বানে দিশেহারা, ভাঙনে ভিটেহারা

Send
আরিফুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত : ১৪:০৪, জুলাই ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৯, জুলাই ১৩, ২০২০


বন্যা


দুই সপ্তাহ হয়নি দুধকুমারের ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়েছেন ভুরুঙ্গামারীর আন্ধারীঝাড় ইউনিয়নের চর ধাউরারকুটি গ্রামের কোরবান আলী। দুধকুমারের গ্রাসে সর্বস্বান্ত হয়ে স্ত্রী সন্তান নিয়ে কোনও রকমে সংসারের জিনিসপত্রসহ নৌকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন পার্শ্ববর্তী নাগেশ্বরী উপজেলার রায়গঞ্জ ইউনিয়নে। দামাল গ্রামে অন্যের জমিতে নতুন করে সংসার পেতেছিলেন। দু’দিনে বন্যার পানি সেই সংসার থেকেও স্ত্রী-সন্তানসহ কোরবান আলীকে উচ্ছেদ করেছে। নতুন তোলা ঘরে সংসার পেতে বসার আগেই কোরবানের ঠাঁই এখন বাঁধে পলিথিনের ঝুপড়ির নিচে।

ধরলা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র কিংবা দুধকুমার কুড়িগ্রামের সবক’টি নদ-নদী অববাহিকার নিত্য চিত্র এখন এমনই। বর্ষায় প্রমত্তা রূপে ফেরা এ নদ-নদীগুলোর অববাহিকার বাসিন্দাদের যেন অবকাশ দিতে নারাজ। দিশেহারা মানুষগুলো কখনও এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে বসত গড়ে আবার কখনও সড়ক কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।


সোমবার (১৩ জুলাই) সকালে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ভারী বর্ষণ আর উজানের ঢলে পানি বৃদ্ধি পেয়ে কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলাফল সপ্তাহের ব্যবধানে ৮ উপজেলার অর্ধশতাধিক ইউনিয়নে আবারও বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় জেলার বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। যা আগামী ৭-১০ দিন জেলার চরাঞ্চলের লাখো মানুষকে পানিবন্দি রেখে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

বাঁধে আশ্রয় নেওয়া কোরবান আলী
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, ধরলা ও তিস্তা অববাহিকায় আগামী দু’দিন এবং ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় আরও তিনদিন পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। ফলে এসব নদ-নদীর অববাহিকায় পানি বিপদসীমার এক মিটারেরও বেশি অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে। 

তিনি বলেন, ‘ধরলা ও তিস্তার উজানে ভারতের জলপাইগুঁড়ি, কুচবিহার এবং ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমারের উজানে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। আগামী কয়েকদিনে উজানের ঢল অব্যাহত থেকে জেলার সবকটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। তবে ৩-৪ দিন পর পানি দ্রুত নেমে যেতে থাকবে।’
প্রথম দফা বন্যার রেশ কাটতে না কাটতেই দ্বিতীয় দফা বন্যার কবলে পড়ায় দিশেহারা চরাঞ্চলসহ নদ-নদীর অববাহিকায় বসবাসকারী লাখো মানুষ। পানি ইতোমধ্যে নদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলগুলোতে ঢুকে পড়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। ধরলার পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের কালুয়া এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়াও রাজারহাট ও উলিপুরে তিস্তার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। তিস্তার ভাঙনে এ দু’টি উপজেলায় গত দুই সপ্তাহে শতাধিক পরিবার গৃহহারা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বন্যার পালিতে তলিয়ে গেছে জনপদ
কুড়িগ্রাম পাউবোর নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, সোমবার ৬টায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে বিপদসীমার ৮২ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার ও নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপদসীমা ছুঁয়েছে। 
জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা জানায়, ইতোমধ্যে জেলার সবকটি উপজেলায় ৪ লাখ সাড়ে ২৮ হাজার পরিবারের জন্য ভিজিএফ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দুর্গত এলাকার জন্য দুই হাজার শুকনো খাবার প্যাকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বন্যা মোকাবিলায় খাদ্য সহায়তা হিসেবে ৩৯০ মেট্রিকটন চাল ও ৮ লাখ টাকা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি শিশু ও গো খাদ্য বাবদ আরও দুই লাখ করে টাকা মজুত রয়েছে।

বন্যা

জেলা প্রশাসক রেজাউল করিম বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার প্রশাসনের তরফ থেকে যাবতীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল ও শুকনো খাবারসহ শিশু খাদ্য সরবরাহের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও গবাদি পশুর খাদ্য সহায়তা দেওয়ার জন্যও বরাদ্দ পাওয়া গেছে যা প্রয়োজন সাপেক্ষে বণ্টন করা হবে।




উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করে আশ্রয়কেন্দ্রসহ প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।

/এসটি/

লাইভ

টপ