যে পরপর দু’বার বন্যায় আক্রান্ত হয়েছেন সুনামগঞ্জবাসী। প্রথম দফা বন্যার পানি এখনও সরেনি, এরই মধ্যে দ্বিতীয় দফায় বন্যা চলে এসেছে। এতে গ্রামের লোকজন আরও বেশি বিপাকে পড়েছেন। গৌরারং ইউনিয়নের ৩০ গ্রাম প্লাবিত। নিচু এলাকার ঘরবাড়িতে আবারও বন্যার পানি প্রবেশ করছে। করোনা ও বন্যায় বিপন্ন মানুষের জন্য আরও বেশি সহযোগিতার প্রয়োজন।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের চেয়াম্যান রনজিত চৌধুরী রাজন বলেন, করোনার প্রভাবে নিম্ন আয়ের লোকজনের আয় রোজগার নেই। এর মধ্যে দুই দফা বন্যা। দরিদ্র মানুষের জন্য সহায়তা কার্যক্রম আরও বাড়ানো প্রয়োজন। 

দ্বিতীয় দফা বন্যায় প্লাবিত লোকালয়
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল জানান, তাহিরপুরের সব ইউনিয়ন প্রথম দফা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এখন আবার শুরু হয়েছে দ্বিতীয় দফার বন্যা। এটি আসলেই মড়ার ওপর খারার ঘায়ের মতো। দুর্গত মানুষের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে। 
সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখত বলেন, দ্রুত বেগে পানি বাড়ছে। এতে শহরের নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে পড়েছে।  পৌর কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির ওপর সতর্ক নজর রাখছে। যেখানে যা প্রয়োজন তার সবটুকু করা হবে।  
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, সরকার, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন বন্যা দুর্গতদের পাশে রয়েছে। বন্যার শুরু থেকে তারা মাঠে কাজ করছেন। এখনও মাঠে আছেন। ত্রাণের অভাব নেই। কোনও মানুষ এক বেলাও না খেয়ে থাকবে না। যখন যা প্রয়োজন তখন তা সরবরাহ করা হচ্ছে। আরও ত্রাণ লাগলে দেওয়া হবে। তিনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দুর্গতদের   সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বন্যা দুর্গতদের খোঁজ খবর নিয়মিত রাখছেন ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন বলেও তিনি জানান।

দ্বিতীয় দফা বন্যায় প্লাবিত লোকালয়

জেলা প্রশাসনের বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে জানা যায়,  জেলার ১১টি উপজেলা ও ৪টি পৌরসভার ৪২ হাজার ৫৭টি পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাহিরপুর উপজেলা। আর কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দিরাই। ৭৯ আশ্রয়কেন্দ্রে ২৩৭টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। জেলার ৮১ ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ২৮০ মেট্রিক টন চাল, ১৬ লাখ ৯৪ হাজার ২৫০ টাকা ও ৩০৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। শিশু খাদ্য, ঢেউটিন, পানি বিশুদ্ধ করণ ট্যাবলেট ও প্রয়োজনীয় ওষুধ  সরবরাহ করা হয়েছে। 
প্রথম দফা বন্যায় ৩ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমির ফসল, ১৫০ কিলোমিটার সড়ক,  তিন হাজার পুকুরের  ২১ কোটি টাকার মাছ ২৫ হাজার গবাদি পশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া নদী ভাঙন দেখা দেয়। 

 

/এসটি/

লাইভ

টপ