জলাবদ্ধতা হলেই শহরজুড়ে দেখা যায় গ্যাসের বুদবুদ, আতঙ্কে নারায়ণগঞ্জবাসী

Send
আমির হুসাইন স্মিথ, নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশিত : ১২:০০, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪২, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২০

নারায়ণগঞ্জে রাস্তার পাশে জমা পানিতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে গ্যাস লাইনের ছিদ্রপথে বের হওয়া গ্যাসের বুদবুদ।

নারায়ণগঞ্জে তিতাস গ্যাসের পাইপে অসংখ্য আণুবীক্ষণিক ছিদ্রের কারণে জেলাজুড়ে বিরাজ করছে আতঙ্ক। জেলার বিভিন্ন স্থানে গ্যাস লাইনের পাইপ ছিদ্র হয়ে প্রতিনিয়ত নির্গত হচ্ছে গ্যাস। প্রায়ই আগুন লেগে ঘটছে ছোটখাট দুর্ঘটনা। তিতাস কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিলেও সংস্কার করা হচ্ছে না এসব ছোট ছোট ছিদ্র বা লিকেজ। নাগরিক কমিটির নেতারা বলেছেন, টাকা না দিলে কোনও সেবা মেলে না নারায়ণগঞ্জ তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। পশ্চিম তল্লা বাইতুস সালাত জামে মসজিদের সামনের পাইপের লিকেজ থেকে গ্যাস নির্গত হয়ে বিদ্যুতের স্পার্ক থেকে আগুন ধরে বিস্ফোরণে ৩১ জন নিহত ও ৭ জন আহত হওয়ার ঘটনায় এমন লিকেজ নিয়ে মানুষের মধ্যে শঙ্কা বেড়ে গেছে। 

সাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে গত কয়েকদিন ধরে নারায়ণগঞ্জে বেশ ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির পানি জমে থাকায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে গ্যাসের লিকেজ। জলাবদ্ধতার পানি ভেদ করে প্রতিনিয়ত বের হচ্ছে বুদবুদ। নগরীর চাঁদমারী-সস্তাপুর-সদর উপজেলা সড়ক, সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল, পাইনাদী, নতুন মহল্লা, হিরাঝিল, নয়াআটি, ফতুল্লার পাগলা, দেলপাড়া, রসুলপুর, দক্ষিণ সেহাচর, লাল খা, রামামারবাগ, কাঠেরপুর, কোতালেরবাগ, লামাপাড়া, ইউনিকম টেক্সটাইলমোড়, তক্কারমাঠ, পিলকুনি, দাপা, ইদ্রাকপুর, জোড়াপুলসহ বিভিন্ন জায়গায় তিতাস গ্যাসের লিকেজ পাইপ ও জরাজীর্ণ রাইজার লিকেজ  দিয়ে তীব্রগতিতে নির্গত হচ্ছে গ্যাস। কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই নাকে এসে গন্ধ লাগছে নির্গত হওয়া গ্যাসের।

নারায়ণগঞ্জে নর্দমার পানিতে বোঝা যায় পাইপের ছিদ্রপথে বের হওয়া গ্যাসের বুদবুদ।

সস্তাপুর সড়কের বাসিন্দা আল-আমিন, ফাতেমা বেগম, রাজিয়া সুলতানা, শেফালী ঘোষসহ কয়েকজন জানালেন, চাঁদমারী থেকে উপজেলার সস্তাপুর পর্যন্ত সড়কটিতে কমপক্ষে ১৫-২০টি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিনিয়ত নির্গত হচ্ছে গ্যাস। প্রায় তিন চার বছর ধরে গ্যাসের পাইপ লিকেজ হয়ে গ্যাস নির্গত হচ্ছে। বিষয়টি তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে কয়েক দফা জানানো হয়েছে। তিতাস গ্যাসের লোকজন সরেজমিন পরিদর্শন করে  সত্যতাও পেয়েছেন। কিন্তু, গ্যাসলাইনের লিকেজ সংস্কারের জন্য ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেছেন। ঘুষের টাকা না দেওয়ায় গ্যাস লাইনের লিকেজ সংস্কার করেনি তারা আজও। তাদের দাবি, দীর্ঘদিনে গ্যাসলাইনের লিকেজ মেরামত না করায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। যে কোনও সময় তল্লা মসজিদের মতো এখানে ট্র্যাজেডির সৃষ্টি হতে পারে।

নারায়ণগঞ্জ তিতাস গ্যাস অফিস সূত্রে জানা যায়, ৩০ বছরেরও আগে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করেছে। এই পুরনো পাইপলাইন দীর্ঘদিনেও আর সংস্কার করা হয়নি। মাটির নিচে থাকার কারণে গ্যাসলাইনের রিবন নষ্ট হয়ে পাইপ মাটির সংস্পর্শে এসে এমন আণুবীক্ষণিক ছিদ্রের সৃষ্টি হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ এসব লাইন সংস্কার বা নতুন করে পাইপ বসানোর কোনও উদ্যোগ নেয়নি। মেয়াদোত্তীর্ণ পাইপ দিয়ে গ্যাস সরবরাহের কারণে প্রতিনিয়ত গ্যাস নির্গত হয়ে খনিজ সম্পদের অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে, বাসাবাড়ি বা কারখানায় গ্যাসের চাপ পাচ্ছে না গ্রাহকরা।

নারায়ণগঞ্জে তিতাসের গ্যাস পাইপলাইনে ছিদ্র মেরামতে খোঁড়াখুঁড়ি।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলের অনেক রাস্তা এখন আরসিসি ঢালাই। রাস্তা আরসিসি ঢালাইয়ের কারণে অনেক জায়গায় গ্যাস যে নির্গত হচ্ছে তা দেখা যাচ্ছে না। তবে ছুটির দিনে মিল কারখানা বন্ধ হলে গ্যাস সরবরাহ লাইনে গ্যাসের চাপ বেড়ে যায়। এতে করে রাস্তা দিয়ে গ্যাস বের হতে না পেরে মাটির স্তরভেদ করে আশেপাশের ড্রেন বা নর্দমা দিয়ে গ্যাস বের হতে দেখা যায়।  চলতি বছরের ২৫ মে রাত সাড়ে বারোটার দিকে জনৈক হাসেম মিয়ার দোকান ও বাসাবাড়িতে গ্যাসের লিকেজ থেকে আগুন লেগে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গিয়ে আগুন নেভায়। এ দুর্ঘটনার পর গ্যাসের লিকেজ মেরামত করে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। ঈদুল আজহার সময় পূর্ব সেহাচর এলাকার সুজন নামে এক ব্যক্তির বাসায় গ্যাসের রাইজার লিকেজ থেকে আগুন লাগে। পরে তা মেরামত করা হয়।

ফতুল্লার শাহজাহান রি-রোলিং মিল ইয়াদ আলী মসজিদ সংলগ্ন একটি গলিতে মাটির নিচের পাইপলাইন থেকে গ্যাস নির্গত হওয়া জমাটবাঁধা জলাবদ্ধতার পানিতে বুদবুদ দেখা যায়। এছাড়া উকিলবাড়ি মাঠ সংলগ্ন এলাকায় একই অবস্থা দেখা যায়।

নারায়ণগঞ্জে বৃষ্টির জমা পানিতে বোঝা যাচ্ছে গ্যাসলাইন থেকে নির্গত গ্যাসের বুদবুদ।

ফতুল্লার সেহাচর এলাকার বাসিন্দা রহুল আমিন জানান, আমাদের পাশের বাড়ির গ্যাসের রাইজার দিয়ে প্রতিনিয়ত শোঁ শোঁ শব্দ করে গ্যাস নির্গত হয়। আশেপাশের মিল কারখানা বন্ধ থাকলে শোঁ শোঁ শব্দের গতি তীব্র আকার ধারণ করে। নির্গত গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। শুধু পাশের বাড়ি নয়, সেহাচরসহ আশেপাশর এলাকার যে কোনও বাড়িতে গেলেই রাইজার থেকে এই শব্দ পাওয়া যায়। গভীর রাতে এই শব্দ বেড়ে যায় কয়েকগুণ।

পশ্চিম তল্লা এলাকার শিক্ষিকা হোসনে আরা বেগম জানান, তাদের বাড়ির গ্যাসের রাইজার থেকে সব সময় গ্যাস নির্গত হয়। মসজিদে বিস্ফোরণের পর থেকে তারা আতঙ্কে আছেন। তবে তিতাস গ্যাসের কাছে এখনও অভিযোগ দেননি। শিগগিরই অভিযোগ দেবেন মেরামত করার জন্য।

স্থানীয় টেকনিশিয়ান মো. শাহিন জানান, সেহাচরসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের সরবরাহ লাইনে ও রাইজারে প্রায় ২০ শতাংশ লিকেজ আছে।  রাস্তায় আরসিসি ঢালাই থাকায় গ্যাসের লিকেজ সাধারণ মানুষের চোখে পড়ছে না। তবে মাটির ঘনত্ব কম হলে  যে পাশ দিয়ে সম্ভব পৃথক স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আসছে। জলাবদ্ধতা হলে গ্যাসের বুদবুদ মানুষের চোখে পড়ছে। 

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ বি সিদ্দিক জানান, নারায়ণগঞ্জ তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ টাকা ছাড়া কোনও কাজ করে না। কোনও অভিযোগ দিলেই তারা টাকা চায়। এটি খুবই দুঃখজনক এবং নিন্দনীয় আচরণ। সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে মানুষ এমনটা প্রত্যাম করে না।

তিনি বলেন, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ যদি এসব লিকেজ সংস্কার না করে তাহলে যে কোনও সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে মানুষের জানমালের ক্ষতি সাধন হতে পারে। অন্যদিকে, অপচয় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ গ্যাস।

তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে তিতাস গ্যাসের লিকেজ মেরামত ও পুরনো গ্যাস সরবরাহ লাইন পরিবর্তন করে নতুন পাইপ স্থাপনের দাবি জানান। একইসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ তিতাস গ্যাস অফিসে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে দুর্নীতিবাজ, অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

তিনি বলেন, গত কয়েকদিন ধরে গণমাধ্যমে খবর এসেছে নারায়ণগঞ্জে দুই লাখের বেশি অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে। তিতাস গ্যাস অফিসের হিসেব অনুযায়ী শুধু নারায়ণগঞ্জে ১৭৯ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাসলাইন রয়েছে। এসব গ্যাসলাইন রাতের আঁধারে তিতাস গ্যাসের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই নেওয়া হয়েছে। কারণ, তাদের যোগসাজশ না থাকলে কোনোভাবেই এই গ্যাস সংযোগ নেওয়া সম্ভব নয়।

নারায়ণগঞ্জে গ্যাস পাইপলাইন থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে নিঃসরিত গ্যাস মাটির চাপ ভেদ করে নর্দমার পানি দিয়ে বের হচ্ছে। এতে পানিতে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য বুদবুদ।

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ তিতাস গ্যাস অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মফিজুল ইসলাম জানান, যেখানেই গ্যাসের পাইপলাইন  লিকেজ হয়ে গ্যাস নির্গত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই তাদের টিম পাঠিয়ে সংস্কারের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে তিনি সস্তাপুর সড়কের লিকেজ সংস্কারে ঘুষ দাবি করার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাদের কাছে কেউ অভিযোগ নিয়ে আসেনি। ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তিনি বলেন, আমার আমি চাকরিতে যোগ দিয়েছি প্রায় ৩০ বছর হয়ে গেছে। তারও আগে নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন জায়গায় গ্যাসের পাইপ বসানো হয়েছে। অনেক পাইপ লাইন পুরনো হওয়ার কারণে অনেক জায়গায় মাটির সংস্পর্শে এসে পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে। বিষয়টি তিতাস গ্যাসের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। 

এদিকে নারায়ণগঞ্জের তিতাস গ্যাসের লিকেজ দ্রুত সংস্কার ও নতুন গ্যাসলাইনের বসিয়ে গ্যাস সরবরাহ করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জবাসী।

/টিএন/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ