কুমিল্লায় এক সপ্তাহে চার সাংবাদিককে নির্যাতন

Send
মাসুদ আলম, কুমিল্লা
প্রকাশিত : ১৮:৩৫, জুলাই ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪০, জুলাই ১৪, ২০২০

চান্দিনায় রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে সাংবাদিকদের মারধর করে মালিকপক্ষ ও সন্ত্রাসীরা। ছবিটি ওই গার্মেন্টসের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেওয়াকুমিল্লায় আশঙ্কাজনক ভাবে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে। দোষীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় এই ধরনের হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে। এদিকে নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেও সুফল পাচ্ছে না সাংবাদিক পরিবার। গত এক সপ্তাহে কুমিল্লার তিন উপজেলায় চার সাংবাদিকের ওপর হামলা-নির্যাতন, মারধর ও ক্যামেরা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এইসব হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় সাংবাদিক পরিবারগুলো শঙ্কা রয়েছেন। দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলার সচেতন মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত এক সপ্তাহে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শরিফুল আলম চৌধুরী, দেবিদ্বারে দৈনিক আমাদের সময়ের প্রতিনিধি শাহিন আলম, চান্দিনায় দৈনিক যুগান্তরের প্রতিনিধি মো. আব্দুল বাতেন এবং দৈনিক যায়যায়দিনের প্রতিনিধি মো. জাকির হোসেন হামলার শিকার হয়েছেন।
তাদের মধ্যে সব চেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কুমিল্লা মুরাদনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শরিফুল আলম। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে গত ৪ জুলাই শরিফুল আলম চৌধুরীর কাজিয়াতল গ্রামের বাড়িতে ঘরে প্রবেশ করে দিনে দুপুরে তাকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে উপজেলার দারোরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহাজাহানের বাহিনী। হাতুড়ি ও লোহার পাইপ দিয়ে পিটিয়ে শরিফুলের হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে কুপিয়ে তার মাথা ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে। তাকে রক্ষা করতে এসে রক্তাক্ত হয়েছেন শরীফুলের মুক্তিযোদ্ধা বাবা ও মা। তাদেরকেও কুপিয়ে ও পিটিয়ে আহত করে শাহাজাহান বাহিনী। তার ঘরে থাকা বোনের শ্লীনতাহানিও করা হয়।
চেয়ারম্যানের নির্দেশে হাত-পা ভেঙে দেওয়া সাংবাদিক শরিফুলের শারীরিক অবস্থা ভালো নেই। তিনি বর্তমানে ঢাকায় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) ভর্তি রয়েছেন। তাকে এবং তার পরিবারের ওপর হামলার ঘটনায় বাবা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন চৌধুরী একটি মামলা করেন। সেই মামলায় চেয়ারম্যান শাহাজাহানসহ একাধিক আসামি গ্রেফতার হয়। থানা থেকে কারাগারে পাঠানো হলেও অবাক ব্যাপার হচ্ছে ভার্চুয়াল আদালতের মাধ্যমে চেয়ারম্যানসহ আসামিরা জামিনে বের হয়ে আসেন। এসে এলাকায় উল্লাস করেন। এতে ওই পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক ও বিচার নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।


ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুর্নবাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাংবাদিক শরিফুল জানান, আমার চার হাত-পা অকেজো, শরীরে যে পরিমাণ ব্যথা-যন্ত্রণা তা থেকে মরে যাওয়াই ভালো ছিল।
তারা বাবা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন চৌধুরী জানান, আমার ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে সন্ত্রাসীরা আমার এবং আমার স্ত্রীকে কুপিয়ে পিটিয়ে আহত করে। শরিফুলের মাথায় আঘাত করেছে। হাত-পা সব ভেঙে ফেলা হয়েছে। এখন আমার ছেলে পঙ্গু হওয়ার দশা। মামলার আসামিরা একে একে প্রায় সবাই জামিনে বেরিয়ে এলাকায় উল্লাস প্রকাশ করছে। আমার কার কাছে বিচার আশা করবো?

মুরাদনগর থানা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, সাংবাদিক শরিফুলের ওপর হামলার ঘটনায় চেয়ারম্যান শাহজাহানসহ মামলার আসামিদের গ্রেফতার করা হয়েছে। কারাগারে পাঠানোর জন্য আদালতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু, আসামিরা জামিন পেয়েছেন। আমাদের কিছু করার নেই। মামলার অন্যান্য আসামিকে গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উল্লাস এবং হুমকির বিষয় খতিয়ে দেখছি।

অন্যদিকে, গত ৮ জুলাই কুমিল্লার দেবিদ্বারে স্থানীয় চেয়ারম্যানের ও মেম্বরের লোকজনের সংঘর্ষের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলা শিকার হয়েছেন দৈনিক আমাদের সময়ের দেবিদ্বার প্রতিনিধি শাহিন আলম। উপজেলার সাইচাপাড়া বাজারে দফায় দফায় সংঘর্ষে জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খন্দকার এম এ সালামের কর্মী সুলতান আহম্মেদ এই হামলার ঘটনায় জড়িত।

সাংবাদিক শাহিন আলম জানান, সংঘর্ষের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে চেয়ারম্যানের কর্মী সাইচাপাড়া গ্রামের ফিরোজ মিয়ার ছেলে সুলতান আহম্মেদ আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এরপর কিল, ঘুষি ও লাথি মেরে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। আমার সঙ্গে থাকা ডিএসএলআর ক্যামেরা ভাঙচুর করে। মোবাইল ও সঙ্গে থাকা নগদ অর্থ নিয়ে নেয়।

তিনি জানান, এই হামলা ও নির্যাতনের ঘটনার বিচার চেয়ে দেবিদ্বার থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছি।

তবে দেবিদ্বার থানার ওসি জহিরুল আনোয়ার সাংবাদিক শাহিনের লিখিত অভিযোগের কথা অস্বীকার করে তিনি জানান, হামলার ঘটনায় ওই সাংবাদিক কোনও লিখিত অভিযোগ করেননি এখন পর্যন্ত। অভিযোগ করলে খোঁজ নেওয়া হবে।

এছাড়া কুমিল্লার চান্দিনায় ‘ডেনিম প্রসেসিং প্ল্যান্ট লিমিটেড’- এর এক নারী কর্মীকে গণধর্ষণের সংবাদ প্রকাশ করায় দুই সাংবাদিককে মারধর করেছে মালিকপক্ষ। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) চান্দিনার বেলাশহর এলাকায় অবস্থিত ওই গার্মেন্টেসের সামনের সড়ক থেকে তাদেরকে ধরে নিয়ে মারধর করে। এছাড়া গার্মেন্টেসের ভেতরে নিয়ে ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়।

হামলার শিকার দুই সাংবাদিক দৈনিক যুগান্তরের চান্দিনা প্রতিনিধি মো. আব্দুল বাতেন এবং দৈনিক যায় যায় দিনের চান্দিনা প্রতিনিধি মো. জাকির হোসেন।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাংবাদিক আব্দুল বাতেন জানান, বৃহস্পতিবার আমরা মোটরসাইকেল যোগে ওই গার্মেন্টেসের সামনের সড়ক দিয়ে সাংবাদিক জাকির হোসেনের বাড়িতে যাওয়ার পথে লিটন, আনোয়ারের নেতৃত্বে ১০/১২ জন সন্ত্রাসী আমাদের ওপর হামলা চালায়। এসময় আমাদের ব্যবহৃত ক্যামেরা ও আমার মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নেয় সন্ত্রাসীরা।

হামলার ঘটনা সম্পর্কে জানাতে চাইলে গার্মেন্টসের ডিরেক্টর মো. আলমগীর হোসেন জানান, আমাদের গার্মেন্টেসের কোনও নারী শ্রমিক ধর্ষিত না হলেও সাংবাদিকরা আমাদের সুনাম ক্ষুণ্ণ করার জন্য মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করে। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এমনটা হতে পারে।

এদিকে গত সোমবার (৬ জুলাই) রাত ৯টায় ওই গার্মেন্টস ছুটির পর বাসায় ফেরার পথে গণধর্ষণের শিকার হন এক নারী শ্রমিক। ওই রাতেই চান্দিনা থানা পুলিশ তিন ধর্ষককে আটক করে এবং ঘটনাস্থলটি দেবিদ্বার থানায় হওয়ায় পরদিন দেবিদ্বার থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

এ ব্যাপারে চান্দিনা থানার ওসি মো. আবুল ফয়সল জানান- পুলিশ পুরো ঘটনা শুনে এবং গার্মেন্টেসের সিসি টিভির ফুটেজ দেখে সাংবাদিকদের মারধরের সত্যতা পেয়েছি। এছাড়া গত ৬ জুলাই রাতে ওই গার্মেন্টেসের এক নারী শ্রমিক ধর্ষণের ঘটনাও সত্য। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি রয়েছে।

এদিকে দুই সপ্তাহ আগে মনোহরগঞ্জে আবদুর রহিম নামে আরেক সাংবাদিক হামলার শিকার হন।

সাংবাদিক সমিতি কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি সাংবাদিক ইয়াসমিন রিমা জানান, সাংঘর্ষিক কিছু আইনের কারণে সাংবাদিক নির্যাতনের হার বেড়েছে। বিশেষ করে আইসিটি আইনের প্রভাব হামলা ও নির্যাতনে বেশি কাজ করছে। দোষীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে থানার পুলিশ সদস্যরা আইনের চেইন অব কমান্ড সঠিকভাবে পালন করতে না পারায় নির্যাতনের ঘটনাগুলো ঘটছে।
কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নুরুজ্জামান জানান, আইন অনুসারে নির্যাতনের শিকার সাংবাদিক সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ বা মামলা করতে পারেন দোষীদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ বা মামলা করতে গিয়ে সাংবাদিক কোনও হয়রানির মুখোমুখি হলে সেই বিষয়ে জেলা প্রশাসক বা পুলিশ সুপারকে অবহিত করতে পারে। সপ্তাহে তিন/চারটি সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করবো।

/টিএন/

লাইভ

টপ