১০ বছরের পুরনো তালিকা ধরে খাগড়াছড়িতে চলছে পাহাড়ধস ঠেকানোর অভিযান!

Send
জসিম উদ্দিন মজুমদার, খাগড়াছড়ি
প্রকাশিত : ১৯:৫৯, জুলাই ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪৬, জুলাই ১৫, ২০২০

ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড়ে বাস

টানা বর্ষণে খাগড়াছড়ি জেলাজুড়ে পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। ঝুঁকিপূর্ণ এসব পাহাড়বাসী বাঙালি-নৃগোষ্ঠীবাসীকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। এছাড়া জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা এলাকায় এলাকায় যাচ্ছেন এবং ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে নিরাপদস্থানে যাওয়ার আহ্বান করছেন। এ নিয়ে জেলা প্রশাসন জরুরি সভা করেছে এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে একযোগে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের এসব আহ্বানে সাড়া খুব কম। বিপজ্জনক জেনেও পাহাড় ছাড়ার ইচ্ছা নেই তাদের।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন পাহাড় ধস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পড়েছে আরেক ঝামেলায়। দেখা গেছে, এ বিষয়ে ১০ বছরের পুরনো একটি তালিকা রয়েছে কেবল তাদের কাছে। ২০১০ সালে তদানীন্তন জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট ৯টি উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ওই তালিকাটি করা হয়েছিল। এরপর প্রতিবছর এই তালিকা আপডেট করার কথা থাকলেও বিষয়টি আর এগোয়নি। বর্ষা মৌসুম শেষ হলেই বরাবরের মতো সব কর্মকর্তা পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে থাকাদের বিষয়ে করণীয় ভুলে যান। ফলে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে থাকাদের পুনর্বাসনের জন্য নানা ধরনের প্রস্তাব থাকলেও সেগুলো আর বাস্তবায়ন হয়নি। 

রাঙামাটিতে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় প্রশাসনের মাইকিং

সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে করা ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসের ওই তালিকায় খাগড়াছড়ি সদরে প্রায় ৩০০ পরিবার, মাটিরাঙা উপজেলায় প্রায় ২৫০ পরিবার, মানিকছড়িতে ১২০, লক্ষ্মীছড়িতে ৬৫, রামগড়ে ৭৯, দিঘীনালায় ৭৫, পানছড়িতে ৭৫, দিঘীনালা উপজেলায় ৮০, গুইমারা উপজেলায় ১২০, মহালছড়িতে ১৩৭ পরিবার পাহাড় ধসের আশঙ্কায় আছে বলে উল্লেখ রয়েছে।

তবে পরিবেশবাদীরা বলছেন বর্তমানে এর সংখ্যা হবে অন্তত ১০ গুণ বেশি। প্রতিবছর পাহাড় ধসে জেলার কোথাও না কোথাও কারও না কারও মৃত্যু হলেও জেলা উপজেলা প্রশাসন পাহাড়বাসীদের উদ্দেশে মাইকিং করে তাদের সতর্ক করেই খালাস আর পাহাড়বাসীরা নিরাপদ জায়গা খুঁজে না পেয়ে সংসার পাতা জায়গাতেই আল্লাহ খোদার নাম জপে দিব্যি ঝুঁকির ভেতরেই থেকে যাচ্ছেন। তাদের অন্য কোথাও না যেতে চাওয়ার আরেক কারণ, বাড়িঘর ছেড়ে গেলে পরে ফিরে এসে বাস্তুভিটার নিরাপত্তা না পাওয়া। ঘরের মালামাল চুরির আশঙ্কা তো আছেই, বাড়ির জায়গা অন্য কেউ দখল করে ফেলবে এই ভয়ও আছে।

পরিবেশবাদী সংস্থা এবং স্থানীয়রা অভিযোগ করেন টানা বর্ষণের সময় প্রশাসনসহ স্থানীয় সরকারের জন প্রতিনিধিরা নানা কার্যক্রম প্রদর্শনে সোচ্চার থাকলেও পরে ঘুমিয়ে যান তারাও। ফলে পাহাড় কেটে পাহাড়ের পাদদেশে বা ওপরে বা পাহাড়ের কোলে বসবাস করা লোকের সংখ্যা দিনের পর দিন বাড়লেও সমস্যা নিরসনে বছরের অন্য সময়ে উদ্যোগী নন কেউ।

খাগড়াছড়ি পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন’র সভাপতি প্রদীপ চৌধুরী বলেন, গত এক দশকে পাহাড় কেটে বসবাস অথবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিসংখ্যান জেলা প্রশাসনের ২০১০ সালে করা তালিকার চেয়ে ১০ গুণ বেশি হবে। কিন্তু নানা কারণে তা আপডেট করা হয় না। খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গত ১১জুলাই একটি জরুরি সভা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করে বিভিন্ন আদেশ-উপদেশ দিচ্ছেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এই বর্ষা মৌসুম পেরিয়ে গেলে সব ভুলে যান তারা। পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে শুষ্ক মৌসুমে নিরাপদে সরিয়ে পুনর্বাসন করার দাবি জানান তিনি।

পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসের এলাকায় সচেতনতা বাড়াতে রেড ক্রিসেন্টের পক্ষে মাইকিং

বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লয়ারস অ্যাসোসিয়েশন (বেলা) এর সদস্য ও সাংবাদিক আবু দাউদ মুহাম্মদ বলেন, ‘বর্ষা এলে মাইকিং ও আশ্রয় কেন্দ্র খুলে পাহাড় ধসে আক্রান্তদের রক্ষার চেষ্টা করা হলেও তার পর তা আর মনে থাকে না কারও। তাছাড়া প্রশাসনিক পর্যায়ে যেভাবে রদ-বদল অব্যাহত থাকে তাতে অনেক জেলা প্রশাসক ভালো কিছু প্রস্তাব দিলেও তা আর আলোর মুখ দেখে না।’

তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রত্যেক উপজেলায় প্রভাবশালীরা পাহাড় কেটে বিভিন্ন স্থাপনা করায় অনেকে বসবাস করছেন ঝুঁকিতে। গত কয়েক বছর যাবত গড়ে ৫/৬জন করে পাহাড় ধসে মারা যাচ্ছে। যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ৪০০/৪৫০ পরিবার। এসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময় অভিযোগ করলেও আমলে নেয় না প্রশাসন।

খাগড়াছড়ি শহরের সবুজবাগ  এলাকার কাউন্সিলর মো. মাসুম রানা বলেন, তার এলাকায় শতাধিক পরিবার ঝুঁকিতে বসবাস করছে দীর্ঘদিন। গত কয়েকদিন আগে টানা ৩দিনের বর্ষণে অনেক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগেও অনেকে ঘরবাড়ি হারিয়েছে। জেলা প্রশাসক ও পৌর মেয়র ইতিমধ্যে ঝুঁকিতে থাকা এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলেছেন। লোকজন দু’একদিন নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে যেতে চায় না। তারা নিরাপদ এবং স্থায়ী আবাসে থাকবে-এই প্রত্যাশা সরকারের  কাছে করে।

কিন্তু, ওই এলাকার বাস্তবতা হচ্ছে, নিরাপদ স্থান খুঁজে না পাওয়ায় কেউ বাড়ি ছেড়ে যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ি শহরের সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা বেলাল হোসেন বলেন, তারা পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে থাকলেও প্রশাসনের আহ্বানে সাড়া দিতে চান না, কারণ শুধু আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে লাভ হয় না। পরে প্রশাসন খবর নেয় না, খাবার-পানীয় দেয় না। অনেক সময় ঘর খালি থাকায় গরু, ছাগল, হাস-মুরগিসহ অনেক কিছু চুরি হয়ে যায়।

শহরের শালবন এলাকার মিজানুর রহমান বলেন বর্ষা আসলেই প্রশাসনের লাফ-ঝাঁপ দেখা যায়, এরপরে আর কেউ খবর নেয় না। আমরা গুচ্ছগ্রামে জায়গা বরাদ্দ পেলেও যেতে পারিনি। সরকার আমাদেরকে জমি বন্দোবস্ত দিয়েছিল ১৯৮০-১৯৮১ সালে, সেখানে ৭/৮ বছর থাকার পর সাম্প্রদায়িক হামলার হাত থেকে বাঁচাতে ১৯৮৮ সালে গুচ্ছগ্রামের খাস জায়গায় এনে আবদ্ধ করেছে, সেই থেকে এখনও আমরা এখানেই। আমাদেরকে আমাদের জায়গায় যেতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রশাসন দিতে পারে না অথবা নতুন কোনও সমতল খাস জায়গায় পুনর্বাসন করতে পারে না―শুধু বর্ষা মৌসুমে নিরাপদ স্থানে যাওয়া হাস্যকর, মেনে নেওয়া যায় না।

ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড়ে বাস

কুমিল্লাটিলা এলাকার রহমত আলী বলেন, ‘সরকার তাদেরকে সমতল কোনও জায়গায় বন্দোবস্তী দেয়নি, দিয়েছে পাহাড়। পাহাড়ে বাস করতে হলে পাহাড় কাটতে হয়। আগে লোকসংখ্যা অনেক কম ছিল। দিনে দিনে জনসংখ্যা বাড়ায় পাহাড় কেটে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস বেড়েছে। সারা বছর অনিরাপদে থেকে শুধু বর্ষাকালে নিরাপদ স্থান দিলে কি হবে? অনেক সময় আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার পর আর কোনও সেবা পাওয়া যায় না।’

ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘ আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে না খেয়ে মরার চেয়ে পাহাড় ধসে মরা অনেক ভালো।’

খাগড়াছড়ি পৌরসভার মেয়র মো. রফিকুল আলম বলেন, টানা বর্ষণে পাহাড় ধসে জেলার বিভিন্ন স্থানে ঘরবাড়ি, সম্পদের পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বেশিরভাগ সময় পাহাড় ধসের কারণে খাগড়াছড়ির সঙ্গে চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ির-ফেনী, খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি-লংগদু, খাগড়াছড়ি-বাঘাইছড়িসহ বিভিন্ন আন্তঃজেলার সড়ক যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে নানা দুর্ভোগে পড়ে খাগড়াছড়িবাসী। পাহাড় ধসের হাত থেকে মানুষ, ঘরবাড়ি, কৃষি জমি, রাস্তাঘাট ও অন্যান্য সম্পদ রক্ষার জন্য বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে আসার জন্য আহ্বান করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, পরিকল্পিতভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করা সম্ভব।

ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড়ে বসবাসকারীদের বাড়িঘর ও এলাকা পরিদর্শন করে তাদের বর্ষাকালে নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার আহ্বান জানান জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা

জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, যারা ঝুঁকিতে বসবাস করছে, তাদের সঠিক পরিসংখ্যান জানা নেই। তবে আমরা গত ১১ জুলাই জরুরি সভা করেছি। শীঘ্রই সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে কথা বলে তালিকা চূড়ান্তভাবে তৈরি করা হবে। যারা অধিক ঝুঁকিতে আছে তাদেরকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনর্বাসন করা হবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রশাসন পাহাড় কাটা বন্ধে এখন পর্যন্ত বিভিন্নভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে, অভিযুক্তদের জেলা-জরিমানা দেওয়া হচ্ছে। ঝুঁকিতে থাকা হাজার হাজার পরিবারকে প্রশাসন একদিনে পুনর্বাসন করতে পারবে না। তবে সকলের সহযোগিতা থাকলে পর্যায়ক্রমে সকলকে নিরাপদে বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

/টিএন/

লাইভ

টপ