পাহাড় থেকে নামতে রাত হওয়ায় সিনহাদের ‘ডাকাত’ সন্দেহ করা হয়

Send
টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ০১:১৫, আগস্ট ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:২২, আগস্ট ১৪, ২০২০

টুইন্যা পাহাড়

৩১ জুলাই তথ্যচিত্র বানানোর জন্য মেরিনড্রাইভ থেকে দুই কিলোমিটার ভেতরে কক্সবাজারের টেকনাফের মারিশবুনিয়ার টুইন্যা পাহাড়ে উঠেছিলেন মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। তার সঙ্গী ছিলেন সিফাত। ওই পাহাড়ে ওঠার সময় পথে পথে গ্রামের অনেকের সঙ্গে টুকটাক কথা, সালাম ও কুশল বিনিময় হয় তার। তবে বিকালের দিকে পাহাড়ে উঠলেও নেমে আসতে রাত হওয়ায় তাদের ‘ডাকাত’ বলে সন্দেহ করে আয়াজ উদ্দিন ও নুরুল আমিন নামে স্থানীয় দুই ব্যক্তি। এমনকি স্থানীয় একটি মসজিদের মাইকে ‘ডাকাত’ পরার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে স্থানীয়রা তাদের পিছু নিলেও কোনও আক্রমণ করেনি।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তারা বলছেন, মাঝেমধ্যেই পাহাড়ের দিক থেকে তাদের গ্রামে ডাকাত পড়ে বটে তবে এই দুই ব্যক্তি প্রকাশ্যে তাদের সামনে দিয়ে পাহাড়ে উঠেছেন। ফলে তাদের সন্দেহ করার কোনও কারণ ছিল না।

কোরবানির আগের দিন বিকেলে পাহাড়ে ওঠার সময় মেজর (অব.) সিনহা ও তার সঙ্গীর সঙ্গে টেকনাফের মামাভাঙ্গা বড় ডেইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দেখা হয় স্থানীয় বৃদ্ধ সৈয়দ করিমের। তাদের চেনেননি তিনি। তবে অপিরচিত এবং একজনের গায়ে সেনাবাহিনীর পোশাক ও অন্যজনের বড় চুল দেখে তাদের কথা মনে আছে তার।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সেসময় আর্মির ড্রেস পরেছিলেন ওই ব্যক্তি। তিনি আমাকে সালাম দিয়ে বলেন, বাবা কেমন আছেন? আমি জবাব দিলে তার জন্য দোয়া করতে বলেন। তখন দুজনের কাঁধে ও হাতে ব্যাগ ছিল। একটু পর পর আর্মির ড্রেস থাকা ব্যক্তি হাতের ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। এরপর মারিশবুনিয়ার দিকে চলে যান তারা।

এসময় ওই বিদ্যালয়ে সামনে আদনান নামের একটি চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেওয়া লোকজন বলাবলি করছিল, দেখো দেখো পাহাড়ে আর্মির লোক যাচ্ছে। 

একই দিন ওই এলাকায় হেঁটে যাওয়ার সময় তাদেরকে দেখেন মাথাভাঙ্গা জামে মসজিদের ইমাম জহিরুল ইসলাম। ইমাম জহিরুল ইসলামের বাড়ি মারিশবুনিয়া এলাকায়। 

তিনি মনে করে বলেন, ‘আছরের নামাজের জন্য মসজিদে আজান দিতে যাওয়ার সময় রাস্তায় হাফপ্যান্ট পরা চুল লম্বা এক ব্যক্তিসহ আর্মির ড্রেসে দুজন মানুষকে দেখেছি। এসময় তাদের কাছে ব্যাগ ও গলায় কার্ড ঝোলানো ছিল। পাহাড়ে যাওয়ার সময় কাজেম মজুমদার নামের একজনের বাড়ির পাশে তারা কিছু সময় দাঁড়িয়ে বিশ্রামও নেন। দিনে তাদের একজনের গায়ের পোশাক দেখে মনে করেছি, সেনাবাহিনীর লোক। কোনও কাজে হয়তো পাহাড়ে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে ব্যাগও ছিল।

সিনহা তার সঙ্গীসহ উঠেছিলেন টেকনাফের বাহারছড়ার মারিশবুনিয়ার গ্রামে ‘মার্ডার থ্রি’ গর্জন বাগানের কাছাকাছি অবস্থিত টুইন্যা পাহাড়ে। এই পাহাড়ে ওঠার জন্য স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলীর বাড়ির আঙ্গিনা দিয়ে ঢুকে পেছনে চলে যান মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান ও তার সঙ্গী সিফাত। এসময় বাড়ির উঠানে খেলা করছিল মো. আলীর নাতি মাদ্রাসার ছাত্র শহিদুল ইসলাম (৮)। সে তাদের পথ দেখিয়ে দেয়। 

সেনাবাহিনীর পোশাক পরনে ছিল মেজর (অব.) সিনহার। সঙ্গী সিফাতের পরনে ছিল হাফ প্যান্ট। তাদের কাঁধের ব্যাগে ক্যামেরাসহ আনুষাঙ্গিক জিনিস ছিল। তবে গোল বাঁধে তারা রাত ৮টা পার হওয়ার পরেও পাহাড় থেকে ফিরে না এলে। সন্দেহপ্রবণ ও পুলিশের সোর্স আয়াজ উদ্দিন ও নুরুল আমিন তাদের ডাকাত বলে সন্দেহ করে মসজিদে মাইকিং করে। 

৩১ জুলাই রাতে ৮ টার পরে পাহাড়ে ডাকাত রয়েছে দাবি করে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের মারিশবুনিয়া নতুন মসজিদে মাইকিংয়ের আওয়াজ শুনেছিল বলে জানিয়েছেন মসজিদের পাশের বাসিন্দা বৃদ্ধ জালাল আহমদ।

তিনি জানান, ‘রাতে মসজিদের পেছনে পাহাড়ে লাইটের আলো দেখতে পান তারা। এরপর লোকজন হইচই শুরু করে। এরপর মসজিদে মাইকিং করে নিজাম উদ্দিন নামে একজন বলেন, পাহাড়ে লাইট দেখা যাচ্ছে, হয়তো ডাকাত হবে। এলাকার লোকজন সতর্ক হোন আর যদি স্থানীয় লোকজন হন নিচে নেমে আসেন বলে সতর্ক বার্তা দেন। এরপর এলাকার কিছু লোক পুলিশকে অবহিত করে বিষয়টি।

আর আরেক মসজিদের ইমাম জহিরুল বলেন, একই দিন রাতে এশার নামাজ শেষে মৌলভি হোসেন আহমেদ নামে এক ব্যক্তি তাকে বলেন পাহাড়ে ডাকাতের কথা বলে উত্তর মারিশবুনিয়া নতুন মসজিদে মাইকিং করছে। এসময় তাকে বলি তারা ডাকাত না, সেনাবাহিনীর লোক। কারণ দিনের বেলায় তারা পাহাড়ে যাওয়ার সময় আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে।

জহিরুল বলেন, ‘এরপর রাতে মাথাভাঙ্গা থেকে বাড়ি (মারশিবুনিয়া) ফেরার পথে মাইকিং করছিল সেই মসজিদের সামনে দেখা হয় নুরুল আমিন ও মো. আয়াজের সঙ্গে। তারা বলে পাহাড়ে ডাকাত পড়েছে। আমার লাইটট নিয়া পাহাড়ে মারে।  আমি এসময় তাদের জোর দিয়ে বলি, পাহাড়ে লাইট দেখানোর দরকার নাই, তারা ডাকাত নয় সেনাবাহিনী। কেননা বিকেলে পাহাড়ে উঠার সময় তাদের আমি নিজের চোখে দেখেছি সেনাবাহিনী। এতো হইচই করার দরকার নেই। কিন্তু, তখন ওরা বলে এতো রাতে পাহাড়ে কি সেনাবাহিনী থাকে? সেগুলো ডাকাত হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, পাহাড়ে ডাকাতের অবস্থানে বিষয়ে পুলিশকে খবর দেয় ওরা। এসময় মসজিদে আরও লোকজন ছিল। এই মসজিদের ইমাম ছিল মৌলভি মুক্তার আহমদ। তবে আমিসহ এলাকার আরও লোকজন বারবার বলেছি পাহাড়ে ডাকাত না তারা সেনাবাহিনীর লোক। কিন্তু কিছুতেই বিশ্বাস করছিল না নুরুল আমিন ও আয়াছরা। এরপর আমি চলে যাই।

ইমাম জহিরুল বলেন, এশার নামাজ জামাতে আদায় করার জন্য যখন মুসল্লিরা মসজিদে আসছিলেন, তখন বলাবলি করেন, মেরিন ড্রাইভের কাছে একটি প্রাইভেটকার রয়েছে। সেখানে মেজর (অব.) সিনহার নাম লেখা আছে। শুনেছি রাত ৯ টার পরে তাঁরা পাহাড় থেকে নামেন। সে হিসেবে ৪ ঘণ্টার বেশি সময় পাহাড়ে ছিলেন হয়তো।

উত্তর মারিশবুনিয়ার যে মসজিদ থেকে মাইকিং করা হয়েছে

নাম না বলার শর্তে এক ব্যক্তি বলেন, ‘রাত ৯ টার দিকে টুইন্যা পাহাড় থেকে নেমে পুরনো ইউপি পরিষদ কার্যালয়ের সামনে ইটের সড়ক দিয়ে মেরনি ড্রাইভে উঠার জন্য রওনা দিয়েছিল মেজর (অব.) সিনহা ও সিফাত। এসময় পেছন থেকে কিছু লোক তাদের পথ অনুসরন করছিল বলে এলাকায় বলাবলি করছিল। সেদিন রাতে ৮-৯ স্থানীয় লোক মোটর সাইকেল ও সিএনজিতে করে পুলিশ চেকপোস্টে গেয়েছিল।

মসজিদের কাছাকাছি পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, ‘পাহাড়ের তীরে বসতি হিসেবে প্রায় সময় ডাকাতের ভয় লেগে থাকে। তাছাড়া ঈদ ও কোরবানির সময় হলে আরও বেশি ভয়ে থাকি। কেননা এই এলাকায় মাঝে মধ্যে ডাকাতির ঘটনা ঘটে থাকে। তবে কোরবানির ঈদের আগের রাতে মসজিদে যে মাইকিংয়ের কথা বলা হচ্ছে সেটি আমি শুনেনি। এছাড়া মসজিদের পাশে যাদের ঘরবাড়ি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ভয়ে তারা এখন ঘরবাড়িতে তালা দিয়ে অন্যত্রে চলে গেছে। 

যে মসজিদ থেকে মাইকিং করা হয়েছে, উত্তর মারিশবুনিয়ার ওই মসজিদের ইমাম মুক্তার আহমেদ বলেন, তার স্ত্রী অসুস্থ থাকায় সেদিন এশার ফরজ নামাজ আদায় করে বাসায় ফিরে যান তিনি। তবে মসজিদে আসার আগেই মাইকে ‘ডাকাত ডাকাত’ বলে ঘোষণা শুনতে পান তিনি।

এদিকে, পরদিন সকালে মেজর (অব.) সিনহাকে হত্যার খবর শুনে এলাকার মানুষ ভীষণ আতঙ্কিত হয়। আতঙ্কে অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন বলেও শোনা গেছে।

স্থানীয় মো. সেলিম নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘পুলিশের মামলার তিন সাক্ষী গ্রেফতারের পর এলাকার লোকজন খুবই ভয়ভীতিতে আছেন। ফলে লোকজন কারও সঙ্গে কোনও কথা বলতে রাজি হচ্ছে না। কেননা যারা গ্রেফতার হয়েছিল তারা এর আগে মিডিয়াতে কথা বলেছিল। এছাড়া প্রতিদিন রাতে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর লোকজন এসে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ফলে এলাকার অনেক লোকজন এখন আর ঘরে থাকেন না। এছাড়া মসজিদের পাশে নজির আহমদ, মো. তৈয়ুব, প্রবাসী মো.রফিক, মো. সাইফুল, হোছেন আহমদ ও শফি উল্লাহ, সাইফুলসহ অনেকে ঘরের তালা ঝোলানো দেখা গেছে।  

টেকনাফ বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ফরিদ উল্লাহ বলেন, ‘তার এলাকার মারিশবুনিয়া গ্রামের টুইন্যা পাহাড়টি খুবই সুন্দর। ফলে যে-কোন ভ্রমণ প্রেমীরা সেটি দেখে আকৃষ্টিত হয়। কেননা সেখানে সাগর ও প্রকৃতি অত্যন্ত সুন্দর এবং কাছাকাছি দেখা যায়। সেদিন পাহাড়ে ডাকাত বলে সন্দেহ ও পরে যা ঘটেছে, তা ছিল চিন্তারও বাইরে। ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক।

উল্লেখ্য, টুইন্যা পাহাড় থেকে নামার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বাহারছড়ার শামলাপুর চেকপোস্টে মেজর সিনহাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার সাক্ষী হন আয়াজ ও নুরুল আমিন। এরপর র‌্যাবের কর্মকর্তারা সিনহার বোনের করা মামলায় তাদেরসহ তিনজনকে তুলে নিয়ে গিয়ে গ্রেফতার দেখান। আদালতের নির্দেশে তাদের সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হবে।

/টিএন/

লাইভ

টপ