ঠাকুরগাঁওয়ে ভারী বর্ষণে ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ির ভবনে ধস

Send
জাকির মোস্তাফিজ মিলু, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশিত : ১৮:১০, জুলাই ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৩, জুলাই ১৪, ২০২০

টানা ভারী বর্ষণে ধস নেমেছে ঠাকুরগাঁওয়ের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ঐতিহাসিক হরিপুরের রাজবাড়ির ভবনে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন জেলার ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক,  ভ্রমণপিয়াসী মানুষসহ স্থানীয়রা। জেলার প্রত্যন্ত সীমান্ত উপজেলা হরিপুরে অবস্থিত রাঘবেন্দ্র রাজবাড়ির ভবনটির অংশবিশেষ যত্ন আর সংস্কারের অভাবে কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে ধসে পড়েছে।
জেলা প্রশাসনের আর্কাইভ ও ইতিহাসবিদদের মতে, ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে মুসলিম শাসনামলে এই ঐতিহ্যবাহী জমিদারি ভারতবর্ষের অবিভক্ত বাংলার খোলড়া পরগনার অন্তর্গত ছিল । মেহেরুন্নেছা ওরফে কামরুন নাহার নামে এক বিধবা মুসলিম মহিলার ওপর ছিল এ পরগনার জমিদারি । তাকে খাজনা দিতে হতো তাজপুর পরগনার ফৌজদারের কাছে, খাজনা অনাদায়ে জমিদার মেহেরুন্নেছার জমিদারির অংশবিশেষ নিলামে উঠলে কাপড় ব্যবসায়ী ঘনশ্যাম কুণ্ডু তা কিনে নেন। ঘনশ্যামের পরবর্তী বংশধরদের একজন রাঘবেন্দ্র রায়। তিনি ১৮৯৩ সালে রাজবাড়ির নির্মাণ কাজ শুরু করেন। তার পুত্র জগেন্দ্র নারায়ণ রায় উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে রাজবাড়িটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন।ভবনটির পূর্ব পাশে শিব মন্দির ও মন্দিরের সামনে নাট্যশালা ছিল । এখানে একটি বড় পাঠাগারও ছিল, যা কালের বিবর্তনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। রাজবাড়ির সামনে ছিল সিংহ দরজা, আজ সেই সিংহ দরজাটিও আর নেই।

১৯০০ সালের দিকে ঘনশ্যামের বংশধররা বিভক্ত হয়ে গেলে হরিপুর রাজবাড়িও দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। রাঘবেন্দ্র নারায়ণ ও জগেন্দ্র নারায়ণ রায়ের কর্তৃত্বে রাজবাড়িটি বড় তরফের রাজবাড়ি নামে পরিচিতি পায়। এ রাজবাড়ির পশ্চিমে নগেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী ও গিরিজা নারায়ণ চৌধুরী ১৯১৩ সালে আরেকটি রাজবাড়ি নির্মাণ করেন। যার নাম ছোট তরফের রাজবাড়ি।

হরিপুরের এই ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়িটি সংস্কারের অভাবে কালের সাক্ষী হয়ে ধসে পড়ার সম্ভাবনা নিয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে । বর্তমানে পরিত্যক্ত এ রাজবাড়ির বিভিন্ন কক্ষ বিভিন্ন অফিস ও বাসা বাড়ি হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে।

এ বিষয়ে প্রাক্তন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ নুরুল ইসলাম বলেন, হরিপুর রাজবাড়ি দুটি এ এলাকার একটি ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন।  এগুলো রক্ষার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। এখন সেগুলো ধ্বংসের মুখে এবং বিপজ্জনক স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। এগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে এখনই সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল আজিজ বলেন, নতুন প্রজন্মকে আমাদের শিক্ষা, পূর্বসূরিদের সংগ্রাম , উন্নয়ন সমস্ত ব্যাপারেই জানানোর জন্য এই ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ জরুরি। না হলে এ সময়ের ইতিহাসও বিলীন হয়ে যাবে।

গত প্রায় ১৫ দিনের অবিরাম বর্ষণে এই ঐতিহাসিক ভবনের পশ্চিমে অংশ ধসে পরে। হরিপুরের সাংবাদিক কবিরুল ইসলামের মতে, আর হয়তো কোনওদিন রাজবাড়িটির আসল রূপ আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধররা দেখতে পাবে না। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় আমরা হতাশ। তার মতে, প্রশাসন আগে থেকে এর রক্ষা ও সংস্কারের উদ্যোগ নিলে এটি এভাবে ধসে পড়তো না।

ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ শিক্ষাবিদ প্রফেসর আবুবকর সিদ্দিক বলেন, জমিদারি প্রথা ও সে প্রথার বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগ্রাম, ক্রমান্বয়ে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ এসব আমাদের গণমানুষের ইতিহাস , যা সংরক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ আমাদের শেকড় কোথায়, কোন পরিক্রমায় বর্তমানে আমরা এখানে, একদিন এটাও ইতিহাস হবে। তাই নতুন প্রজন্মের সামনে যেন এটা থাকে সেজন্যই এই পুরাকীর্তির সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। 

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল করিম জানান, প্রশাসনের পক্ষ হতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবহিত করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আদেশ পেলে সংস্কারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের অধীনে থাকার কারণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আমরা সংস্কার করতে পারি নাই। জেলা প্রশাসক ড. কেএম কামরুজ্জামান সেলিম বলেন, ব্যাপারটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। এটা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

 

/এমআর/

লাইভ

টপ
X