দেখা নেই স্বাস্থ্যকর্মীর, ঝুঁকিতে মা ও শিশুরা

Send
আরিফুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত : ১২:২৪, আগস্ট ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৪, আগস্ট ০২, ২০২০

বাঁধে আশ্রয় নেওয়া নাসরিন



নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা নাসরিন বেগম।  বাড়িতে বন্যার পানি ওঠায় আশ্রয় নিয়েছিলেন  চিলমারীর থানাহাট ইউনিয়নের পুঁটিমারি কাজলডাঙা বাঁধে। ২৪ জুলাই বিকালে প্রতিবেদকের সঙ্গে ওই বাঁধে দেখা হয় নাসরিনের। তিনি জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বাঁধে বসবাস করছেন। স্বামীর রোজগারও নেই। প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসায় শরীর খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। পানিবন্দি থাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার উপায়ও নেই। পরামর্শ দেওয়ার মতো হাতের কাছে নেই কোনও স্বাস্থ্যকর্মী। একমাত্র ভরসা ওপরওয়ালা (সৃষ্টিকর্তা)। ২৬ জুলাই বাঁধেই একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছেন নাসরিন। 

মোবাইলে নাসরিন বলেন, ‘প্রসব বেদনা বেড়ে যাওয়ায় মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছিলেন তিনি। চারপাশে পানি থাকায় কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার উপায়ও ছিল না। নিরুপায় হয়ে ব্র্যাকের প্রশিক্ষিত এক ধাত্রীর স্মরণাপন্ন হলে তিনি তিন হাজার টাকা দাবি করেন। হাতে অত টাকা ছিল না। আবার দরাদরি করতে গেলে ধাত্রী আসবেন না, এমন আশঙ্কায় তাতেই রাজি হয়ে ধাত্রীকে ডাকেন। ওই ধাত্রী এসে সন্তান প্রসবে সহায়তা করেন। জন্মের পর শিশুটির শ্বাস- প্রশ্বাস সমস্যা হচ্ছিল। পরে ঠিক হয়ে গেছে।’
তবে ধাত্রীকে তিন হাজারের বদলে এক হাজার টাকা দিয়ে বাকিটা পরে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ছন বলে জানান তিনি।

নাসরিন বলেন, ‘সন্তান জন্মের পর বাড়িতে ফিরেছি। পানি নেমে গেলেও বাড়ি ভর্তি কাদা, পঁচা গন্ধ। আমার শরীর অসুস্থ্, সর্দি ভাব লাগছে। কিন্তু আশেপাশে কোনও স্বাস্থ্যকর্মীর দেখা মিলছে না।’ শিশু জন্মের পাঁচ দিন পার হলেও এখনও কোনও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেননি বলে জানান তিনি।
২৩ জুলাই ওই বাঁধে স্থানীয় নারীদের সহায়তায় সন্তান প্রসব করেন মুন্নি বেগম। জন্মের পর থেকে শিশুটি সর্দি থাকলেও এখনও চিকৎসকের পরামর্শ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
একই অবস্থা ওই বাঁধে আশ্রয় নেওয়া আমিনা বেগমের। অন্তঃসত্ত্বা ওই কিশোরীর শারীরিক অবস্থাই বলে দিচ্ছে সে অপুষ্টিতে ভুগছে। কিন্তু বন্যায় খাদ্য সংকটে থাকা আমিনা ও নাসরিনের মতো অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতি নারীরা পুষ্টিকর খাদ্যের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার সংকটেও ভুগছেন। তাদের অভিযোগ, ন্যূনতম স্বাস্থ্য পরামর্শও পাচ্ছেন না তারা। আশেপাশে মেডিক্যাল টিম কাজ করছে–এমন খবরও নেই তাদের কাছে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বাসিন্দা আমিনা ও নাসরিনের পরিস্থিতিই বলে দেয় দুর্গত এলাকায় স্বাস্থ্য সেবার কী হাল।

সন্তান জন্মের পর বাড়িতে ফিরেছেন নাসরিন
উলিপুর উপজেলায় প্রায় ২৯০০ অন্তঃসত্ত্বা রয়েছেন। এ উপজেলার বন্যা কবলিত বেগমগঞ্জ, সাহেবের আলগা, হাতিয়া ও বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের প্রতিটিতে গড়ে দুই শতাধিক করে অন্তঃসত্ত্বা নারী রয়েছেন। বন্যায় অধিকাংশ কমিউনিটি হেল্থ ক্লিনিক পানিতে তালিয়ে থাকায় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এসব এলাকার মানুষ চাইলেই হাসপাতালে যেতে পারছেন না।
জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ (৩০ জুন) প্রতিবেদন অনুযায়ী জেলায় ১৫ হাজার ৮৭০ অন্তঃসত্ত্বা নারী রয়েছেন। এসব নারীর মধ্যে অনেকে গত এক মাসে সন্তান প্রসবও করেছেন। কিন্তু পরপর দুই দফা বন্যায় গত একমাস ধরে পানিবন্দি থাকায় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে নিরাপদ প্রসবসহ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন মা ও সন্তান উভয়ই।
বন্যা কবলিত এলাকার এমন ঘটনার নজির দুই একটি নয়, অগণিত। হতভাগ্য এই মানুষগুলো তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। কারও কাছে নালিশ, দাবি কিংবা প্রতিবাদের সামর্থ্য নেই তাদের।

অথচ জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের দাবি, বন্যায় স্বাস্থ্যসেবা দিতে তাদের ৮৫টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। তবে বানভাসিদের অভিযোগ, দুর্গত এলাকায় মেডিক্যাল টিমের দেখা মেলা ভার।
চিলমারীর পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলায় মোট ৯৫৪ অন্তঃসত্ত্বা নারী রয়েছেন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় অনেক এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীরা যেতে পারছেন না। তবে সবার মোবাইল নম্বর আমাদের সংগ্রহে আছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার স্বাস্থ্যকর্মীর নম্বরও তাদের (গর্ভবতী নারী) কাছে রয়েছে। তারা প্রয়োজনে যোগাযোগ করলে আমরা পরামর্শ দিচ্ছি।’
সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান জানান, ‘যেকোনও সময় ডেলিভারি হয়ে যেতে পারে–এমন খবর দেয় তাহলে আমাদের টিম অবশ্যই চেষ্টা করবে। কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে অমাদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তারপরও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

 

/এসটি/

লাইভ

টপ